প্রচ্ছদ

অপারেশন জ্যাকপটে মেরুদণ্ড ভেঙে যায় পাকিস্তানিদের

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:৫১

329

এ ডব্লিউ চৌধুরী, বীরউত্তম, বীরবিক্রম :: মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য আটজন বাঙালি অফিসারকে নিয়ে আমি একাত্তরের ২৯ মার্চ ফ্রান্সের তুল নৌঘাঁটি থেকে পালিয়ে স্পেন চলে এলাম। সেখান থেকে ভারতে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিই। আমাদের নিয়ে তৈরি হলো নৌকমান্ডো বাহিনী। ভারতীয় বেতার কেন্দ্র আকাশবাণী থেকে পরপর দুই দিন গান বাজিয়ে অভিযান চালানোর জন্য আমাকে সংকেত দেওয়া হয়েছিল। আমরা যে অভিযান চালাই তার নাম ‘অপারেশন জ্যাকপট’। এ অপারেশনে পাকিস্তান বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।

গভীর রাতে ১১টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আমি ৩৩ কমান্ডোকে নিয়ে নদীতে সাঁতার দিতে থাকি। মাইন লাগিয়ে চাবি টেনে উল্টো সাঁতরে পাড়ে এসে পৌঁছে দৌড় শুরু করি আমরা। এরই মধ্যে বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চট্টগ্রাম নৌবন্দর। ৯টি জাহাজ ডুবে গেল। অচল হয়ে গেল পুরো বন্দর। এ ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দখলদার বাহিনী। আমি পাকিস্তান প্রতিরক্ষাবাহিনীতে যোগ দিই ১৯৬১ সালে। পাকিস্তানি ডুবোজাহাজ ‘গাজী’তে শুরু আমার কর্মজীবন। ডুবোজাহাজে কাজ করি বলে দেশের সবকিছুর খবর ঠিকমতো পেতাম না। ’৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার খবর শুনে পাকিস্তানের সঙ্গে বাঙালির দ্বন্দ্বের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলাম। পরে একটা রেডিও কিনেছিলাম। ওতে কিছু কিছু খবর শুনতাম। ’৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর ওই দলটির কাছে পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা চলছে, এমন খবর রেডিওতে পাই। দেশের জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। নেতার ডাকে সাড়া দিল মন। ছুটে আসব মন চাইছে, কিন্তু ফরাসি নৌঘাঁটি থেকে বেরোতে পারছিলাম না। ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসির খবর শুনে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা কী ধরনের বর্বরতা চালিয়েছিল তার কিছুটা জানতে পেলাম। পরদিন ফ্রান্সের পত্রিকা ‘লা মনডে’তে বিস্তারিত খবর পড়লাম। জানতে পেলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, ‘আর দেরি নয়, এখনই পালাতে হবে।’ ফ্রান্সের কাছ থেকে পাকিস্তান নতুন তিনটি ডুবোজাহাজ (সাবমেরিন) কিনেছিল। ওগুলো পাকিস্তানে নিয়ে আসার জন্যই আমাদের ওখানে পাঠানো হয়। আমরা ছিলাম মোট ৪৫ জন ক্রু। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলাম বাঙালি। এই ১৩ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে আটজনকে আমার পালানোর পরিকল্পনার কথা জানাই। অন্যদের কাছ থেকে খবর পেয়ে আরও একজন যোগ দিলেন। যে সাবমেরিনে আমরা ছিলাম তার লকার থেকে নয়জনের পাসপোর্ট বের করে আনি। অবশেষে স্থির হয়, ২৯ মার্চ আমরা পালাব। কোথায় কখন কীভাবে জড়ো হব তা সবাইকে বুঝিয়ে বললাম। সময়মতো সবাই এলেন। শুধু একজন তার পাসপোর্ট নিয়ে লন্ডন পালিয়ে যান। বাকি আটজনকে নিয়ে আমি স্পেনে পৌঁছলাম। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ভারতীয় দূতাবাসে গেলাম। আমরা স্পেনে এসেছি খবর পেয়ে দূতাবাসের লোকেরা ছুটে আসেন। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে আমরা একটা আবেদনপত্র দিলাম। তাতে বললাম, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য আমরা পালিয়ে এসেছি। ৫ মিনিটের মধ্যে তারা সব ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আমাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমরা ১১ এপ্রিল মুম্বাই পৌঁছলাম। এরপর বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে আমাদের ইচ্ছার কথা জানাই। আমাদের আটজনকে নিয়ে তৈরি হয় মুক্তিবাহিনীর নেভাল উইং অর্থাৎ নৌকমান্ডো বাহিনী। মূলত বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সূচনাপর্ব তৈরি হয়েছিল সেদিনই, আমরা আট বাঙালি নাবিক যেদিন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি ডুবোজাহাজ থেকে পালিয়েছিলাম।
কঠোর পরিশ্রমসাধ্য প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে আমাদের নৌকমান্ডো গড়ে তোলা হয়। এরপর আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের ভিতরে নৌ অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে ৩০০ সদস্যের সুইসাইডাল স্কোয়াড তৈরি করার। আমাদের প্রশিক্ষণ শেষে ২১ মে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে নৌবাহিনীর ক্যাম্প তৈরি হলো। বিপজ্জনক, স্পর্শকাতর মাইন ও বিস্ফোরকের সঠিক ব্যবহার রপ্ত করতে নৌ মুক্তিযোদ্ধাদের যেখানে কমপক্ষে তিন বছর প্রয়োজন, সেখানে মাত্র তিন মাসের মধ্যে কমান্ডোদের অভিযানের জন্য পারদর্শী করে তোলা হয়েছিল। এজন্য প্রতিদিন আমাদের প্রায় ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে কমান্ডার হিসেবে আমি আর আমার ডেপুটি (কমান্ডার) ডা. শাহ আলম বীরউত্তমকে শোনানোর জন্য একজন ভারতীয় জেনারেল প্রতিদিন দুটি গান বাজাতেন। একটি পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান’, অন্যটি আরতি মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি’। এভাবে সাত দিন গান শোনানোর পর জেনারেল বললেন, মনে থাকবে তো? এরপর চট্টগ্রামে অভিযান চালানোর জন্য ১ আগস্ট ৬০ জন কমান্ডো দিয়ে আমাকে আগরতলা পাঠানো হয়। আমার মতো আরেকজনকেও ৬০ জন কমান্ডো দিয়ে চালনা বন্দরে পাঠানো হয়। এভাবে বেশ কয়েকটি বন্দরে কমান্ডো টিম পাঠানো হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল নদীমাতৃক বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা যেন কোনোভাবেই চলাফেরা করতে না পারে, কোনো রসদ আনা-নেওয়া না করতে পারে। আসার সময় আমাদের বলে দেওয়া হয় অপারেশনের ৪৮ ঘণ্টার সংকেত হিসেবে প্রথম গানটি বাজানো হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাকশনে যাওয়ার সংকেত হিসেবে আরেকটি গান বাজবে। তখনই বুঝলাম কেন এত দিন গান শোনানো হয়েছিল। তিন ব্যান্ডের দুটি ট্রানজিস্টর রেডিও দেওয়া হলো আমাকে, একটি আমার সহকারী কমান্ডারকে। কোন গান বাজলে কী করতে হবে তা শুধু আমরা দুজনই জানতাম। দমদম বিমানবন্দর থেকে রওনা হওয়ার আগে জেনারেল অরোরা সেখানে এসে জানালেন, হয়তো ১৪ আগস্টই অপারেশন চালানো হতে পারে। কারণ ওই দিন পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। তাই ওরা খোশমেজাজে মেতে থাকবে, কোনো দিকে খেয়াল থাকবে না। ভারতের হরিণা দিয়ে আমরা বাংলাদেশে ঢুকলাম। স্থানীয়দের সহযোগিতায় জাহাজের সংখ্যা কত, কোথায় কোন পরিস্থিতি ইত্যাদি খোঁজখবর নিতাম। ১১ আগস্ট আমরা ৬০ জন কমান্ডো নিয়ে হরিণা দিয়ে ঢুকেছি। আমরা এগোতে শুরু করলাম আর সাংকেতিক গান কখন বাজবে অপেক্ষা করতে থাকলাম। যে গানটি সকাল ৬টায় বাজবে তা আবার সন্ধ্যা ৬টায়ও বাজবে। প্রায় ৭০-৭২ কিলোমিটার আমরা হেঁটেছি। সঙ্গে ৫ কেজি ওজনের লিমপেট মাইন, জাহাজে ক্ষত করার জন্য ধারালো অস্ত্র, সাঁতার কাটার জন্য প্লাস্টিকের ফিন, সাঁতারের পোশাক আর গামছা। আমি ২০ জন করে করে কমান্ডোদের তিন ভাগ করে দিলাম। কারণ ছয়জন একসঙ্গে গেলে মারা পড়লে অপারেশন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। আমার একজন স্থানীয় সহকারী ও এলাকার ছোট ছেলেমেয়েরা ধান খেতের মধ্য দিয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে দেয়, আমরা সেই পথ ধরে এগোতে থাকি। ১৩ আগস্ট সীতাকুণ্ডে পৌঁছে আমি আর ডা. শাহ আলম একটি হিন্দু বাড়ির কাঁচা ঘরের মেঝেতে শুয়ে ছিলাম। ভোরে আকাশবাণীতে ঘোষিত হলো ‘এবার শুনবেন পঙ্কজ মল্লিকের গান’। অমনি বেজে উঠল ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান’। শিহরিত হয়ে উঠি আমরা। গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। আমাদের প্রশিক্ষণের সময় বলে দেওয়া হয়েছিল আমাদের কাজ হলো জাহাজ ডোবানো বা ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া। আর এ অভিযান সব সময় রাত ১২টা-১টার মধ্যে পরিচালনা করতে হবে। আমরা লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর পরিকল্পনা শুরু করি। এরই মধ্যে সন্ধ্যা ৬টায় আবার গানটি বেজে ওঠে। ১৪ আগস্ট সকাল হতেই বৃষ্টি শুরু। আমরা খুব খুশি। কারণ আমরা সাঁতার কাটলে কেউ টের পাবে না। ভোরবেলা দ্বিতীয় গানটিও বাজল। রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আমার ৪০ জন কমান্ডো এসে জড়ো হয়। ২০ জন তখনো এসে পৌঁছায়নি। আমরা অপারেশনে যেতে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। চট্টগ্রাম শহর থেকে আমি আর আমার ডেপুটি নদীর ওপারে আনোয়ারায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। এপারে জেলের বেশে আগে থেকেই ৪০ জন কমান্ডো অপেক্ষা করছিল। সবাইকে এক জায়গায় করে একেকটি জাহাজের জন্য তিনজন করে ঠিক করে দিলাম। জাহাজের সামনে, মাঝখানে ও পেছনে যদি মাইন বিস্ফোরণ হয়ে বড় ধরনের গর্ত হয় তাহলে চোখের পলকেই তা ডুবে যাবে। আমি পলিথিনের ভিতরে করে ৬০টি ডেটোনেটর নিজে বয়ে নিয়ে গেলাম। এর একটি বিস্ফোরিত হলে মানুষের মৃত্যু অবধারিত। সেখানে ৬০টি ডেটোনেটর নিয়েছিলাম। কোন সাহসে যে এটা করেছিলাম আজ ভেবে বিস্মিত হই। ১২টার ঠিক ৫ মিনিট আগে সে াতে গা ভাসিয়ে দিয়ে আমরা জাহাজের দিকে রওনা দিলাম। জাহাজের গা ঘষে ক্ষত তৈরি করে সেখানে ম্যাগনেটিক মাইন লাগানো হলো। এরপর পিন টান দিয়ে খুলে সে াতে গা ভাসিয়ে আমরা অন্যদিকে যেতে থাকি। যাওয়ার সময় বন্দর পাহারারত পাকিস্তানি সৈনিকরা টের পেয়ে গুলি ছোড়ে। আমার কানের পাশ দিয়ে গুলি চলে যায়। দ্রুত পানি থেকে উঠে সাঁতার কাটার পোশাক পরা অবস্থায় আমরা দৌড়তে থাকি। ১৫ আগস্ট ভোরবেলা শুনতে পাই ‘দুষ্কৃতিকারীদের’ মাইনের বিস্ফোরণে জাহাজ ডুবে অচল হয়ে গেছে চট্টগ্রাম বন্দর। অপারেশন জ্যাকপট নামের এই নৌকমান্ডো অভিযান বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল বাঙালিরা অসাধ্য সাধন করছে এবং করতেই থাকবে। এভাবেই বিজয়ের সোনালি দরজায় পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। অনুলিখন : জয়শ্রী ভাদুড়ী।
বিডি প্রতিদিন

0Shares

সর্বাধিক ক্লিক