প্রচ্ছদ

আবু সিনা ছাত্রাবাস ভেঙ্গে হাসপাতাল নির্মাণ : কি ভাবছেন নেতৃবৃন্দ

১০ মে ২০১৯, ০২:৪১

sylnewsbd.com

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্তর্ভুক্ত নগরের ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা ছাত্রাবাস স্থলে নির্ধারিত ২৫০ শয্যার জেলা আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ কাজ নিয়ে নগর জুড়ে চলছে পক্ষ-বিপক্ষে যুক্তি-তর্ক-বিতর্ক এমনকি প্রতিবাদ। চলছে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিকও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আবু সিনা ছাত্রাবাস স্থলে জেলা হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধিতা করে মানববন্ধন ও সভা সমাবেশ। আবু সিনা ছাত্রাবাসের ঐতিহ্য রক্ষার দাবী জানিয়ে এই সব সংগঠন থেকে বলা হচ্ছে- এই স্থানে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হলে যানজট সমস্যা বৃদ্ধি পাবে। তেমনি ঐতিহাসিক নিদর্শনের স্মৃতি চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে জন্য এই স্মৃতি সংরক্ষণের কথা জানানো হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, গত বছর থেকে আবু সিনা ছাত্রাবাসটি খালি করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে ছাত্রাবাস ভবনটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে নোংরা পরিবেশ দেখা গেছে। ঝড় বৃষ্টি হলে ভবনের ফাটল স্থানে স্থানে ছুঁই ছুঁই করে বৃষ্টির পানি পড়ে। ছাত্রাবাস ভবনটি দাঁড়িয়া পাড়া এলাকায় অবস্থিত। সেখানে ছাত্রাবাস ভবন ব্যতিত পার্শ্ববর্তী স্থানের পশ্চিমে সিওমেক পরিচালকের বাসভবন, পশ্চিম ও দক্ষিণ এলাকা জুড়ে টিন শেড কলোনী, ৩ টি একতলা ও দোতলা বিল্ডিং রয়েছে। এসব কলোনীতে সিওমেক কর্মচারী, সিসিক কর্মচারী, কেউ কেউ দোকানী পরিবার নিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে বসবাস করছেন। আবু সিনায় জেলা হাসপাতাল নির্মাণের বিপক্ষে অবস্থানকারী ২/৩ টি সংগঠন পূর্ব থেকে যে ভাবে বিরোধিতা করে আসছে এই বিরোধিতার জবাবে হাসপাতাল নির্মাণের পক্ষে অবস্থানকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সেখানে দ্রুত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জোর তাগিদ দিয়ে জনসমর্থন অব্যাহত রেখেছেন।

আবু সিনা ছাত্রাবাস এলাকার কলোনীতে বসবাসকারী সুরগম আক্তার (৪৫), ফরিদ উদ্দিন (৫০), রাসেল মিয়া (৩০) বলেন, আবু সিনায় ছাত্রাবাস স্থলে হাসপাতাল নির্মাণ হোক এটি তাদেরও চাওয়া। তাদের মতে, ওসমানী হাসপাতালে বিপুল পরিমাণ মানুষ চিকিৎসা প্রত্যাশী অনেক কষ্ট করে সেবা পায়। সেখানে রোগীদের দুর্ভোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোগীদের ভিড়ে সেবা পাওয়া এখন কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে আবু সিনায় এমন কোন আজব ঐতিহাসিক স্থাপনা নেই। দাঁড়িয়া পাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো: শাহেদ (৩৮) বলেন, সদর হাসপাতাল ও ওসমানী হাসপাতাল অত্র অঞ্চলের রোগীদের চাহিদা পুরণ করতে পারছে না। সে জন্য আবু সিনা ছাত্রাবাসের চতুর্দিকে অবস্থিত কলোনী ভেঙ্গে জেলা হাসপাতাল নির্মাণ করা জরুরী।

এছাড়াও আবু সিনার পার্শ্বে অবস্থানকারী সরকারী কর্মকর্তার এক বৃদ্ধ কর্মচারী বলেন, ওখানে হাসপাতাল নির্মিত হলে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের উন্নতিতে সবাই লাভবান হবে। তিনি জানান, ওখানে আশ্চর্য্যজনক স্থাপনা নেই। এটি ভেঙ্গে হাসপাতাল হলে রোগীদের সমস্যা দূর হবে। পশ্চিম চৌহাট্টা মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড শাখা-৩ এর শ্রমিক উপ-কমিটির সেক্রেটারী মো: শাহজাহান বলেন, আবু সিনা ছাত্রাবাস এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণে তাদের কোন আপত্তি নেই। এটি প্রতিষ্ঠিত হলে এ অঞ্চলের সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা দ্বার খুলবে। কমিটির অপর এক সদস্য বলেন, এখানে হাসপাতাল হলে তাদের মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড নাকি উঠিয়ে দেয়া হবে এমন বেফাঁস কথাবার্তা তাকে শোনানো হয়েছে।

দাঁড়িয়া পাড়ার বাসিন্দা এডভোকেট অশেষ কর বলেন, অতীতকালে চৌহাট্টায় সিলেট সদর হাসপাতাল ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। আবু সিনা ছাত্রাবাসটিতে মেডিকেল কলেজ ছিল। এ চিত্র তিনি ছোটবেলা থেকে দেখেছেন। পরবর্তীকালে হাসপাতালটি কাজল শাহে স্থানান্তরিত হয়। এর নামকরণ হয় এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

আবু সিনা ছাত্রাবাস স্থলে হাসপাতাল নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি পক্ষ-বিপক্ষ তর্কে নিজেকে জড়াতে চান না। দাঁড়িয়া পাড়ার বাসিন্দা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিক্রম কর স¤্রাট জেলা হাসপাতাল নির্মাণ কাজ প্রসঙ্গে বলেন, সেখানে অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার দাবী অনেকেই করে যাচ্ছেন। এটি ২ নং ওয়ার্ড এলাকার অন্তর্গত। আবু সিনা ছাত্রাবাস এলাকায় অবস্থিত কলোনীগুলোকে এখন ভালো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্রাবাস স্থলে হাসপাতাল কাজ নিয়ে অনেকেই অতিরঞ্জন করছেন। ছাত্রাবাসটি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্তর্ভুক্ত এলাকা। পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান এড়িয়ে বলেন, আবু সিনায় হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু করার বিষয়টি সরকারই নির্ধারণ করবেন। সাবেক সিলেট পৌরসভা ও সদর উপজেলার প্রথম চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ বাবরুল হোসেন বাবুল আবু সিনা ছাত্রাবাসের দুইশত বছরের স্মৃতি রক্ষার পক্ষে মতামত জানিয়ে বলেন, ওখানে হাসপাতাল হলে যানজট তৈরি হবে। তিনি আরো বলেন, হাসপাতাল প্রকল্পটি টিলাগড়ে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) সিলেট শাখার সভাপতি, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) জেলা আহবায়ক, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা: রুকন উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারী সিলেট নগরীর আলীয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে জেলা হাসপাতাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন। তখন কেউ এর প্রতিবাদ করলেন না? তিনি আবু সিনায় হাসপাতাল নির্মাণের পক্ষে সাড়া দেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সেবার প্রভূত উন্নতিতে এই হাসপাতাল নির্মাণ হলে আগামীতে যুগপোযোগী অবদান রাখবে। তিনি বলেন, এটি প্রতিষ্ঠিত হলে সিওমেকে অতিরিক্ত রোগীর বোঝা কমে যাবে। জনগণ যাতে স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় সে দিকে সবার দৃষ্টি কামনা করেন। তিনি বলেন, আবু সিনায় হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের সময় বিএমএ কে অবগত করা হয়নি।

বিশিষ্ট কলামিষ্ট এডভোকেট আনছার খান আবু সিনায় ঐতিহ্য রক্ষাসহ সেখানে জেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা জানিয়ে বলেন, পক্ষ-বিপক্ষ উভয়কে নিয়ে অথবা সকল রাজনৈতিক ও পেশাজীবি সংগঠকদের সঙ্গে বৈঠক করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে। তিনি ঐ হাসপাতাল নির্মান কেন্দ্র করে যেভাবে পক্ষ-বিপক্ষ দাঁড় হচ্ছে তাতে বিরোধিতাকারীরা প্রধানমন্ত্রীর অর্জনকে নষ্ট করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এ নিয়ে উত্তেজনা কেন? তারা কি সিলেটের নিয়ন্ত্রক? আনছার খান বলেন, সেবার চাহিদা কিভাবে পূরণ করা যায়, সেদিকে কারো চিন্তা নেই।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য, সিলেট জেলা বারের সাবেক সভাপতি এডভোকেট এ এফ এম রুহুল আনাম চৌধুরী মিন্টু বলেন, আবু সিনা হাসপাতাল স্থলে নির্ধারিত জেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারাবাহিকতার অংশ। তিনি আরো বলেন, গত বছর এটির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। সিলেটের মানুষকে ভালোবাসেন বিধায় অত্র অঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতি পূরণ করতে প্রধানমন্ত্রী এই শুভ উদ্যোগ নেন। মিন্টু বলেন, যারা ঐতিহ্য রক্ষার নামে ছোট পরিসরে আন্দোলন করছেন তারা উন্নয়নে বাধা দিচ্ছেন। সচেতন সমাজের দায়িত্ব হলো ভালো কাজে সহযোগিতা করা। তিনি বলেন, এটা ইচ্ছা করে ঐতিহ্য রক্ষার দোহাই দিয়ে একটি মহল অসৎ ফায়দা লুটতে হাসপাতাল নির্মাণ কাজে বাধা দিচ্ছে। তিনি আশা করেন ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে ভালো কাজে সহযোগিতা দেবেন বিরোধিতাকারীদের প্রতি এই আহবান জানান।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ আবু সিনায় জেলা হাসপাতাল নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, সেখানে যতটুকু সম্ভব পুরাকীর্ত্তি রক্ষা করে হাসপাতাল নির্মাণ অত্যন্ত জরুরী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নগর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করে কাজ করা উচিত। আলী আহমদ আরো বলেন, জেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে স্বাস্থ্য সেবার চাহিদা পুরণ হবে।

সিলেট নগর বিএনপির সভাপতি মো: নাসিম হোসাইন বলেন, আবু সিনায় ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে সেখানে নির্ধারিত জেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, এটি নির্মিত হলে সিলেটবাসীর জন্য স্বাস্থ্য সেবার বড় সুযোগ পাওয়া যাবে।
সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সাংসদ শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, আবু সিনা ছাত্রাবাসটির ঐতিহ্য রক্ষা করে সেখানে জেলা আধুনিক হাসপাতাল নির্মান হোক এটি সবাই চায়। সে জন্য পক্ষ-বিপক্ষ বলতে এখানে কিছু নেই।

সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, সবার আগে সকলের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা, এ বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, আবু সিনা ছাত্রাবাসের ঐতিহ্য রক্ষা করে হাসপাতাল নির্মাণ হোক এটি তিনিও চান। কারণ সিলেটে সরকারী সীমিত জমি-জমা রয়েছে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে জনগণের চিন্তা ধারণা কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, যেমনি হাসপাতাল নির্মাণ জরুরী, তেমনি রোগীদের চিকিৎসাও জরুরী। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ বা বিতেের্কন প্রয়োজন কী? তিনি বলেন, এ হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আবু সিনায় জেলা হাসপাতাল নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর নির্ভর করে। এতে তিনি ব্যক্তিগত কোন মতামত নেই বলে সাফ জানিয়ে দেন।

জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লুৎফুর রহমান এডভোকেট বলেন, আবু সিনা ছাত্রাবাসটি পুরাকীর্ত্তির অংশ। এটি জাতীয় ভাস্কর্য হিসাবে যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে থাকবে। আবু সিনা ছাত্রাবাস স্থলে জেলা হাসপাতাল নির্মাণের মত না দিয়ে বলেন, সেখানে মেডিকেল মিউজিয়াম করা হবে। আর হাসপাতালটি ছাত্রাবাসের দক্ষিণ-পশ্চিমে অথবা সদর হাসপাতালের ভেতরে অনেক জায়গা আছে সেখানে জমি অধিগ্রহণ করে হাসপাতাল নির্মাণের নতুন প্রস্তাব দেন।

প্রসঙ্গত: ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারী সিলেট নগরীর আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯ টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্থর উন্মোচনের ১ টি ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল। ১৮৫০ সালে ইউরোপীয় সংস্থা আবু সিনা ছাত্রাবাস ভবনটি নির্মাণ করেন। তখন আবু সিনা নামকরণ ছিল না।
সৌজন্যে : সিলেট প্রতিদিন

সর্বাধিক ক্লিক