প্রচ্ছদ

আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির ভয় ও রহমতের আশা

১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:৩৯

329

মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী :: সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ। সালাত ও সালাম রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর বর্ষিত হোক। আল্লাহ যেহেতু স্রষ্টা ও প্রতিপালক আর বান্দা যেহেতু সৃষ্ট ও প্রতিপালিত সেহেতু আল্লাহ হলেন মাবুদ তথা উপাস্য আর বান্দা হলো আব্দ তথা উপাসনা ও দাসত্বকারী। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে আল্লাহর গোলামি প্রকাশ করার সময় অন্তরের মধ্যে তাঁর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান থাকতে হবে, এটাই স্বাভাবিকতা। ভালোবাসার কারণে যাকে ভালোবাসা হয় তার কাছে অন্যায় আবদার করা ও ভালোবাসার দাবিতে তার সব নির্দেশনা না মানারও একটা প্রবণতা সৃষ্টি হয়। অতএব, বান্দা যে আল্লাহকে ভালোবাসে সেই ভালোবাসা যেন এ রকম কোনো প্রবণতা সৃষ্টি না করে তার জন্য বলা হয়েছে আল্লাহর আজাবের ভয় ও রহমতের আশা দুটির মাঝখানেই ইমানের অবস্থান।

আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ভয় করেছে তার প্রতিপালকের সামনে হাজির হওয়াকে, আর নফসকে বারণ করেছে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে তার আবাসস্থল হলো জান্নাত।’ সূরা-নাজিয়াত। এ আয়াতে আল্লাহকে ভয় করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! যারা সীমা লঙ্ঘন করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার মালিক আল্লাহ। তিনিই ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী।’ সূরা জুমার। আল্লাহর আজাবের ভয় করা ও তাঁর রহমতের আশা করা দুটি গুণ একসঙ্গে অর্জন করতে হবে।
কারণ শুধু ভয় দূরত্ব সৃষ্টি করে। যেমন মানুষ সাপ, বাঘকে ভয় করে তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে তার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে এবং রক্ষা পাওয়ার সুযোগ আছে তবে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ থেকে দূরে থেকে তাঁর পাকড়াও থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। সেজন্য আল্লাহকে ভয় করে তাঁর থেকে দূরে সরে না গিয়ে বরং তাঁর নিকটবর্তী হয়ে তাঁর রহমতের আশাবাদী হয়েই তাঁর পাকড়াও তথা আজাব থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। মানুষ সব সময় আল্লাহর আজাবের ভয় ও রহমতের আশা করবে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, ‘মানুষ যখন সুস্থ ও আর্থিকভাবে সবল থাকে তখন আত্মনির্ভরশীলতার কারণে গুনাহ করার প্রবণতা বেশি থাকে; তখন গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আজাবকে বেশি ভয় করতে হবে। অন্যদিকে মানুষ যখন অসুস্থ ও আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যায় তখন গুনাহ করার প্রবণতা কমে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে ভালো আমল করার সুযোগও কমে যায়; সে সময় সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করে আল্লাহর রহমতের আশাবাদী হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আমোদ-প্রমোদ করার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ করা হলেও ফাঁসির শাস্তির ভয়ে সে যেমন আমোদ-প্রমোদ করার সমস্ত মানসিকতা হারিয়ে ফেলে তদ্রুপ আল্লাহর আজাবের ভয়ে ভীত বান্দা সমস্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অপরাধ করা তো দূরের কথা অপরাধের কাছেও যেতে চাইবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন বা পুলিশ প্রশাসন চাইলে বেশির থেকে বেশি প্রকাশ্য অপরাধকে দমন করতে পারে তবে গোপন অপরাধ দমন করা তো দূরের কথা এটা তো তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। তবে আল্লাহর আজাবের ভীতি মানুষকে গোপন পাপ থেকেও রক্ষা করে। বর্ণিত আছে, হজরত ওমর (রা.) জনগণের অবস্থা জানার জন্য একবার ফজরের কিছুক্ষণ আগে গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক কুঁড়েঘর থেকে একটি বয়স্ক মহিলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। হজরত ওমর (রা.) ব্যতিক্রম কোনো কিছু কিনা তা জানার জন্য কান পেতে শুনছিলেন। বয়স্ক মহিলা নিজের কন্যাকে বললেন, দুধ দোহন কি শেষ হয়েছে এবং দোহনকৃত দুধের পরিমাণ কত? কন্যা উত্তর দিল বকরি সামান্য পরিমাণ দুধ দিয়েছে। বয়স্ক মহিলা বললেন, ক্রেতারা তো পুরো পরিমাণই চাইবে। কন্যা বলল, বকরির থেকেই কম দুধ পাওয়া গেছে। বয়স্ক মহিলা বললেন, যাক, পরিমাণ পূর্ণ করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু পানি মিশিয়ে দাও। কন্যা বলল, মা! আমিরুল মুমিনিন ওমর তো এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করেছেন। বয়স্ক মহিলা বললেন, আমিরুল মুমিনিন ওমর তো এই সময়ে সব কাজ দেখছেন না। কন্যা বলল, মা! আমিরুল মুমিনিন দেখছেন না তবে আমিরুল মুমিনিনের আল্লাহ তো দেখছেন। এটা হলো আল্লাহর ভয়। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, হজরত ওমর (রা.) নিজের ছেলের সঙ্গে এই পবিত্রা কন্যার বিবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং এই বিদুষী মহিলাই ন্যায়পরায়ণতার জন্য ইতিহাসে খ্যাত হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নানী ছিলেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজন্যই আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার এমন ভয় কামনা করি যে ভয় আমি এবং আমার গুনাহের মাঝখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।’ যেহেতু বান্দা দুর্বল, চেষ্টা করার পরও গুনাহ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তখন বান্দা যাবে কোথায়? সেজন্য আল্লাহ বলেন, আমার রাগ থেকে আমার রহমতের গতিই বেশি দ্রুত। অতএব যতই গুনাহ হোক আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। ভয় ও রহমতের আশা দুটিকে ধারণ করে আল্লাহর গোলামি করতে হবে।
পেশ ইমাম ও ভারপ্রাপ্ত খতিব : বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ
সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বাধিক ক্লিক