প্রচ্ছদ

ইতিহাস বিকৃতকারীদের জন্য

১১ এপ্রিল ২০১৯, ০১:২৮

sylnewsbd.com

ইকরামুল কবির ::  মহান মুক্তিযুদ্ধে ডা. শামসুদ্দিন আহমেদসহ ৯জন শহীদ হয়েছিলেন সিলেট মেডিকেল কলেজে (বর্তমান শহীদ ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতাল), যারা বলছেন বর্তমান আবু সিনা ছাত্রাবাস সেখানে ডা. শামসুদ্দিন আহমেদসহ ৯জন শহীদ হয়েছিলেন তাদের জন্য ফাহিমা কানিজ লাভা’র লেখাটি মনযোগ দিয়ে পড়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। (উল্লেখ্য, বর্তমান আবু সিনা ছাত্রাবাস যেখানে অবস্থিত, ১৯৭১ সালে সেখানে মেডিকেল কলেজ ছিলো, হাসপাতাল নয়)

“কোথায় যাবেন আপনারা? আমরা ডাক্তার। আহত মানুষ ফেলে আমরা তো কোথাও যেতে পারি না।” কথাটি বলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাক্তার শামসুদ্দিন আহমেদ।
একজন চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব অসুস্থ-পীড়িত মানুষের সেবা করা, তাদের জীবন বাঁচানো। আর এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন মহান এ চিকিৎসক। মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুদ্দিন সিলেট মেডিকেল কলেজের শল্য (সার্জারি) বিভাগের প্রধান ছিলেন। যুদ্ধের সময় প্রাণভয়ে হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকেল কর্মীরা পালিয়ে গেলেও মানবতার খাতিরে থেকে গিয়েছিলেন শামসুদ্দিন। সহকর্মীরা চলে যাওয়ার সময় তাদের হাতে চিকিৎসার সরঞ্জাম তুলে দিয়ে শামসুদ্দিন বলতেন, “বাইরে গিয়ে মানবতার সেবা করো।” আর তাঁকে নিরাপদে হাসপাতাল ছেড়ে যেতে বললে বলতেন, আহত মানুষকে ফেলে তিনি যেতে পারবেন না। নিজের পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পাঠিয়ে দিলেও নিজে থেকে গেছেন যুদ্ধাহতদের, মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে। নিরাপত্তার কথা ভেবে ছুটি দিয়েছিলেন হাসপাতালের মহিলা নার্সদেরও। তাঁকে সাহায্য করার জন্য ছিল হাতে গোনা কয়েকজন। তাঁদের নিয়েই একের পর এক আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা করে গেছেন। বলতেন, ”আমরা যদি চলে যাই তবে মুক্তিবাহিনীর লোকদের সাহায্য করবে কারা?” এমনকি পানি, বিদ্যুৎ, ওষুধ- সব শেষ হওয়ার পরও চিকিৎসা দেওয়া বন্ধ করেননি ডা. শামসুদ্দীন। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা ইউনিটকে সাহায্য করে গেছেন নানাভাবে।
শহরে ভয়াবহ যুদ্ধ চলার সময়ে হাসপাতালের দিকে যাওয়ার পথে পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি ডা. শামসুদ্দীনকে প্রশ্ন করেছিলেন : “একি, আপনি এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালে যাচ্ছেন কেন?” হাসিমুখে শামসুদ্দিন বলেছিলেন: “ভাই, কিছু রোগী হাসপাতালে রয়ে গেছে। তাদের ফেলে কোথায় যাই বলুন। আমার শিক্ষাই যে মানবতার সেবা।” শামসুদ্দিনের চাচা মঈনউদ্দিন হোসেন হাসপাতালে না যাওয়ার জন্য হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন একবার। শান্ত হাসি হেসে তিনি বলেছিলেন, ”এখনই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। তাছাড়া জেনেভা কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী হাসপাতালে যুদ্ধ বা রক্তক্ষয় হওয়ার কথা নয়।”


নরম মনের এই মানুষটিই আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন ইস্পাতের মতো দৃঢ়। দেশকে স্বাধীন করার জন্য অস্ত্র ধরতে হবে বলে মনে করতেন শামসুদ্দিন। নিজের ছেলে জিয়াউদ্দিন আহমেদ (তখন মেডিকেল প্রথম বর্ষের ছাত্র) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে শামসুদ্দিন স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতেন। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে তরুণসমাজকে উদ্বুদ্ধ হতে বলতেন। তিনি তাঁর ছাত্রদের বলতেন, “এই রকম হিংসাত্মক কার্যক্রম ও গণহত্যার একমাত্র সমাধান– বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং তার জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।”

ঊনসত্তরের গণআন্দোলন চলাকালে একটা ঘটনা শামসুদ্দিন আহমেদের চরিত্রের দৃঢ়তা বোঝার জন্য যথেষ্ট। তখনও তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হামলা চালায়। এ হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ডা. শামসুদ্দীন আহমেদকে একটি মিথ্যা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। প্রবল চাপের মুখেও শামসুদ্দিন মাথা নত করেননি।


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সিলেটের নিম্বার্ক আশ্রমের সামনে পাকবাহিনীর সদস্যরা গুলি চালালে শহীদ হয়েছিলেন লাতু সেন। আহত হয়েছিলেন আরও ৫-৭ জন। হাসপাতালে আসা রোগীদেরই শুধু নয়, রাস্তাঘাট থেকে রোগী সংগ্রহ করে তাদেরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন ডা. শামসুদ্দীন। ৮ এপ্রিল ইতালির সাংবাদিক ও সাহায্যকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল ভারত থেকে তামাবিল দিয়ে সিলেট শহরে আসেন। শামসুদ্দীন আহমেদ তাঁদের গোটা হাসপাতাল ঘুরিয়ে নিরীহ নাগরিকের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ তুলে ধরেন। পাকিস্তানি হানাদারদের ঘৃণ্য আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে তিনি বক্তব্যও দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যটি রেকর্ড করা হয় এবং পরবর্তীতে ইতালির গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।
৩ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট শহর ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। সিলেট শহর আবার দখল করার জন্য ঢাকা থেকে অতিরিক্ত সেনা এনে ৭ ও ৮ এপ্রিল বিমান ও সেনাবাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালায় পাকবাহিনী। অবশেষে ৯ এপ্রিল পাকবাহিনী সিলেট শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আর সেদিনই হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার হন এ মহান চিকিৎসক।
৯ এপ্রিল ১৯৭১। হাসপাতালের পূর্ব দিকে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে পাকবাহিনীর ক্যাম্প। উত্তর পাশে টিলার উপর সিভিল সার্জনের বাংলো আর টিলার নিচে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা। সকাল ৯টায় মুক্তিবাহিনী সেই বাংলো ও মাদ্রাসা থেকে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি কনভয়ের উপর। এতে একটি জিপ উল্টে যায় এবং তিন পাকসেনা মারা যায়। বেপরোয়া পাকবাহিনী তখন পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের।
এদিকে পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে সিলেটের শত শত মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে আসে চিকিৎসার জন্য। সেদিন বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত রোগী এসেছিল যাদের অপরাশেন করা দরকার। কিন্তু রক্তের অভাবে অপারেশন করতে পারছিলেন না ডা. শামসুদ্দীন। এমন সময় মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয় মেজর রিয়াজসহ সশস্ত্র কয়েকজন পাকসেনা। মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ, ডা. শ্যামল কান্তি লালা, ডা. জিয়াউর রহমান, ওয়ার্ড বয় মাহমুদুর রহমান, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলীকে টেনেহিঁচড়ে সীমানা প্রাচীরের কাছে এনে দাঁড় করায়। আন্তর্জাতিক আইনে চিকিৎসক ও নার্স হত্যা অমার্জনীয় অপরাধ। শামসুদ্দীন আহমদ নিজের পরিচয় দিয়ে পাকসেনাদের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করেন। ওই সময় তাঁর এবং তাঁর প্রিয় ছাত্র ডা. শ্যামল কান্তি লালার বাহুতে ছিলো রেডক্রস ব্যাজ। ঘাতক সেনারা তাঁদের কোনো কথাই শোনেনি, রেডক্রসের ব্যাজ দেখেও তাঁদের রেহাই দেয়নি।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নিজের ব্যক্তিত্বে তখনও অনড় ডা. শামসুদ্দীন। নিজের জীবন ভিক্ষা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন অপারেশন থিয়েটারে রেখে আসা মুমূর্ষু রোগীদের অপারেশন শেষ করে আসতে। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানি সেনারা প্রথম গুলি তাঁকেই করে। প্রথম গুলিটি লেগেছিলো তাঁর বাম উরুতে, দ্বিতীয়টি পেটের বাম পাশে। তিনি তখনও দাঁড়িয়ে। তৃতীয় গুলিটি লাগে তাঁর বুকের বাম পাশে, হৃৎপিণ্ডে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ডা. শামসুদ্দীন। এরপর একে একে হত্যা করা হয় ডা. শ্যামল কান্তি লালা, ডা. জিয়াউর রহমান, ওয়ার্ড বয় মাহমুদুর রহমান, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলী, পিয়ন মো. মহিবুর রহমান, মকলিসুর রহমানসহ আরও দুজনকে। শহরে এরপর থেকে টানা কারফিউ। ১৩ এপ্রিল মাত্র এক ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলে কয়েকজন নিকটাত্মীয় এসে ডা. শামসুদ্দীনের পায়ের জুতা দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। হাসপাতালের ভেতর এক ফুট গর্ত করে দ্রুত তাঁকে সমাহিত করা হয়। অন্যদের মরদেহও পাশে সমাহিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর এই শহীদদের সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। আর তাঁর নামেই ‘শহীদ ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ সদর হাসপাতাল’ নামকরণ করা হয়েছে স্মৃতিময় সেই হাসপাতালটির। সিলেট মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসটির নামকরণ করা হয়েছে ’ডাক্তার শামসুদ্দিন হল’।
তবে দু:খের বিষয়, আজও ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ, ডা. শ্যামল কান্তি লালাসহ ৯ জন শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। সিলেটের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ৯ এপ্রিল এই শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসেও তাঁদের সমাধিতে সিলেটের মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
শামসুদ্দীন আহমেদ জন্মেছিলেন ১৯২০ সালের ১ আগস্ট মাসে আসামের করিমগঞ্জের বদরপুরে। তাঁর বাবার নাম ইমানউদ্দিন আহমদ এবং মায়ের নাম রাশেদা বেগম। তাঁর পুরো জীবন-বৃত্তান্ত এখানে আর বলছি না। আগামী ডিসেম্বরে আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগারের পক্ষ থেকে একটা বই প্রকাশ করতে যাচ্ছি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে। সেখানে আপনারা তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্যই পাবেন।
লেখক : সভাপতি সিলেট প্রেসক্লাব

9Shares

সর্বাধিক ক্লিক