প্রচ্ছদ

ঈদের রাজনীতি, ডেঙ্গু এবং চামড়া সিন্ডিকেট

১৩ আগস্ট ২০১৯, ২৩:৫৫

sylnewsbd.com

সোহরাব হাসান :: এবার ঈদের রাজনীতি তেমন জমেনি। ক্ষমতাসীন দলের দু-একজন নেতা ও মন্ত্রী ছাড়া সবাই নিশ্চুপ। আর বিরোধী দল তো নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত। তবে কিছুটা দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন বিএনপির নেতা রুহুল কবীর রিজভী ঈদের দিন দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজধানীতে মিছিল বের করে। এর আগে মন্ত্রী-মেয়ররাও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা মারা নিয়ে কামান দাগতে গিয়ে রীতিমতো নগরবাসীর ঘুম হারাম করেছিলেন।

ঈদের আগে সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল ডেঙ্গু, সড়ক ও রেলওয়ের অব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আর ঈদের পর যোগ হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস। সরকার চামড়ার দাম বেঁধে দিয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা। কিন্তু চামড়া বিক্রি হয়েছে অনেক কম দামে। এর ফলে চামড়া বিক্রির অর্থ যাদের পাওয়ার কথা অর্থাৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

ঈদের দিন পর্যন্ত মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে ভীষণ আতঙ্কে ছিল। ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ঈদের পরদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে প্রথম আলো খবর দিয়েছে, হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে । গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ১২০০ নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা যেমন কম হচ্ছে, সেই তুলনায় ছাড়পত্র নিয়ে বেশি মানুষ হাসপাতাল ছাড়ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তাঁর কথা সত্য হলে দেশবাসী স্বস্তিবোধ করবে। ডেঙ্গুর কারণে এবারে অনেক পরিবারকে হাসপাতালেই ঈদ পালন করতে হয়েছে। এর আগে মন্ত্রী ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশাকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আর ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের মেয়র মহোদয়েরা যেসব বয়ান দিয়েছেন, তাতে মানুষ আশ্বস্ত না হয়ে আরও শঙ্কিত হয়েছেন।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারা, মন্ত্রীরা বরাবরের মতো এবারও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন, সবার ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে। কিন্তু ঈদের আগে যাঁরা ঢাকা শহর ছেড়ে নাড়ির টানে ঘরে ফিরেছেন, তাঁরা বুঝতে পেরেছেন ভোগান্তি কাকে বলে। কোনো কোনো সড়কে ৮/১০ ঘণ্টা পর্যন্ত যানজট হয়েছে। ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছেছে নির্ধারিত সময়ের ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে। ফেরির দুই পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীদের আটকে থাকতে হয়েছে।

নির্বাচনের আগে ঈদে যেমন রাজনীতিটা জমজমাট হয়ে থাকে, এবারে তেমনটি হয়নি। দুই প্রধান দলের নেতা-কর্মীরা উদ্বেগে আছেন কাউন্সিল নিয়ে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই নতুন কাউন্সিলের ঘোষণা দিলেও দিন-তারিখ ঠিক হয়নি। বিএনপির সিদ্ধান্ত আসবে লন্ডন থেকে। আওয়ামী লীগ প্রাথমিকভাবে ঠিক করেছিল অক্টোবরে কাউন্সিল হবে। অবশ্য দলের কেউ কেউ বলছেন, ডেঙ্গু ও বন্যার কারণে অক্টোবরে সেটি না-ও হতে পারে। নির্বাচনের আগে বিএনপি যে বৃহত্তর জোট করেছিল, তা এখন অনেকটা নিষ্ক্রিয়। কোনো কোনো দল জোট ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, এসব সরকারের ষড়যন্ত্র। আবার আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, বিএনপির প্রকাশ্যে আন্দোলন করতে না পেরে এখন সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ঈদের আগে গুজবের জের ধরে বেশ কিছু গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছিল। আওয়ামী লীগ বলেছে, এর পেছনে বিএনপির ষড়যন্ত্র ছিল। কিন্তু কে কোথায় ষড়যন্ত্র করেছে, সে সম্পর্কে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

বিএনপির কোনো নেতা আন্দোলন করার ঘোষণা দিলে সরকারের অন্তত পাঁচজন মন্ত্রী এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজেন। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন, গত ১০ বছরে বিএনপি তিন মিনিটের জন্যও আন্দোলন করতে পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না। মন্ত্রীদের এসব কথাবার্তায় মনে হয়, দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তাঁদের ভালো লাগে না। এখন মন্ত্রীদের কথা কেউ শুনতে চান না। নির্বচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাদের কণ্ঠে যতটা তেজ ছিল, এখন তা নেই। ফলে কণ্ঠে জোর বাড়ানোর জন্যই সম্ভবত বিএনপিকে মাঠে নামাতে চান তাঁরা।

কিন্তু যে মন্ত্রীরা বলেন, বিএনপি তিন মিনিটও আন্দোলন করতে পারেননি, তাঁরা কি এই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন যে বিএনপির নেতারা মাঠে নামলে আর গায়েবি মামলা দেওয়া হবে না? বিএনপির নেতাদের বাড়িতে-অফিসে পুলিশ তল্লাশি চালাবে না? সরকারের চোখে বিএনপি খুবই দুর্বল দল। কিন্তু এই দুর্বল দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে ৬০/৭০টি মামলা দিয়ে রেখেছে সরকার। এর মাধ্যমে বিএনপি নয়, বরং সরকার নিজের দুর্বলতাই প্রকাশ করছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মিছিল করে ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে আবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছে এসে মিছিল শেষ হয়। দলের আর কোনো বড় নেতা মিছিলে ছিলেন না। মহাসচিব ঠাকুরগাঁওয়ে। কিন্তু বিএনপির অনেক বড় নেতা তো ঢাকায় ছিলেন। ফটো সেশন আর আন্দোলন যে এক নয়, সে কথা বিএনপির নেতারা বুঝতে চান না।

ঈদের আগের নানা সমস্যার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে চামড়ার দামে ধস। অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেটের কারণে বিক্রেতারা চামড়ার দাম পাননি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো। কেননা বেশির ভাগ কোরবানির চামড়া বিক্রি করে এসব স্থানে দান করা হয়। এবারে এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকায়। চামড়া বিক্রি না করে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে। কেবল চট্টগ্রামেই এক লাখ চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু চামড়াশিল্পের মালিকেরা মনে করেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে আড়তদারেরা লাভবান হলও তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের কারসাজির কারণেই কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম । এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে আওয়ামী লীগের এক বড় নেতা আছেন। কিন্তু তিনি তাঁর নাম উল্লেখ করেননি। তত্ত্বতালাশ করলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগের ওই নেতার সঙ্গে হয়তো বিএনপির কোনো নেতার ব্যবসা-বাণিজ্য আছে।

রিজভীর অভিযোগ, ‘যেভাবে পাটশিল্প ধ্বংস করা হয়েছে, ঠিক সেই পথেই ধ্বংস করা হচ্ছে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্প। কিন্তু রিজভী সাহেব হয়তো ভুলে গেছেন বিএনপি সরকারই আদমজী পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই, দেশের পাটশিল্প যদি বন্ধ হয়ে থাকে, তা আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি মিলেই করেছে।

আসলে কোনো কিছুই যে ঠিকমতো চলছে না, ডেঙ্গু নিরোধে সরকারের ব্যর্থতা, সড়কে রেলওয়েতে অব্যবস্থাপনা ও কোরবানির চামড়ার দামে ধস তার কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।

সোহরাব হাসান, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com
সৌজন্যে : প্রথম আলো

সর্বাধিক ক্লিক