প্রচ্ছদ

ঔষুধ ব্যবসায়ীরাও একটু মানবিক হোন

০৮ মার্চ ২০১৯, ১৭:৪৬

sylnewsbd.com

গোলজার  আহমেদ :: ঘটনা ক্রমে আমার গ্রামের বাড়ির একজন স্বজন খুব ক্রিটিক্যাল অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন গত ৬ তারিখে । ভর্তির পরপরই ডাক্তার রোগীর স্বজনদেরকে বলেন রোগীকে ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে না হলে রোগীকে বাচাঁনো যাবে না । হাসপাতালের ডাক্তার যথেষ্ট আন্তরিকতার সহিত রোগীকে পর্যবেক্ষনে রেখে রোগীর স্বজনদের কে তাগদা দেন রোগীর জন্য রক্ত ম্যানেজ করতে হবে পাশাপাশি অপারেশনের জন্য আনুসাঙ্গিক ঔষধ কিনতে হবে । ঘটনাটি ঐ দিন বেলা ২টায় । কিন্তু রোগীর সাথে আসা স্বজনরা হাসপাতালের করিডোরগুলো যেখানে চেনা মুশকিল সেখানে তারা রক্ত পরিক্ষা করে ঔষধ সংগ্রহ করাটা ছিল দুঃসাধ্য ব্যপার । এক হলো উনারা একদম সহজ সরল আর দ্বিতীয়তো হলো আর্থিক সংকট । হয়তো বা হাসপাতালে আসার সময় গ্রামের অন্য কারো কাছ থেকে টাকা ধার করে শুধু ভাড়াটা নিয়ে এসেছেন । ঐ দিন বিকেল সাড়ে ৪টায় আমার গ্রাম থেকে বেশ কয়েকজন মুরুব্বি একের পর এক ফোন দিতে থাকেন আমাকে । যাতে অসুস্থ রোগীকে একটু সহযোগীতা করি । কিন্তু আমার অফিস ব্যস্ততার কারনে আমি ঐ সময় যেতে পারিনি । কিন্তু ফোনে উনাদেরকে বলেছিলাম আপনারা আমাকে রক্তের গ্রুপটা বলেন আর আমি সন্ধ্যা ৭টার দিকে আসবো । আমি ফোনে ফোনে আপনাদেরকে সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি , কিন্তু উনারা কিছুুই করতে পারলেন না । প্রথমে বিষয়টা হালকা ভাবে নিয়েছিলাম কিন্তু পরে একজন নার্সের সাথে ফোনে কথা বলার পর বুঝলাম রোগী জীবন মরনের সন্ধিক্ষনে । তাই সাথে সাথেই হাসপাতালে রওয়ানা দিলাম , তখন বাজে সন্ধ্যা ৭টা ।

হাসপাতালে গিয়ে পরিচিত স্বজন করিমুল আজিজকে সাথে নিয়ে রোগীর রক্ত নমুনা সংগ্রহ করে খুব তাড়াতাড়ি রক্তের গ্রুপ জানলাম। রক্তের গ্রুপ এবি পজেটিভ হওয়ায় রক্ত মিলানোটাও কষ্টকর হয়ে গেল আমাদের জন্য । সিলেটের সবগুলো ব্লাড ব্যাংকে তথ্য নিয়ে কোথাও মিলাতে পারলামনা । অবশেষে গ্রীন লাইফ ব্লাড ব্যাংকে এক বেগ রক্ত পেলাম , সেটা কিনে রক্তের ক্রসচেক করতে করতে রাত ১০টা হয়ে গেল । কিন্তু ডাক্তার বার বার তাগদা দিচ্ছেন হাতে সময় নেই আপনারা কিছু একটা করেন দ্রুত না হলে রোগীকে বাচাঁনো যাবে না । এখনও বাকী আছে রোগীর পোষ্ট অপারেশন মেডিসিন গুলো কেনার । দ্রুততার সহিত বাহিরের ফার্মেসিতে গেলাম ঔষধ কিনতে । কিন্তু ফার্মেসিওয়ালারা এমন ভাব দেখাচ্ছিল যেন প্রেসক্রিপশনে বর্নিত ঔষধ গুলো মঙ্গলগ্রহে তৈরী হয় । কারো কাছে নাই । অবশেষে একটি ফার্মেসিতে ঔষধ পেলাম , কিন্তু খটকা লাগলো এক যায়গায় যে ঔষুধের দাম ১২ টাকা সেটি আমার কাছ থেকে ৮০০ টাকা রাখলো । আমি জেনেও না জানার ভান করে সব ঔষুধ নিয়ে আসলাম । এভাবে প্রায় অতিরিক্ত কম হলেও আমার কাছ থেকে ৭/৮ হাজার টাকা বেশি রাখলো । তাদের সাথে তর্ককরার সময় ছিলনা আগে আমার রোগিকে বাচাঁতে হবে । যাক অবশেষে রাত ১১টায় রোগীর অপারেশন শেষ হল । অনেকটা ভাল ভাবে শেষ হলেও অপারেশনের ৪/৫ ঘন্টা পর রোগীর শারিরীক অবস্থার অবনতি হল ।
আমি তার আগেই রাত ২টায় বাসায় ফিরলাম , কিন্তু সকাল বেলা আবার রোগীর স্বজন ফোন দিয়ে জানালেন রোগীর অবস্থা খারাপ , তাকে আইসিউতে নিতে হবে । পরের দিন (গতকাল ) সকালে আবারো হাসপাতালে যাই এবং বেলা ২টার মধ্যেই রোগীকে হাসপাতালেই আইসিইউর ব্যবস্থা করে দেন কর্তৃপক্ষ । তবে আমাকে তখন পুরোটাই সহযোগীতা করেছেন বিএনএ সিলেটের সাধারণ সম্পাদক সাদেক ভাই এবং সংগঠনটির সভাপতি সেবিকা শামিমা নাছরিন আপা , তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাদের চেষ্টায় আমি আইসিউর জন্য যে সব জিনিস পত্র কেনা লাগে সেগুলোও দ্রুত ম্যানেজ করতে পারি, বেশ অর্ধেক কিনতে হয়েছে বাহির থেকে বাকি যা তা ম্যানেজ করে দিয়েছেন শামিমা আপাই । প্রত্যেক মানুষের সাথে শুধু ভাল আচরণ টুকু করলেই সব যায়গায় সমান সহযোগীতা পাওয়া সম্ভব এটি দেখিয়ে দিয়েছেন সেবিকা শামিমা আপা ।

এগুলো করতে করতে বিকেল ৩টা হয়ে যায় । তারপর আমি গেলাম ঐ ফার্মেসিতে রাতে যেখান থেকে ঔষুধ কিনেছিলাম । গিয়ে ফার্মেসির ম্যানেজারকে ডাকালাম, ডেকে বললাম আপনারা মানুষকে জিম্মি করে টাকা ইনকাম করা বন্ধ করবেন কি না , উনি পুরো বিষয়টি জেনে ক্ষমা প্রার্থী হলেন আর বললেন ভাই আর কখনো এরকম হবে না । আমি উনাদের সবাইকে ডেকে বললাম আপনার ওয়াদা করেন যে গ্রাম থেকে আসা হত দরিদ্র মানুষদের আর কখনো ঠকাবেন না । তাহলেই আমি বিষয়টি মিমাংশা করবো না হলে মামলাতে যাবো । কারন তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার যথেষ্ট প্রমান আছে । যাক অবশেষে ফার্মেসির সবাই এক বাক্যে নিজেদের ভুলটুকু স্বীকার করে নিল আর বলল কখনো আর দরিদ্র মানুষের সাথে তারা প্রতারণা করবে না । আসার সময় তাদেরকে একটা কথা বলে এসেছি যে আল্লাহ তাআলা কিন্তু সবার বিচার করেন এইটা মনে রাখবেন ।

আজও হাসপাতালে গেলাম , রোগীর জন্য আমি তিনদিন থেকে আমার সবকিছু দিয়ে যেমন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সহযোগীতা করার তেমনি হাসপাতলের ডাক্তার, নার্স সহ সবাই আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের সবটুকু দিয়ে রোগীকে সুস্থ করে তোলার , রোগীর অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন, দোয়া চাই সবার কাছে । বাঁচা মরা সৃষ্টিকর্তার হাতে । সৃষ্টিকর্তাই আশা ভরসার শেষ যায়গা । তারপরও বলি মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য ।

হাসপাতালে এসে মানুষ কেন হয়রানির শিকার হয় তা এই তিনদিনে বেশ অনুভব করতে পেরেছি । কিন্তু হয়রানির জন্য শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ি করলে সেটি ভুল হবে । হাসপাতাল এলাকায় হয়রানি দুর করতে হলে সবার সমন্নিত প্রচেষ্টা দরকার তা না হলে একদিন আপনি আমি সবাই এসবের মুখোমুখি হবো । হাসপতাল কর্তৃপক্ষ যেমন সব দিক থেকে আরেকটু সচেতন হওয়া দরকার তেমনি হাসপাতালের বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী , সংশ্লিষ্টজন , ঔষুধ ব্যবসায়ীরাও একটু মানবিক হওয়ার দরকার ।
লেখক : সাংবাদিক ( উনার ফেইসবুক থেকে নেওয়া )

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

সর্বাধিক ক্লিক