প্রচ্ছদ

কীভাবে সাংবাদিক হলাম

১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:২৫

sylnewsbd.com

ইমদাদুল হক মিলন :: আমার সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার গুরু একজনই। তাঁর নাম রফিক আজাদ। বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি। রফিক আজাদের সঙ্গে পরিচয় হলো ১৯৭৬ সালে। তিনি তখন বাংলা একাডেমির পাক্ষিক সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ সম্পাদনা করেন। আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছিল সেই পত্রিকায়। ফাঁকে এমন সম্পর্ক হলো রফিক ভাইয়ের সঙ্গে, প্রতিদিনই আমি তাঁর পেছন পেছন ঘুরছি। বাংলা একাডেমিতে তাঁর রুমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিচ্ছি। দুপুরে একসঙ্গে খাচ্ছি। বিকাল সন্ধ্যা রাত কোথাও না কোথাও আড্ডা দিচ্ছিই। এসব আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য নিয়ে নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন রফিক আজাদ। একজন ভালো লেখকের কী কী করতে হয়, কোন ধরনের বই পড়তে হয় ইত্যাদি নানা ধরনের প্রসঙ্গে কথা বলে যাচ্ছেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেসব শুনছি। তিনি যেসব বইয়ের নাম বলেন সেগুলো জোগাড় করে পড়ছি। কী কী পড়ছি সেসব আবার রফিক ভাইকে জানাচ্ছি। তিনি মাঝে মাঝে পরীক্ষাও নিচ্ছেন, আমি ঠিকঠাক বলছি নাকি উল্টোপাল্টা করছি। দুয়েকবার মিথ্যা বলে ধরাও পড়েছি। রফিক ভাই রাগ করেননি। হেসে বলেছেন, লেখক-সাহিত্যিকরা একটু-আধটু মিথ্যা কথা বলেই, তাতে কিছু যায় আসে না। ততদিনে রফিক আজাদের চরিত্রের এমন এমন সব দিক আমার কাছে উদ্ভাসিত হয়েছে, রফিক আজাদকে আমার মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। এমন নেশা ধরানো চরিত্র, রফিক আজাদের নেশায় আমি পাগল। জগন্নাথে অনার্স পড়ছি। বিষয় অর্থনীতি। ক্লাস আমি করিই না। রফিক আজাদের পেছন পেছন ঘুরি। কোনো কোনো দিন বেশি রাত হয়ে গেলে তাঁর বাসাতেই থেকে যাই। তিনিও এমন ভালোবেসে ফেলেছেন আমাকে, আমাকে ডাকেন বেটা। অর্থাৎ পুত্র। আমার মতো আরেকজন আছেন তাঁর নেশায় মগ্ন হয়ে। তাঁর নাম সেলিম আল দীন।

দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেল। আটাত্তর সালের মাঝামাঝি সময়ে রফিক ভাই একদিন বললেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সাহেব একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করবেন। আমি সেখানে পার্টটাইম কাজ করব। চল যাই। এক বিকালে রফিক ভাই আমাকে নিয়ে এলেন ইত্তেফাক ভবনে। রাহাত খানের রুমে বসে অনেকক্ষণ আড্ডা চা এবং সাপ্তাহিক পত্রিকাটি নিয়ে আলোচনা হলো। মূল দায়িত্বে থাকবেন রাহাত খান। যেহেতু তিনি ইত্তেফাকে কাজ করেন সেহেতু তিনি থাকবেন নেপথ্যে। মূল কাজ করতে হবে রফিক ভাইকে। পত্রিকার নাম ঠিক হয়েছে ‘রোববার’। তখন শাহাদাত চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ প্রকাশিত হতো দৈনিক বাংলা ভবন থেকে। খুবই জনপ্রিয় সাপ্তাহিক। ওদিকে গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, আমাদের মনু ভাই তার মাসিক ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকাটি সাপ্তাহিকভাবে করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই পত্রিকার দায়িত্বে কবি বেলাল চৌধুরী। এই দুই পত্রিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে রোববার। রফিক ভাই তাঁর মতো করে পত্রিকা গোছাতে লাগলেন। প্রকৃত অর্থে তিনি নির্বাহী সম্পাদক। যেহেতু বাংলা একাডেমিতে চাকরি করেন সেহেতু রোববারে তাঁর নাম ব্যবহার করতে পারবেন না। নাম ছাড়াই কাজ করবেন। রোববারের প্রকাশক ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সাহেবের স্ত্রী সাজু হোসেন আর সম্পাদক আবদুল হাফিজ নামে এক ভদ্রলোক। তিনি পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। পৃথিবীবিখ্যাত কিছু বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন। অত্যন্ত সজ্জন মানুষ। মাস-দুই মাসে এক-আধবার রোববার অফিসে আসতেন।
এই পত্রিকায় জীবনের প্রথম চাকরি আমার। আমি রোববার পত্রিকার জুনিয়র রিপোর্টার। বেতন ৪০০ টাকা। গভীর উৎসাহ নিয়ে জুনিয়র রিপোর্টারের জীবন শুরু করলাম। বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানের রিপোর্ট লিখি। মঞ্চনাটকের রিপোর্ট লিখি। এসবের ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত একটি কলাম লিখি। কলামের নাম ‘আশেপাশে’। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন রকম মানুষের প্রতিদিনকার জীবনের চিত্র লিখি। কলামটা খুব জনপ্রিয় হলো। রিপোর্টগুলো লিখতাম অনেকটা গল্পের আঙ্গিকে। প্রথম সংখ্যায় লিখেছিলাম শেরপুর সাহিত্য সম্মেলন নিয়ে। ওই লেখার খুব প্রশংসা করেছিলেন শহীদজননী জাহানারা ইমাম।

বছর দেড়েক রোববারে চাকরি করে চলে গিয়েছিলাম জার্মানিতে। ‘আশেপাশে’ কলামটি লেখার ভার দিয়ে গেলাম শাইখ সিরাজকে। শাইখকেও খুব পছন্দ করতেন রফিক আজাদ। জার্মানি থেকে ফিরে এলাম একাশি সালে। রফিক ভাই আবার রোববারে জয়েন করতে বললেন। এবার বেতন ৭০০ টাকা। দ্বিতীয় কিস্তিতে মাস চার-পাঁচেক চাকরি করা হয়েছিল। চাকরি চলে গেল পুলিশদের নিয়ে একটা রিপোর্ট লেখার কারণে। বেশ ভালোই ঝামেলা বাধিয়ে ফেলেছিলাম। পুলিশের তখন অ্যাডিশনাল আইজি ছিলেন লেখক আবুল খায়ের মোসলেহ উদ্দীন। তিনি আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করলেন। কিন্তু চাকরিটা চলে গেল। সাংবাদিক জীবনে বড় রকমের ছেদ পড়ল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম গল্প উপন্যাস লিখে জীবন ধারণ করব। সাহিত্যকর্মই হবে আমার পেশা। সেভাবেই চলছিলাম। একসময় দেখি এই জায়গাটায় পায়ের তলার মাটি ভালো রকম শক্ত হয়েছে। চাকরি-বাকরির দরকার নেই। তারপর হঠাৎ করেই নব্বই সালে পাক্ষিক ‘তারকালোক’ সম্পাদক আরেফিন বাদল ডাকলেন। একটি মাসিক ছোটদের পত্রিকা করবেন। পত্রিকার নাম ‘কিশোর তারকালোক’। আমাকে তিনি সেই পত্রিকার সম্পাদক করতে চাচ্ছেন। সপ্তাহে একদিন দুইদিন গেলেই হবে। বেতন দেবেন ৫ হাজার টাকা। বছর দেড়েক সেই চাকরিটা আমি করেছিলাম। তার পরও সাহিত্যকর্মের ফাঁকে ফাঁকে একধরনের সাংবাদিকতার কাজ আমি করেছি। একবার ওয়ার্ল্ডকাপ ফুটবলের সময় জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক আমাদের সাংবাদিকতা জগতের এক মহীরুহ তোয়াব খান ডেকে বললেন, প্রতি রাতে ওয়ার্ল্ডকাপ দেখে পরদিন একটা রিপোর্ট লিখতে হবে। তিনি জনকণ্ঠের ফার্স্ট পেজে সেই লেখা ছাপবেন। মহা উৎসাহে কাজটা আমি পুরো ওয়ার্ল্ডকাপের সময়জুড়ে করেছি। নড়াইল বেড়াতে যাব ১০ দিনের জন্য। তোয়াব ভাই বললেন, ওই এলাকা নিয়ে ১০টি রিপোর্ট লিখবে। ফিরে এসে লিখলাম সেই লেখা। একবার বন্যার সময় তোয়াব ভাই বললেন, প্রতিদিন ঢাকার চারপাশে ঘুরবে। রিপোর্ট লিখবে। সেই রিপোর্ট আমি তোমার নামে ফার্স্ট পেজে ছাপব। প্রায় দেড় মাস করলাম সেই সাংবাদিকতা।

২০০১ সালের ইলেকশনের সময় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ডাকলেন। আমি আপনাকে একটা গাড়ি দিচ্ছি, আর হাতখরচ যা লাগে নেবেন। প্রতিদিন সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবেন, বিকালের মধ্যে ফিরে এসে রিপোর্ট লিখবেন, ঢাকার চারপাশের জেলাগুলোতে বা এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বা ক্যান্ডিডেটদের মধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি কেমন চলছে এই হচ্ছে আপনার রিপোর্টিংয়ের বিষয়। নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত ফার্স্ট পেজে আপনার নামে রিপোর্ট ছাপা হবে। দিন বিশেক করলাম এই রিপোর্টিংয়ের কাজ। তারপর ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় নিয়ে গেল রশীদুন-নবী বাবু। সে আমাদের চাঁদের হাটের ছেলে। একসময় ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করেছে। ‘আজকের কাগজে’ কাজ করেছে। সাংবাদিক হিসেবে বেশ সুনাম আছে। আমাকে সে নিয়ে গেল রিপোর্ট লেখাবার জন্য নয়, সাহিত্য এবং ছোটদের পাতা দেখবার জন্য। আর পাঠক সংগঠন তৈরি করবার জন্য। পদ দেওয়া হলো যুগ্ম সম্পাদক। কাজটা আমি বেশিদিন করিনি। পরিবেশটা আমার ভালো লাগেনি। তবে ওই পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে তিনজন মানুষের সঙ্গে খুব হৃদ্যতা হয়েছিল। আতাউস সামাদ, মুস্তাফিজ শফি ও চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম। পরবর্তীতে শফি এবং আফতাব ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় আমার সহকর্মী। আমার দেশে কাজ করার সময় মুস্তাফিজ শফি লক্ষ্য করেছিলেন সারা দেশের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বড় রকমের একটা সংগঠন আমি করতে চাই। আবেদ খানকে নিয়ে মুস্তাফিজ শফি যখন কালের কণ্ঠের পরিকল্পনা করছেন, বসুন্ধরা গ্রুপ যখন কালের কণ্ঠ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবেদ খানের সঙ্গে মুস্তাফিজ শফি তখন আমার ওই সংগঠন ইত্যাদি করার ব্যাপারে আলাপ করেছিলেন।

শুনে আবেদ ভাই মহা উৎসাহী হলেন। শফির মাধ্যমে আমাকে ডাকলেন। এখানেও যুগ্ম সম্পাদকের পদ। আমার কাজ হলো সারা দেশ ঘুরে ঘুরে ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকাটি প্রমোট করা। আর যে সংগঠনের স্বপ্ন দেখেছি সেই সংগঠন তৈরি করা, করলাম। সংগঠনের নাম দিলাম ‘শুভসংঘ’। শুরু হলো আমার এক নতুন জীবন। ‘কালের কণ্ঠ’ প্রকাশের দেড় বছরের মাথায় আবেদ ভাই চলে গেলেন। বসুন্ধরা গ্রুপের মাননীয় চেয়ারম্যান জনাব আহমেদ আকবর সোবহান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর জনাব সায়েম সোবহান আনভীর আমাকে কালের কণ্ঠের সম্পাদক নিযুক্ত করলেন। ২০১১ সালের জুলাই মাস থেকে আমি এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। এই হচ্ছে আমার সাংবাদিক জীবন।

লেখক : কথা সাহিত্যিক, সম্পাদক-কালের কণ্ঠ।
সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বাধিক ক্লিক