গানের শিক্ষক থেকে মহানায়ক উত্তম কুমার

সেপ্টেম্বর ০৩ ২০১৮, ২০:১৭

অনলাইন ডেস্ক :বাংলা চলচ্চিত্রে এখনো সমসাময়িক মহানায়ক উত্তম কুমার। অভিনয়, অকৃত্রিম সৌন্দর্য ও তারকাদ্যোতিতে এখনো তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ আসন দখল করে আছেন। বেঁচে থাকলে আজ ৯২ বছর বয়সে পা ফেলতেন কিংবদন্তি এই অভিনেতা।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন উত্তম কুমার। তাঁর পারিবারিক নাম অরুন কুমার। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একসময় হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক।

গানের শিক্ষক হিসেবে শুরু

বেশ অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন উত্তম কুমার। তাঁর বাবা সাতকড়ি চট্রোপাধ্যায় সামান্য বেতনে সংসার চালাতেন। উপায় না দেখে উপার্জনে নেমে পড়েন উত্তম কুমার। পড়াশোনার পাশাপাশি গানের শিক্ষকতা শুরু করেন। সবচেয়ে লোভনীয় প্রস্তাব পেলেন অল্প দিনেই। গান শেখাতে হবে গাঙ্গুলী বাড়ির মেয়ে গৌরী দেবীকে। বেতনও বেশ ভালো, মাসে ৭৫ টাকা। আগে থেকে চেনাজানা হলেও শিক্ষকতা করতে গিয়ে কাছে এলেন উত্তম-গৌরী। পরবর্তীতে এই গৌরি দেবীই হন উত্তম কুমারের ঘরণী।

শৈশব থেকেই মঞ্চ নাটকের প্রতি আগ্রহ জন্মে উত্তম কুমারের। সেখান থেকে রুপালি পর্দায় অভিনয়ের ঝোঁকটা ক্রমেই বেড়ে চলে। ১৯৪৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র `মায়াডোর`-এ অভিনয়ের সুযোগ মিলে ৷ তবে পার্শ্ব চরিত্রে। দৈনিক মাত্র পাঁচ পয়সা চুক্তিতে ওই ছবিতে অভিনয় করলেন উত্তম। কিন্তু `মায়াডোর` মুক্তি পেল না। ১৯৪৮ সালে পেলেন আরেকটি সুযোগ। `দৃষ্টিদান` ছবিতে নায়কের অল্প বয়সের চরিত্রে। কিন্তু দর্শকমনে তেমন দাগ কাটতে পারননি উত্তম। পরের ছবি `কামনা`। ১৯৪৯ সালে মুক্তি পায় ছবিটি, কিন্তু সেটিও সুপার ফ্লপ। পরের দুই ছবি `মর্যাদা` ও `ওরে যাত্রী`ও বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে।

একের পর এক ছবি ফ্লপ হচ্ছে, তবুও হাল ছাড়েননি উত্তম কুমার। সে সময় তাঁর হাতে ছিল `সহযাত্রী` ও `নষ্টনীড়` ছবি। মন-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করলেন। ফল আগের তিনটির মতোই, ফ্লপ। ছবি ফ্লপ করছে কিন্তু সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন ৷ বিষয়টি ভালোভাবে নিল না অনেকেই। আড়ালে-আবডালে তাঁকে ডাকা শুরু হল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বা ‘এফএমজি’ বলে। নামটা রটে গেলে সিনেমাপাড়ায়। সঙ্গে গণমাধ্যমের সমালোচনা।

ফ্লপ মাস্টার তকমা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিলেন উত্তম কুমার। তখনো চলচ্চিত্রে তাঁর নাম অরুন কুমার। ‘মর্যাদা’ শিরোনামের একটি ছবিতে নায়ক হলেন। তবে পরিচালকের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নাম পাল্টে হলেন অরূপ কুমার। তাতেও কাজ হল না। ‘সহযাত্রী’ ছবিতে অভিনয় করছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ি সান্যালের সঙ্গে। শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডায় পাহাড়ি সান্যাল হঠাৎ বলে বসলেন-‘তুমি অরুণ নও হে, তুমি যে উত্তম, উত্তম কুমার।’ তার পরামর্শে নাম পাল্টে হয়ে গেলেন উত্তম কুমার। নাম বদলের প্রথম ছবি সহযাত্রীতেও সাফল্য ধরা দিল না। ১৯৫১ সালে তাঁর করা `সঞ্জীবনী`ও ফ্লপ হল। এরপর `বসু পরিবার` ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় না করে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেন। এই প্রথম কোনো ছবির জন্য প্রশংসিত হলেন উত্তম কুমার।

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয়ের আগ পর্যন্ত উত্তম কুমার ছয় বছরে নয়টি ছবিতে অভিনয় করেন। ছবিগুলোর ৯ নায়িকার মধ্যে আটজনই ছিলেন উত্তমের বড়। ছোট ছিলেন একমাত্র সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। মায়া মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ছবি রায়, মনীষা দেবী, করবী গুপ্ত, ভারতী দেবী, সনিন্দা দেবী, সন্ধ্যা রানী ও মঞ্জু দে- আটজনকেই উত্তম ‘দিদি’ বলে ডাকতেন। অনেকেই মনে করেন, বয়সে বড় নায়িকাদের সঙ্গে অভিনয় করায় উত্তমের শুরুর কেরিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

১৯৫৪ সালে মুক্তি পায় উত্তম কুমার অভিনীত ১৪টি ছবি। তার মধ্যে সাতটিই সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে। `দৃষ্টিদান` দিয়ে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ৩৩ বছরে বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে প্রায় আড়াইশ` ছবিতে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার। প্রথম ছবিতে মায়া মুখোপাধ্যায়, সর্বশেষ `ওগো বধূ সুন্দরী`তে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়-সহ সর্বমোট ৪৬ জন নায়িকা তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন।

১৯৫৪ সালে `ওরা থাকে ওধারে` ছবি দিয়ে উত্তম-সুচিত্রা জুটি পাকাপাকিভাবে দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নেয়। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রিয় বান্ধবী’ ছবি দিয়ে তাঁদের জুটি শেষ হয়। ২২ বছরে মুক্তি পেয়েছে উত্তম-সুচিত্রা জুটির সর্বমোট ৩১টি ছবি। কিন্তু রূপালি পর্দার বাইরে কেমন ছিল তাদের সম্পর্ক? পেশাগত, নাকি বন্ধুত্বের? নাকি আরও কিছু? এসব প্রশ্নের শুরু হয়েছে অনেক আগেই, শেষ হয়নি কখনও। সুচিত্রা সেনের জীবনের শেষ ছবি হতে পারত উত্তমের সঙ্গে; এমনকি উত্তমেরও। ১৯৬২ সালের পর তাঁরা একসঙ্গে ছবি করা কমিয়ে দেন। সুচিত্রা কেনই বা সিনেমা জগৎ ছেড়ে চলে গেলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, তাও এক চিরকালীন রহস্য। স্ত্রী গৌরী দেবীকে ছেড়ে ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৮০ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে ছিলেন উত্তম কুমার।

‘সপ্তপদী’ ছবিতে উত্তম কুমার বাইকের পেছনে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে গেয়েছিলেন, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো’- ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিলে, বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের পথ চলা থামে। কিন্তু তাঁর পদচিহ্ন আজও অমলিন।



এ সংবাদটি 1322 বার পড়া হয়েছে.
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

sylnewsbd.com

Facebook By Weblizar Powered By Weblizar

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ ২৪ খবর

………………………………….

বিজ্ঞাপনের জন্য নির্ধারিত

....................................................................................... ..........................................

add area

Post Archive

November 2018
S S M T W T F
« Oct    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

সিলেট আরও