প্রচ্ছদ

জামালগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী কুস্তি খেলায় পাথর মালকে হারিয়ে ইটমাল চ্যাম্পিয়ন

০৭ নভেম্বর ২০১৮, ২২:৫৬

329

 

রেজাউল করিম রেজা, জামালগঞ্জ থেকে ফিরে:
সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার ভিমখালী ইউনিয়নের কলকতখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ঐতিহ্যবাহি কুস্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার সকাল ১০টায় কুস্তি প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং শেষ হয় বিকেল ৪টায়। ভাটি বাংলার ঐতিহ্যবাহি এ খেলাটি দেখতে সকাল থেকে এলাকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ কলকতখাঁ স্কুল মাঠে জড়ো হতে থাকে। এক সময় মাঠ কানায় কানায় লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এ প্রতিযোগিতা অংশ নেয় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উষনপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার কলকতখাঁ গ্রামের কুস্তি সংঘ। দিনশেষে উষনপুরের ইটমালের দলের কাছে কলকতখাঁ’র পাথর মালের দল পরাজয় বরণ করেন।
প্রতিযোগিতায় বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে কিছু কুস্তিয়ালের নাম ছিল, ইটমাল, পাথরমাল, রডমাল, পিচ্ছিমাল, লোহামাল, ঢাকাইয়ামাল ইত্যাদি। তারা প্রত্যেকেই মানুষ হলেও বিশেষ শক্তিশালীর অধিকারি হওয়ায় এলাকাবাসী তাদেরকে এমন নামেই ডাকেন। দ্’ুপক্ষের দ্’ুজন কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। একজন অপরজনকে কুস্তিতে হারালে বা জেতালে তাদের পক্ষের লোকজনরা দর্শক গ্যালারীতে তাকবীর ধ্বনি তুলে, নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি। প্রতিযোগিতার মাঠে ছিলেন তিনজন রেপারী। স্থানীয়রা এসব রেপারিকে আমিন বলে আখ্যায়িত করেন। তাদের সিদ্ধান্তই প্রতিযোগিতার চুড়ান্ত বলে গন্য হয়। প্রতিযোগিতায় দু’পক্ষের প্রায় শতাধিক জুটি অংশ গ্রহণ করে। অংশ নেয়া খেলোয়াড় ছিল তিন শ্রেনিতে বিভক্ত। পৌন্না অর্থাৎ কিশোর, সেনি দাগা অর্থাৎ যুবক এবং সব শেষে দাগা অর্থাৎ সেরা খেলোয়াড়।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাক ইউনিয়নের তলেরবন গ্রামের প্রবীন মুরব্বি আবদুস শাহিদ বলেন, তার বয়স এখন প্রায় ৮০ বছর হবে। তার জন্মের আগ থেকে এলাকায় কুস্তি খেলা হয়ে আসছে। তৎকালিন সেরা কুস্তিমাল হিসেবে এ অঞ্চলে পরিচিত ছিলেন মজুমদারমাল। বর্তমানে খেলাটি দক্ষিণ সুনামগঞ্জের মুর্তাখাই, জিগদারা, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর, শ্রীপুর, হাখাতি, কলাইয়া, নৌল্লা ও জামালগঞ্জের কলকতখাঁ, বিছনা, নোয়াগাঁও, মোহাম্মদপুর, ভান্ডা, নোয়াল্লটসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠ ছাড়াও তাহিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
কলকতখাঁ গ্রামের জয়নাল আবেদীন সামাদ জানান, জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আংশিক এলাকায় কুস্তি খেলা হয়ে আসছে। তিনি আরো বলেন, ভাটি এ অঞ্চলের জন্য কুস্তি একটি প্রথম এবং ঐতিহ্যবাহি খেলা। খেলাটি প্রায় ৮০বছর পূর্বে এলাকায় শুরু হয়। এরপর আসে ফুটবল, হা-ডু-ডু ইত্যাদি। তবে এ অঞ্চলে কুস্তির সাথে ফুটবল খেলাও জনপ্রিয়। কুস্তি খেলাটি বছরের ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক এবং জৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবন মাসে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শিমুলবাক ইউনিয়নের কাটালিয়া গ্রামের মজুমদারমাল, জামালগঞ্জ থানার ভিমখালী ইউনিয়নের কলকতখাঁ গ্রামের ইছাইমাল, ভিমখালী ইউনিয়নের বিছনা গ্রামের শিতারামালসহ আরো অনেকেই ছিলেন প্রথম এবং এলাকার শ্রেষ্ঠ কুস্তিমাল। তারা অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। তাদের পরবর্তী এবং বর্তমান প্রজন্ম এ ঐতিহ্যবাহি খেলাটি ধরে রেখেছেন। তাই ভাদ্র মাস এলে কুস্তি খেলোয়াড়সহ এলাকার উৎসুক মানুষ কুস্তি প্রতিযোগিতায় অন্যরকম মেতে উঠেন। তাদের কাছে ফুটবল ও কুস্তি উভয় খেলা জনপ্রিয়। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ অঞ্চলে ফুটবলের ন্যায় কুস্তি খেলাটি জেলাসহ সিলেট বিভাগজুড়ে আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে এমনটি মনে করছেন জামালগঞ্জবাসী।

সর্বাধিক ক্লিক