প্রচ্ছদ

তদন্তে সহায়তা, সম্পদ ফেরত, তাই সাজা ২০ বছর!!

০৭ মে ২০১৯, ০০:৩৮

sylnewsbd.com

মনজুরুল আহসান বুলবুল :; দুর্নীতির দায়ে তার জেল হয়েছে ২০ বছর। রাষ্ট্র নিয়ে নিয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সব সম্পদ। দল তাকে সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। আদালত বলছে, তিনি তদন্ত কাজে সর্বাত্মক সহায়তা করেছেন। নিজেই হিসাব-নিকাশ করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। এজন্য তার সাজা এত কম হলো!!!

যাকে এই দ- দেওয়া হলো তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক পর্যায়ের এক দাপটশালী নেতা।
চীনের জাতীয় দৈনিকে খবরটি কি একটু কম গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হলো? মাথা নেড়ে চীনা সাংবাদিক বন্ধুটি বললেন, মোটেই না। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহজুড়ে চীনজুড়ে ছিল দুটি বিশাল উৎসবের আমেজ। চীনের নৌবাহিনী উদ্যাপন করল তাদের প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর। এ উৎসবে যোগ দিতে পৃথিবীর প্রায় ৮০টি দেশের নৌবাহিনী প্রধান জমায়েত হন চীনে। বাংলাদেশের নৌবাহিনী প্রধানও এতে যোগ দেন। শ্যানডংয়ের চিংদাওতে চীনা নৌবাহিনীর ন্যাভাল প্যারেড পরিদর্শনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং সমুদ্রে শান্তির আহ্বান জানিয়ে যে বক্তব্য দেন, নৌবাহিনীর নানা কসরত প্রদর্শনের সঙ্গে তা-ই দখল করে রেখেছিল সংবাদপত্রের পাতা আর টেলিভিশনের পর্দা।

এর দুই দিন পরই বেল্ট অ্যান্ড রোড নিয়ে শীর্ষ সম্মেলন। এতে যোগ দেন বিশ্বের ৩৫টি দেশের সরকারপ্রধানসহ দেড় হাজার প্রতিনিধি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইউরোপিয়ানরা এই বেল্ট অ্যান্ড রোডকে যেমন ‘চীনা ঋণ কূটনীতির নতুন ফাঁদ’ বলছেন, অন্যদিকে চীনের মিত্ররা একে বলছেন, পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিপরীতে নতুন এক বিশ্বায়নের উদ্যোগ। শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং কয়েক শ ডলারের বিনিয়োগ ও সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিশ্বকে একমুখী নির্দেশনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চীনের এই নতুন সংযোগনীতি বিশেষত পৃথিবীর অনগ্রসর অঞ্চলকে নিজের মতো করে উন্নয়ন ভাবনার সুযোগ করে দেবে। একই সুরে কথা বলেন, শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আসা ভøাদিমির পুতিন, ড. মাহাথির মোহাম্মদের মতো নেতারাও। লাতিন আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রধান লুইস কারানেজাউইগ্রেচ বলছেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ-দক্ষিণ বা উত্তর-দক্ষিণ সহায়তা গোষ্ঠীর পাশে এই নতুন উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব উন্নয়ন প্ল্যাটফরম হয়ে উঠবে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নেতাদের মন্তব্য, কারও ঋণ ফাঁদে পা না দিয়ে নিজস্ব উন্নয়নের মেগা প্রকল্প নিয়ে নিজের মতো করে ভাবতে চীনের এই নতুন ভাবনা আমাদেরও নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দিচ্ছে।

শীর্ষ সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত ২৫ দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি দেওয়া বার্তায় শি জিন পিং এই কথাটিই বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড চীনের পরিকল্পনা হলেও এর অংশীদার গোটা বিশ্বই।

এই বিশাল ডামাডোলের মধ্যেও চীনের অভ্যন্তরীণ সমাজ কতটা শক্তিশালী সে প্রশ্নটি রাখি আলতোভাবে! মাঝবয়সী চীনা সাংবাদিক আমার খোঁচাটি কিছুটা বুঝতে পারেন বুঝি। তিনিও বেশ ঠান্ডা ভাবেই পা ফেলেন, কিন্তু দৃঢ়ভাবেই বলেন, প্রায় সোয়া শ কোটি মানুষের মৌলিক সব চাহিদা মিটিয়ে মহাশূন্য জয় করাটাই কি সাফল্যের বড় প্রতীক নয়? আগামী কয়েক দশকের মধ্যে চীন যে একক বিশ্বশক্তি হয়ে উঠছে সেই ইঙ্গিত কি বিশ্ব শুনতে পাচ্ছে না? সহমত পোষণ করে মাটির দিকে তাকাতে বলি। কিন্তু মুখের কথা কেড়ে নিয়েই পত্রিকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, দেখ প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন। স্টেট কাউন্সিলের টেলিকনফারেন্সে চীনের প্রধানমন্ত্রী লিকেকিয়াং বলছেন, ভালো প্রবৃদ্ধির জন্য চাই পরিচ্ছন্ন সরকার। সরকারকে সব বড় পরিকল্পনাগুলো যেমন বাস্তবায়ন করতে হবে, তেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধেও লড়াই জারি রাখতে হবে। চীনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাদের আরও জোরালো অবস্থান প্রত্যাশা করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি এ যুদ্ধটা চলমান রাখতে হবে। বিশেষ করে সরকারি তহবিল ও সম্পদ নিয়ে দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।

চীনের বাস্তবতায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিতরাই বড় বড় দায়িত্বে, সরকার আর দল অভিন্ন, কিন্তু দায়িত্ব আর জবাবদিহির ক্ষেত্রগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত। তবে যারা দুর্নীতি করেন তারা পার্টির এই পদ-পদবি এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই করেন। কিন্তু দুর্নীতি নিয়ে দলের সহজ সমীকরণটি হচ্ছে, একজন দলীয় কর্মী তার যোগ্যতা দিয়েই দলের নেতৃত্বে আসীন হন। দল তার ত্যাগ ও যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করেই তাকে বড় দায়িত্ব দেয়। কিন্তু দায়িত্ব ও ক্ষমতা পেয়েই যদি তার মাথা বিগড়ে যায়, সে অপকর্ম করে, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে সেটা তার ব্যক্তিগত দায়। দল তার সেই অপকর্মের দায় নেবে না। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিশাল দল। ক্ষমতায় দশকের পর দশক। কাজেই দলে বা সরকার পরিচালনায় দুর্নীতি নেই এমন নয়। দল এ অভিযোগ উড়িয়েও দেয় না। বরং কারও নামে এমন দুর্নীতির অভিযোগ এলে দল তার ওপর থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। দলের শৃঙ্খলা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। পাশাপাশি দেশের আইন চলে নিজস্ব গতিতে। অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করে আইন, দল বা রাজনীতি তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

শুরুতে যে দুর্নীতিবাজের শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তিনি এর একটি উদাহরণ মাত্র। তার রাজনৈতিক ক্ষমতার চিত্রটি দেখুন। তার নাম ওয়াং শিয়াও গুয়াং। তিনি গুইঝু প্রদেশের সাবেক ভাইস গভর্নর। তিনি গুইয়াংয়ের উডাং ডিস্ট্রিক্টের পার্টি সেক্রেটারি ছাড়াও দায়িত্ব পালন করেন ভাইস মেয়র হিসেবে। পার্টির প্রদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক, ভাইস মেয়র, দুটি অঞ্চলের পার্টি প্রধান এবং প্রাদেশিক পার্টির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে তার দায়িত্ব, ক্ষমতা ও দাপট ছিল অপরিসীম। চীনে দল ও সরকারের কাঠামো বিন্যাস সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা বুঝতে পারবেন, দলের এই নেতা কতটা দাপটশালী ছিলেন। ওয়াং শিয়াও গুয়াং নিজেও তার ক্ষমতা ও দাপট সম্পর্কে জানেন বলেই, তিনি নিজের দুর্নীতির জন্য এই পদ-পদবি ও দাপটের ‘সর্বোত্তম’ ব্যবহার করেছেন। তিনি জাল কাগজপত্র তৈরি করে এক হেক্টর জমি নিজের নামে লিখে নিয়ে সরকারি দফতরকে বাধ্য করেছেন চড়া দামে সরকারি কাজের জন্য ওই জমি কিনে নিতে। পরে অন্য এক কোম্পানির কাছে বিক্রি করে নানা কায়দায় জমির হাতবদল করিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৪৮ লাখ ইউয়ান (১ ইউয়ান = বাংলাদেশি ১২.৫৫ টাকা)। এই দাপুটে কর্মকর্তা তার রাজনৈতিক পদের প্রভাব খাটিয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সময়ে স্টক মার্কেটের অভ্যন্তরীণ তথ্য জেনে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের নামে ৪৯৫ ইউয়ান মূল্যের সমমানের শেয়ার কেনেন। নিজে ব্যক্তিগতভাবে ১৬ লাখের বেশি ইউয়ান পকেটস্থ করেন। এসব অপরাধ আমলে নিয়ে চংকিং গণআদালত (পিপলস কোর্ট) এই প্রবল দাপটশালী নেতাকে কুড়ি বছরের কারাদন্ড দিয়েছে এবং সাড়ে ১৭ লাখ ইউয়ান জরিমানা করেছে। আদালত তার মন্তব্যে বলেছে, যেহেতু অপরাধী দায় স্বীকার করেছেন, তদন্ত কর্মকর্তারা জানতেন না এমন অপরাধের তথ্য নিজেই জানিয়েছেন এবং অবৈধভাবে অর্জিত সব সম্পদ সরকারের হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়েছেন, সেজন্য আদালত তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে কিছুটা লঘুদন্ড দিয়েছে।

স্বভাবতই প্রশ্ন, লঘুদন্ড যদি এই হয়, তাহলে গুরুদন্ড হলে কী সাজা হতে পারত? জানালেন, দলের কোনো নেতা-কর্মী এ ধরনের দুর্নীতি করলে প্রথম সাজা সেই নেতাকে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া। দ্বিতীয় পর্যায় হলো আদালতের বিবেচনা। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদন্ড হতে পারত। আপিলে কি এই সাজা বাতিল বা বদল হতে পারে? যারা দলকে অপমানিত করে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের ভাগ্য গড়ে তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত সাজা বহাল থাকে বা বাড়ে। চীনা সাংবাদিক বললেন, চীনা সমাজে একজন নেতা যখন তার দলীয় দাপট, প্রভাব ব্যবহার করে দুর্নীতি করেন তখন সেই অপরাধের দায় দল নেয় না বা দল তাকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেয় না। এ অপরাধকে ব্যক্তিগত অপরাধ বলেই গণ্য করা হয়। বরং দলকে বিব্রত করার সাজা হিসেবে তার কাছ থেকে দলের সব দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। এতে দৃশ্যত আইনে তার রাজনৈতিক মৃত্যু হয়। এখানে যে নেতার কথা বলা হলো, নিচ থেকে যেসব পর্যায় অতিক্রম করে দলীয় উচ্চপদে আসীন ছিলেন তার সবই হারিয়েছেন তিনি। সব সম্পদ হারিয়ে ২০ বছর জেল খেটে বাইরে এসে তার পক্ষে আবার দলের ওই অবস্থানে যাওয়া বা আবার ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া এই জীবনে আর সম্ভব হবে না।

সরকারি দুর্নীতি সম্পর্কে চীনের প্রধানমন্ত্রী যে কথাটি বলেছেন, পরিচ্ছন্ন সরকারই উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। কাজেই রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দল যদি নিশ্চিত করতে পারে যে, দল বা পদের প্রভাব খাটিয়ে কোনো দুর্নীতি হলে তাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না, অথবা দলের নেতা-কর্মীরা যদি বুঝতে পারেন দুর্নীতি করলে আদালতের শাস্তির আগেই দল এমনতর সিদ্ধান্ত নেবে যাতে তার রাজনৈতিক মৃত্যু হবে, তাহলে দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা সহজ হয়। চীনারা এ কথা স্পষ্টভাবেই বলে, রাজনীতি যদি প্রশ্রয় না দেয় তাহলে আমলা বা সাধারণ মানুষ দুর্নীতি করার সাহসই পাবে না। চীনা সমাজে দুর্নীতি যেমন আছে, তেমন তার রাশ টেনে ধরার উদ্যোগগুলোও দৃশ্যমান। কয়েক বছর আগে জাপানে যখন ঘন ঘন সরকার বদল হচ্ছিল তখন জাপানিরাও বলত, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দুর্নীতির দায় দল নেয় না বলেই প্রধানমন্ত্রী পদ হারান, জেলে যান। দল শীর্ষ নেতা সম্পর্কে শক্ত ও স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে বলে নেতার দুর্নীতির দায়ে দল ভেঙে পড়ে না বরং দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়ে, রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। এতে রাজনীতিও বাঁচে, দলও রক্ষা পায়।

আমাদের মতো দেশে, রাজনীতি ও দুর্নীতি যেখানে প্রায় সমার্থক হয়ে ওঠে, সেই সুযোগ নিয়ে যেখানে রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অপরাজনীতি আর অরাজনীতির সর্পকুল বিষ উগরে দিতে তৎপর, সেখানে রাজনীতিকে রক্ষা করতে রাজনীতিবিদকেই এগিয়ে আসতে হবে। আশপাশের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখে আমরা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হই। আমাদের রাজনীতি বাঁচুক, পরাস্ত হোক অপরাজনীতি আর অপরাজনীতির কুশীলবদের প্রকাশ্য নেপথ্যের সব আয়োজন।

লেখক : সিনিয়র সংবাদিক।
সৌজন্যে ; বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বাধিক ক্লিক