প্রচ্ছদ

পর পর দুই খুন:উদ্বিগ্ন নগরবাসী

১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:৩৩

sylnewsbd.com

দেবব্রত রায় দিপন :: একই ঘটনার পুণরাবৃত্তি ঘটলো আবারো। কথা কাটাকাটির জের ধরে নগরীতে ছুরিকাহতের ঘটনায় মৃত্যু ঘটলো আরো একটি কচি প্রাণের। এই নিয়ে ১৭ দিনে মৃত্যুপুরীতে চলে গেলো দুইদুটি সতেজ প্রাণ। উভয় ঘটনাই সিনিয়র-জুনিয়র এবং গ্রুপিং দ্বন্দ্ব নিয়ে। দুটি খুনের ঘটনায় সিলেটের অভিভাবক মহলে বেড়ে গেছে চরম উৎকণ্ঠা। প্রশাসনিক নজরদারি ও অভিবাকদের সচেতনতা না থাকায় এই অবস্থা ঘটতেই থাকবে বলে মনে করছেন অনেকেই।

১২ মার্চ বুধবার নগরীর মদীনামার্কেট এলাকায় রাত সাড়ে ৭টায় সর্বশেষ ছুরিকাহতের ঘটনা ঘটে। পরে রক্তক্ষরণ অবস্থায় ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত্যু ঘটে সাব্বিরের। নিহত সাব্বির আহমদ মজুমদার পাড়া ১২ নং বাসার বাসিন্দা ওলিউর রহমানের পুত্র।

নিহত সাব্বিরের পিতা অলিউর রহমান জানান, মঙ্গলবার বিকাল চারটার দিকে সাব্বিরের কয়েকজন বন্ধু তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তিনি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় তার ছেলের মৃত্যুর খবর শুনতে পান। সিনিয়র-জুনিয়র গ্রুপের দ্বন্দ্বে এ হত্যাকান্ড- ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন সাব্বিরের পিতা অলিউর রহমান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাতটার দিকে মদিনা মার্কেট কামারপট্টি গলিতে কয়েকজন যুবক আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ করে তাদের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যায়। পরে সেখান থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় সাব্বিরকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, সাব্বিরের পেটের নিচে কয়েকটি গভীর ছুরিকাঘাত ছিল। এ খুনের ঘটনায় বুধবার দুপুরে তার বাবা অলিউর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেছেন। খুনের ঘটনায় আটককৃত ৩ জনকে পুলিশ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে।

নগরীর কোতোয়ালী থানার সেকেন্ড অফিসার মো. ইয়াসিন আহমদ জানিয়েছেন, মামলায় ১০ জনের নামোল্লেখসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মদিনা মার্কেট এলাকা থেকে আটককৃত রাজু মিয়া, সাকিন নুর তালুকদার ও তাজুল আহমদকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। থানার ওসি সেলিম মিয়া জানিয়েছেন, আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি রবিবার রাত আটটার দিকে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় সহপাঠীদের ছুরিকাঘাতে সাহেদ আহমদ (১৬) নামে এক স্কুল ছাত্র নিহত হন। নিহত সাহেদ চৌকিদেখি এলাকার মৃত আব্দুল খালিকের ছেলে এবং সে নগরীর শাহপরান প্রি-ক্যাডেট স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। ওই ঘটনার পর দিন নিহত শাহেদের বড় ভাই জাহেদুর সাইফুল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

আটক সাতজনকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শাহেদ হত্যার পর গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনের মধ্যে চারজন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনই নিহত শাহেদের সমবয়সী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুটি ঘটনাই ছিলো রাজনৈতিক গ্রুপিংকে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক গ্রুপের একাধিক উপগ্রুপের আধিপত্য বিস্তারের ফসল হিসেবে ঘটে এইসব হত্যাকান্ড-। প্রথমেই শুরু হয় চেনা-জানা, সখ্যতা। তারপর উপগ্রুপে টানাটানি। শেষে আধিপত্যের লড়াই শেষ হয় সিনিয়র-জুনিয়র প্রসঙ্গ নিয়ে। এরপরেই কথা কাটাকাটির জের ধরে উপর্যপুরি ছুড়িকাঘাত। সব শেষে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নিশ্চিত করা হয় মৃত্যু।

ছুরিকাহতের ঘটনায় পর পর দুটি হত্যাকান্ডের পর প্রশ্ন উঠেছে, উঠতি বয়সীদের হাতে ছুরি এতোটা সহজলভ্য হলো কি করে ? তাছাড়া, সন্ধ্যের পর একসাথে আড্ডার সময়ে তাদের হাতে ছুড়ি থাকে কেনো ? বিষয়টির ব্যখ্যা দিয়ে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী হারুন রশীদ জানায়, ‘১০০’ টাকার পণ্যের দোকানে বিভিন্ন ডিজাইনের ছুরি পাওয়া এখন অনেকটাই সহজলভ্য। তার মতে এ বিষয়ে প্রতি বিক্রেতাকে ছুরি ক্রয়কালীন আইডি কার্ডের ফটোকপি এবং প্রয়োজেন সাংসারিক প্রয়োজনে ছুরিটি কেনা হয়েছে কেনা- সেটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক টহল সন্ধ্যার পর জোরদার করার উপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সিলেট জর্জকোর্টের আইনজীবীও সমাজকর্মী এডভোকেট মনির উদ্দিন বলেন, অপরাধ মাথাছাড়া দিয়ে উঠার কারণ হলো নষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা হচ্ছে -যেনোতেনোভাবে অধিপত্য বিস্তার এবং প্রভাব সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমেই মোটা অংকের একটা ফায়দা হাসিল করা সম্ভব। দুটি খুনের ঘটনাই কিন্তুৃ এমনটাই ইঙ্গিত করে জানিয়ে তিনি বলেন, সুস্থ্য রাজনৈতিক চর্চায় সন্তান বেড়ে উঠলে আচরণগত প্রভাব সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তিনি বলেন, রাজনীতি যতোদিন পেশিশক্তির কবলে আটকা থাকবে , ততোদিনই এই অবস্থা চলতে থাকবে।

বিষয়টি তুলে ধরে মন্তব্য জানতে চাইলে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মুকির হোসেন চৌধুরী বলেন, পর পর দুটি খুনের ঘটনায় অভিভাবক মহলে আতঙ্ক বেড়ে গেছে অনেকগুণ। তাই বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখনই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। টহল জোরদারের মাধ্যমে প্রয়োজনে ৪/৫ জনের আড্ডাখানায় তদন্ত চালাতে হবে। এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি।

তিনি বলেন, অভিভাবকদের উচিত সন্ধ্যার পর নিজ সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছে, সে বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।

এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার(মিডিয়া) জেদান আল-মুসা জানান, নগরবাসী উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারন নেই।পুলিশ তৎপর আছে।ইতিমধ্যে প্রত্যেকটি পাড়া মহল্লায় নজরদারী বৃদ্ধি করা করা হয়েছে।তিনি অভিভাবকেদেরও সচেতন হওয়ার আহবান জানান।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

সর্বাধিক ক্লিক