প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনার নাম সিলেট

অক্টোবর ২৯ ২০১৮, ০০:২১

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া :: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদ একদিকে যেমন বৈচিত্র্যময় অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে অনন্য ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, প্রবাল দ্বীপ, সমুদ্রসৈকত, হাওর-বাঁওড়, চা বাগান, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পুরাকীর্তিসহ আরও অনেক পর্যটনের উপাদান নিয়ে আমাদের এই দেশ। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল তেমনি এক অসাধারণ পর্যটন স্থান। সিলেটকে বলা হয়ে থাকে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। মূলত বিস্তীর্ণ সবুজ মনোরম চা বাগানের জন্য এই উপাধি পেয়েছে সিলেট। এই জেলার যে দিকে চোখ যাবে সেদিকে চোখ জুড়াবে সবুজে ঘেরা চা বাগান। এ ছাড়া ছোট-বড় পাহাড়-টিলা, হাওর, নদী, বনাঞ্চল, ঝরনার অপরূপ সমারোহ নিয়ে পর্যটকদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে সিলেট অঞ্চল।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত জেলা সিলেট। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৭৮ কিলোমিটার দূরে সিলেটের অবস্থান। নৈসর্গিক সুন্দর্যে ভরপুর সিলেটের পর্যটন। সিলেট শহরে রয়েছে উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ চা বাগান মালনীছড়া চা বাগান। এ অঞ্চলে আসা পর্যটকদের মন জুড়ায় সৌন্দর্যের রানী খ্যাত জাফলং, নীলনদ খ্যাত স্বচ্ছ জলরাশির লালাখাল, পাথর জলের মিতালিতে বয়ে যাওয়া বিছনাকান্দির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা পাংথুমাই ঝরনা, সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল, ‘মিনি কক্সবাজার’ হাকালুকি এবং কানাইঘাটের লোভাছড়ার সৌন্দর্য।

চারপাশে সবুজের সমারোহ, নীল আকাশের নিচে সবুজ গালিচা পেতে আছে সজীব প্রকৃতি সঙ্গে উঁচু-নিচু টিলা এবং টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। এই সবুজ গালিচাই হলো সিলেটের চা বাগান। বিশ্বজুড়ে সিলেটের চা বাগানের খ্যাতি রয়েছে। দেশের মোট চায়ের ৯০ শতাংশই উৎপন্ন হয় সিলেটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অন্যরকম ভালো লাগার ধারক হয়ে আছে সিলেটের চা বাগান। বাংলাদেশের মোট ১৬৩টি চা বাগানের মধ্যে ১৩৫টি রয়েছে বৃহত্তর সিলেটে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদর উপজেলায় রয়েছে বেশ কয়েকটি চা বাগান। এর মধ্যে উল্লে­খযোগ্য চা বাগান হলো মালনীছড়া চা বাগান, লাক্কাতুরা চা বাগান, তারাপুর চা বাগান, দলদলি চা বাগান, খাদিম চা বাগান, বড়জান চা বাগান, গুলিন চা বাগান, আলী বাহার চা বাগান, হাবিব নগর চা বাগান, আহমদ টি এস্টেট, খান চা বাগান, লালাখাল টি এস্টেট, শ্রীপুর চা বাগান, মুলাগুল চা বাগান ইত্যাদি। চা বাগানে বসে একটি দিন প্রকৃতির সঙ্গে কীভাবে কেটে যাবে তা টের পাওয়া যাবে না।

সিলেটের পর্যটনের কথা আসলে প্রথমেই যেই নামটি চলে আসে তা হলো জাফলং। জাফলং হলো সিলেট বিভাগের একটি হিল স্টেশন এবং অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। সিলেট শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে সড়কপথে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী খাসিয়া পাহাড়ের কোলে মারি নদীর পাশে অবস্থিত পাহাড়, সবুজ বন ও বাগানের সৌন্দর্য ঘেরা একটি পাহাড়ি অঞ্চলের নাম জাফলং। হিমালয় থেকে সৃষ্ট মারি নদী এখানে প্রচুর পরিমাণে পাথরখ- বয়ে নিয়ে আসে। পাথর সংগ্রহ করা এবং আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস এই দুটি কারণে জাফলংয়ের খ্যাতি রয়েছে। চা বাগান এবং পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পাথরের বিরল সৌন্দর্যের দেখা মিলবে এখানে।

দেশের একমাত্র এবং বিশ্বের অন্যতম জলাবনের নাম রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল বন। পর্যটকদের কাছে এটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট নামেও পরিচিত। এটি প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গা নিয়ে এই বনাঞ্চল গঠিত। রাতারগুল একটি প্রাকৃতিক বন। এরপরেও বন বিভাগ হিজল, বরুণ, করচ আর মুতাসহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়ে দেয় এ বনে। এ ছাড়াও রাতারগুলের গাছপালার মধ্যে উল্লে­খযোগ্য হলো কদম, জালিবেত, অর্জুনসহ জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা। তাই তো রাতারগুল সিলেট অঞ্চলের সুন্দরবন নামে খ্যাত। ভরা বর্ষায় স্থানীয় হস্তচালিত ডিঙি নৌকায় চড়ে রাতারগুল জলাবনে ঘুরে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি ভোলা যাবে না সহজে। প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত এই পর্যটন কেন্দ্রে।

সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুর উপজেলায় স্বচ্ছ নীল পানির নদী ‘লালাখাল’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। প্রকৃতিকে একান্তে অনুভব করার জন্য স্থানটি বেশ উপযোগী। পাহাড়ে ঘন সবুজ বন, নদী, চা বাগান ও নানা জাতের বৃক্ষের সমাহার লালাখালজুড়ে। পানি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা একজন পর্যটককে দেবে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। লালাখালে গেলে আদিবাসীদের সঙ্গে পর্যটকদের শখ্যের সুযোগ থাকছে যা কিছুটা ভিন্ন জীবনাচার মুগ্ধ করবে সবাইকে। বেশির ভাগ পর্যটক লালাখাল ভ্রমণের জন্য নদীপথ ব্যবহার করে থাকে। নৌপথে যেতে যেতে যেদিকে চোখ যায়, মুগ্ধতায় নেমে আসে কিছুক্ষণের জন্য।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত বিছনাকান্দি মূলত জাফলংয়ের মতোই একটি পাথর কোয়ারি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে সুউচ্চ ঝরনা। ভ্রমণবিলাসীদের জন্য এই স্পটের মূল আকর্ষণ হলো পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানিপ্রবাহ। তা ছাড়া বর্ষায় থোকা থোকা মেঘ আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে, মনে হতে পারে মেঘেরা পাহাড়ের কোলে বাসা বেঁধেছে। সব মিলিয়ে পাহাড়, নদী, ঝরনা আর পাথরের এক সম্মিলিত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই বিছনাকান্দি।

পাংথুমাই সিলেটের আরেকটি অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের কোলে এক অসম্ভব সুন্দর গ্রাম পাংথুমাই। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পানতুমাই গ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম। মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি পাহাড়, ঝরনা, ঝরনা থেকে বয়ে আসা পানির স্রোতধারা, আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ভূমি সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনাচার সবকিছু মিলে এক অনন্য পর্যটনকেন্দ্র এই পাংথুমাই। পাহাড় ঘেঁষা আঁকাবাঁকা রাস্তা পানতুমাই গ্রামের বৈশিষ্ট্য। গ্রামের শেষে পাহাড়ি গুহা থেকে হরিণীর মতোই লীলায়িত উচ্ছল ভঙ্গিমায় ছুটে চলেছে ঝরনার জলরাশি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাধারাটি স্থানীয়ভাবে মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝরনা হিসেবে পরিচিত। আর পর্যটকদের কাছে জলপ্রপাতটির পরিচিতি পাংথুমাই ঝরনা নামে। জলপ্রপাতের সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন সেখানে ভিড় করছেন হাজারো পর্যটক।

সমগ্র সিলেটে অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় অসংখ্য হাওর। এর মধ্যে হাকালুকি হাওর অন্যতম। সিলেট এবং মৌলভীবাজার জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা নিয়ে সিলেটের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি। সমগ্র বর্ষাজুড়ে হাকালুকি হাওরকে সাগরের মতো মনে হয় এবং এর মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোকে মনে হয় একেকটা ছোট্ট দ্বীপ। বছরের প্রায় সাত মাস হাওর এলাকা পানির নিচে অবস্থান করে এবং যাতায়াতের জন্য নৌকাই গ্রামগুলোর প্রধান বাহন। হাকালুকি হাওড়ে ৮০টি ছোট এবং ৯০টি মাঝারি এবং বড় বিল রয়েছে। শীতকালে এসব বিলে অতিথি পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। সারা দেশ থেকে হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন পাখিদের এই মিলনমেলা দেখতে। শীতের হাকালুকি যেন এক অন্য জগৎ, মনোলোভা দৃশ্য দেখে মন হারিয়ে যায় একপলকে। শীতের প্রকোপ যতই বাড়তে থাকে, অতিথি পাখি আসার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিশাল এলাকাজুড়ে শুধুই কিচিরমিচির আর নানান রঙের ডানা ঝাঁপটানোর দৃশ্য আর হাওড়ের মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিলগুলোতে শাপলা আর পদ্মের বাগান যেন কেউ সাজিয়ে রাখে পর্যটকদের জন্য।

সিলেট আমাদের জন্য প্রকৃতির এক অপরূপ দান। বর্তমানে এটি আমাদের পর্যটনের জন্য এক অনন্য সম্পদ। সিলেটকেন্দ্রিক পর্যটনের ব্যাপক প্রসার করা গেলে আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে সঙ্গে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। তবে সবার আগে প্রয়োজন এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রাকৃতিক সম্পদ একবার নষ্ট হয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের সকল প্রকার উন্নয়ন, পরিকল্পনা হতে হবে পর্যটন ও পরিবেশবান্ধব। এ বিষয়ে আমাদের সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনগণ ও পর্যটকসহ সবাইকে কাজ করে যেতে হবে। এতে করে আমরা সিলেট অঞ্চল থেকে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনের সুফল পেতে পারি।

লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিডি প্রতিদিন



এ সংবাদটি 9471 বার পড়া হয়েছে.
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares



sylnewsbd.com

Facebook By Weblizar Powered By Weblizar

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ ২৪ খবর

………………………………….

বিজ্ঞাপনের জন্য নির্ধারিত

....................................................................................... ..........................................

add area

Post Archive

December 2018
S S M T W T F
« Nov    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

সিলেট আরও