প্রচ্ছদ

বাংলাদেশে নার্সিং পেশার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৫ মে ২০১৯, ০৩:০৪

sylnewsbd.com

সিলনিউজ ডেস্ক :: ১২ মে- আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নার্সিং পেশা। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের যে আদর্শ নিয়ে একদা নার্সিং পেশা শুরু হয়েছিল, আজ তা বহু বিস্তৃত হয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। এবারের প্রতিপাদ্য হলো- Nurses : A Voice to lead- Health For All. এ সময়ের জন্য যথার্থ।

সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পূর্ববঙ্গে, অন্যান্য পেশার মতোই, নার্সিং পেশা সর্বদা খুবই দুর্বল অবস্থানে ছিল। তবে অন্য পেশার তুলনায় নার্সিং পেশার অবস্থা ছিল অধিকতর দুর্বল। পাকিস্তান আমলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নার্সিং পেশা ও শিক্ষার অগ্রগতি ছিল খুবই ধীর। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নার্সিং পেশা ও শিক্ষার দ্রুত অগ্রগতি হয়। তবে সাম্প্রতিককালে এই অগ্রগতির ধারা খুবই বেগমান।

অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গে মাত্র ৩টি জুনিয়র নার্সিং স্কুল ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট হিসেবে স্বাধীনতা লাভের সময় মাত্র ৫০ জন নার্স তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হেলথ্ সার্ভিসের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন। সে সময় অধিকাংশ হাসপাতালেই এপ্রেন্টিস নার্স এবং নার্স এটেনডেন্টগণ নার্সিং পেশার কাজটি চালিয়ে নিতেন। দেশের প্রথম মেডিকেল কলেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন দেশের প্রথম সিনিয়র নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একজন ব্রিটিশ নার্স একাধারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেট্রন, সুপারিনটেনডেন্ট অব নার্সিং সার্ভিস এবং পূর্ব পাকিস্তান নার্সিং কাউন্সিলের রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করতেন। এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান নার্সিং কাউন্সিল বেঙ্গল নার্সিং কাউন্সিল থেকে পৃথক হয়ে যায়।

তৎকালীন পাকিস্তাননের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ব পাকিস্তানের নার্সিং পেশা ও শিক্ষাকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই মর্মে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে যে, ইংল্যান্ডে নার্সিং শিক্ষা গ্রহণের জন্য ছাত্রী চাই। কিন্তু তেমন সাড়া পাওয়া গেল না । যে অল্প কয়েকজন আবেদনকারী ছিলেন তাদের মধ্যে মাত্র ৪ জনকে মনোনীত করা হলো ইংল্যান্ডে নার্সিং প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য। রহিমা খাতুন, শাহজাদী হারুন ও জোহরা খাতুন। অপর জনের নাম জানা যায়নি। তাদের মধ্যে প্রথমোক্ত দুই জন ছিলেন মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলের এলএমএফ ২য় বর্ষের ছাত্রী। কলকাতার লেডি ব্রাবোন কলেজ থেকে সদ্য স্নাতক উত্তীর্ণ জোহরা খাতুন ছিলেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত খাস্তগীর হাইস্কুলের শিক্ষিকা। পরবর্তীকালে তারা যুক্তরাষ্টের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে নার্সিং-এর ওপর এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দেশে ফিরে নার্সিং-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্টিত হন। এই সময় এদেশের নার্সিং পেশায় প্রধানত মাদ্রাজ ও নেপালের অবাঙালি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রাধান্য ছিল।

নার্সিং পেশার মান উন্নয়নের জন্য ১৯৬০ সালে জুনিয়র নার্সিং স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং আরও ২টি সিনিয়র নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু এই অল্প ক’টি সিনিয়র নার্সিং স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতাই ছিল প্রধান বাধা। নার্সিং নেতৃত্ব এই বাধা অতিক্রমের জন্য বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালান। লিফলেট বিতরণসহ স্লাইড শো’র আয়োজন করা হয়। স্কুলে স্কুলে উপস্থিত হয়ে নার্সিং পেশার নানা গৌরবোজ্জ্বল দিকসমূহ তুলে ধরে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফলে সামান্য হলেও কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হয়।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম নার্সিং কলেজ করাচিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের রেজিস্টার্ড নার্সগণ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য করাচি নার্সিং কলেজে সুযোগ পেতে শুরু করে। প্রশাসনিক ও শিক্ষকতায় উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য অনেকে বিদেশে, বিশেষত যুক্তরাষ্টের বৃত্তি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

১৯৭০ সাল এদেশে নার্সিং শিক্ষার জন্য একটি ল্যান্ডমার্ক। এ বছর ঢাকার মহাখালীতে কলেজ অব নার্সিং গড়ে তোলা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের নার্স প্রশাসক ও শিক্ষকের অভাব পূরণে এই কলেজের ভূমিকা অপরিসীম। শাহজাদী হারুন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষা। এই সময়ে অবশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে আরও ৫টি জেলা হাসপাতাল সংলগ্ন ১০টি সিনিয়র নার্সিং স্কুল গড়ে তোলা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাত্র ৬০০ জন রেজিস্টার্ড নার্স ছিল দেশেÑ যাদের মধ্যে মাত্র ৩৫০ জন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

স্বাধীনতার পর নার্সিং পেশা ও শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নার্সদের পদ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। বেতন বাড়ানো হয়। হাসপাতালের মেট্রন এবং নার্সিং স্কুলের অধ্যক্ষাদের ১ম শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের কারণে ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতার আবরণ ফিকে হয়ে আসে। ফলে নার্সিং পেশা ও শিক্ষার প্রতি মেয়ে এবং ছেলেরাও আগ্রহী হয়ে ওঠে।

১৯৭৭ সালে রাষ্টপতির অধ্যাদেশ বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পৃথক করে নার্সদের জন্য নার্সিং পরিদপ্তর গড়ে তোলা হয়, পরবর্তীতে যা আইনে রূপান্তরিত করা হয়। রহিমা খাতুন নার্সিং পরিদপ্তরের প্রথম পরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত হন। তারপর থেকে নার্সিংয়ের বিভিন

উন্নয়নমূলক কাজকর্ম গৃহীত হতে থাকে। নার্সিং পরিদপ্তরের জন্য পৃথক অফিস স্থাপনসহ স্কুল ও হোস্টেল ভবন গড়ে তোলা শুরু হয়। কারিকুলাম রিভিশনসহ নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। কলেজ অব নার্সিং ১৯৭৭-৭৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অধিভুক্ত করা হয় এবং বিএসসি ইন নার্সিং ও পাবলিক হেলথ নার্সিং কোর্স চালু করা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে ১ বছর মেয়াদি প্রশাসনিক ও শিক্ষকতা বিষয়ক কোর্স চালু করা হয়।

১৯৮১ সালে আরও ২টি জেলা হাসপাতাল এবং ১৮টি মহকুমা (তৎকালীন) হাসপাতাল সংলগ্ন নার্সিং ইনস্টিটিউট শুরু হরা হয়। ইতিমধ্যে নার্সিং স্কুলগুলোর নাম পরিবর্তন করে নার্সিং ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করা হয়। হাসপাতালের মেট্রনের পদমর্যাদা নার্সিং সুপারিনটেডেন্টে উন্নীত করা হয়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার দ্বারও প্রশস্ত হয়। অস্ট্রেলিয়ার এডেলাইট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের নার্সদের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়। গড়ে তোলা হয় নার্সিং রিচার্স সেল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নার্সিং পেশাজীবীগণ পোস্টিং পেতে শুরু করেন। ফলে দেশের মানুষের সঙ্গে নার্সিং পেশাজীবীদের পরিচিতি এবং সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করে। এছাড়া ৪টি বিভাগীয় সহকারী পরিচালকের পদসহ ৬৪টি জেলায় জেলা পাবলিক হেলথ নার্স-এর পদ সৃষ্টি এবং পদায়ন করা হয়।

২০১৬ সালের নভেম্বরে নার্সিং পরিদপ্তরকে একজন মহাপরিচালকের অধীনে নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার। তিনি বিসিএস ক্যাডারের একজন চিকিৎসক ছিলেন। বর্তমান মহাপরিচালক তন্দ্রা সিকদার বিসিএস ক্যাডারের একজন এডিশনাল সেক্রেটারি। ফলে নার্সিং প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদাধিকারী এখন আর কোন নার্স নয়, প্রশাসন ক্যাডারের অতিরিক্ত সচিব তিনি।

২.

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির মধ্য দিয়ে বেঙ্গল নার্সিং কাউন্সিল থেকে পূর্ব পাকিস্তান নার্সিং কাউন্সিল পৃথক হলেও একটি স্বতন্ত্র নার্সিং কাউন্সিল হিসাবে দাঁড়াতে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ১৯৮৩ সালে রাষ্টপতির অধ্যাদেশ বলে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল তার পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা ও ক্ষমতা ফিরে পায়। এর আগে কাউন্সিলের রেজিষ্ট্রারগণ ছিলেন খ-কালীন। ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে জোহরা খাতুন রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব গ্রহণের আগে বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রারগণ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করতেন। এই সময়ে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড নার্সের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০০ জন। ২০১৬ সালে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল আইন পাস ও রাষ্টপতি কর্তৃক স্বাক্ষর প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল অবলুপ্ত হয়ে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিল নার্সিং, মিডওয়াইফারি ও সহযোগী পেশার রেজিস্ট্রার্ড কর্তৃপক্ষ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দেশের নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা ও পেশার মাননিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুমোদন, কারিকুলাম প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নসহ সিনিয়র নার্সিং স্কুল কর্তৃক- যা পরবর্তীকালে নার্সিং ইনস্টিটিউটে পরিণত হয়,- এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কোর্স প্রবর্তিত ছিল। ৩ বছরের জেনারেল নার্সিং এবং ১ বছরের মিডওয়াইফারি কোর্স ছিল এই শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত (১০ শতাংশ আসন ছিল পুরুষ শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত। পুরুষ শিক্ষার্থীগণ মিডওয়াইফারির পরিবর্তে ১ বছরের অর্থোপেডিক অথবা পেডিয়াট্রিকস কোর্স নিতেন)। কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল কর্তৃক পরীক্ষা গ্রহণ করে উত্তীর্ণদের সার্টিফিকেট ও রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হতো। রেজিস্টার্ড নার্সগণ সিনিয়র স্টাফ নার্স পদমর্যাদায় পেশায় যুক্ত হোন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে, থাইল্যান্ডের কারিগরি সহায়তায় নার্সিং ও মিডওয়াফারি শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। নতুন এই কারিকুলাম অনুযায়ী এসএসসি’র পরিবর্তে এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াফারি (সকল বিভাগের জন্য উন্মুক্ত) এবং ৪ বছর মেয়াদি বিএসসি নার্সিং (শুধু বিজ্ঞান বিভাগে উত্তীর্ণদের) কোর্স চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ৪টি নার্সিং ইনস্টিটিউটকে নার্সিং কলেজে উত্তীর্ণ করা হয় এবং একই সঙ্গে ডিপ্লোমা ও বিএসসি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। পরবর্তীতে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্সও চালু হয়। প্রায় একই সঙ্গে কয়েকটি বেসরকারি নার্সিং কলেজ চালু করা হয়।

২০০৮ সালের প্রণীত কারিকুলাম স্টেকহোল্ডারস্ কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত এবং শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। কারিকুলাম অনুযায়ী কোর্স দুইটির বিশ্ব স্বীকৃত নাম- ‘ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি’ এবং ‘ব্যাচেলর অব নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি’। ব্যাচেলর অব নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি থেকে ‘মিডওয়াইফারি’ শব্দটি বাদ দিয়ে ব্যাচেলর অব নার্সিং সায়েন্স রাখা হয়। পরে ব্যাচেলর অব নার্সিং সায়েন্স নামেরও পরিবর্তন হয়ে বিএসসি নার্সিং নামকরণ করা হয়। এখন শুনছি, নার্সিং কলেজ হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠানকে কাউন্সিল এবং সরকার অনুমোদন দিয়েছে তা পূর্ণাঙ্গ কলেজ নয়, মেডিকেল কলেজের নার্সিং ইউনিট। এক সময় এদেশের নার্সিং পেশায় এপ্রেন্টিস নার্স ও নার্স এটেন্ডেন্টগণ কাজ করতেন। তারপর ডিপ্লোমা নার্সগণ তাদের স্থলাভিষিক্ত হন। ২০০৮ সালে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্স চালু হওয়ার পর ডিপ্লোমা নার্সদের স্থলাভিষিক্ত হতে শুরু করেছে বিএসসি নার্সগণ, যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্বাস বিশেষজ্ঞদের। এখন সময় এসেছে চিকিৎসা অনুষদে আনুপাতিক হারে নার্সিং প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার অথবা পৃথক নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অনুষদ প্রতিষ্ঠা করা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বেরকালে ১৯৯৮ সালে নার্সিং অনুষদসহ অন্যান্য অনুষদ নিয়ে আইপিজিএমআরকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ ১২ বছর পর বিএসএমইউ নার্সিং অনুষদও কার্যক্রম শুরু করে। তাও পূর্ণাঙ্গ রূপে নয়, শুধু আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্স দিয়ে। নার্সিং অনুষদের প্রধানও একজন চিকিৎসক।

ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন যে, বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষা ও পেশার উন্নয়নে প্রথম দিকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করলেও, পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ সহযোগিতার হাত বাড়িযে দিয়েছে। কানাডা, জাপান ও কোরিয়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কোরিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় ২০১৬ সালে বিএসএমএমইউ’র অধীনে ঢাকার মুগদায় নার্সিং-এ উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড নার্সিং এডুকেশন অ্যান্ড রিচাস’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এখানে বর্তমানে ৬টি বিষয়ে যথা- কমিউনিটি নার্সিং, সাইকিয়াট্রিক নার্সিং, নার্সিং এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট, এডাল্ট অ্যান্ড এলডারলি নার্সিং, উইমেন্স হেলথ্ অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ এবং চাইল্ড হেলথ নার্সিংÑএ ২ মেয়াদি মাস্টারস স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান হরা হয়। ফলে নার্সিং-এ উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ অবারিত হলো। নার্সিং পেশা ও শিক্ষার উন্নয়নে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নার্সদের ২য় শ্রেণীর পদমর্যাদায় উন্নীত করার কারণে দেশের বিরাটসংখ্যক শিক্ষার্থী আজ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশা ও শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে রেজিস্টার্ড নার্স-মিডওয়াইফের সংখ্যা ৫৬,৭৩৩ জন। সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধীন নার্স প্রায় ৩০,০০০ জন এবং মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রায় ১,৫০০ জন। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউটের সংখ্যা সরকারি ৪৩টি, বেসরকারি ১২০টি। নার্সিং কলেজের সংখ্যা সরকারি ১৭টি এবং বেসরকারি ৬০টি। এতগুলো নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং কলেজ থাকার পরও নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ভর্তি হতে হয়।

সর্বশেষ ভর্তি পরীক্ষায় ১৫ হাজার আসনের বিপরীতে ৫২ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর, যে ১টি মাত্র সিনিয়র নার্সিং স্কুল এবং ৬০০ জন রেজিস্টার্ড নার্স নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, আজকে আমাদের যে অর্জন তা যথেষ্ট না হলেও ভালো অর্জন অবশ্যই। তারপরও আমাদের অনেকদূর যেতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী এখনও আমাদের দেশে নার্স-মিডওয়াইফের সংখ্যা কম। যতদ্রুত সম্ভব এই অবস্থা নিরসন করে আমাদের নার্সিং পেশাকে আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী গড়ে তুলতে হবে।

[লেখক: রেজিস্ট্রার, বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল]
— with S Nasrin S Nasrin.

সর্বাধিক ক্লিক