প্রচ্ছদ

ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে আবু সিনা ছাত্রাবাস

০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:২৫

sylnewsbd.com

সিলনিউজ ডেস্ক :: ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সিলেট নগরের প্রাণকেন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ‘আবু সিনা ছাত্রাবাস’। এখানে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধকালে পাক হানাদার বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছিল। এই ভবন থেকেই ১৮৭৬ সালের ১লা জানুয়ারী সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’-এর যাত্রা শুরু হয়।

‘ব্রিটিশ ও আসাম স্থাপত্য রীতিতে তৈরী প্রায় দেড় শতক প্রাচীন এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ভেঙ্গে এখানে ২৫০ শয্যার আধুনিক জেলা হাসপাতাল নির্মান করা হবে। সেই প্রকল্পের কাজ সম্প্রতি শুরু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর ৮৭ কোটি টাকা ব্যায়ে ১৫ তালা ভিত বিশিষ্ট এই হাসপাতালের নির্মান কাজ শুরুর কার্যদেশ পেয়েছে গত ৯ই জুলাই ২০১৮ ইং তারিখে। নিঃশব্দে ছাত্রাবাস খালি হওয়ার পর সম্প্রতি এরা কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান GKBPL-PAEL (JV)।

বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব আইনে আইনে বলা আছে, কোনো ভবন বা স্থাপনা মূলত সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক বা ব্যবহারিক মূল্যবোধের বিবেচনায় সংরক্ষণ বা ঐতিহ্যের তালিকায় রাখার যোগ্য হয়। তবে ওই ভবনটির অবশ্যই কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন বা শিল্পমূল্য থাকতে হবে।একটা ভবন বা স্থাপনা সাধারণ ক্ষেত্রে ১০০ বছরের পুরনো হলে এ সংস্থাটি ওই স্থাপনাকে সংরক্ষণ বা তালিকাভুক্তির বিবেচনা করতে পারে। এর জন্য আইনও রয়েছে তবে তিন ধরনের আইন চালু থাকায় এক ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আইনগুলোর প্রথমটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের। একে ১৯৭৪ সালের সংরক্ষণ আইন বলা হয়।

এ আইনের বলে জাদুঘর থেকে সংস্কৃতি ইতিহাস বিষয়ক স্থাপনাগুলো গুরুত্ব পেয়ে থাকে। দ্বিতীয়টি গণপূর্ত বিভাগের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড আইন। আর আরেকটি আইন হলো বাংলাদেশ মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৬/২০০৮। এর মাধ্যমে রাজউক ও সিটি করপোরেশন কাজ করে থাকে। এসব আইনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করার কথা। কোন আইনেই এই ভবনের কথা ভাবা হয়নি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে বাবা দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে আসা আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য বড় মাপের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি হাসপাতালে ব্লাড ব্যাংক খোলেন এবং আহত রুগীদের চিকিৎসার জন্য একটি ইমার্জেন্সি স্কোয়াড গঠন করেন। একইসাথে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সহায়তা প্রদান করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করছেন এমন তরুণ চিকিৎসকদের ওষুধপত্রের যোগান সরবরাহ করতেন ।

সিলেট শহরে পাকবাহিনীর অত্যাচার ও গণহত্যা ব্যাপকতর হয়ে উঠে। ফলে মেডিকেল কলেজের ছাত্র, শিক্ষক ও চিকিৎসকরা শহর ছেড়ে শহরতলি এলাকায় আশ্রয় নেন। শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের মহিলা নার্সদের তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে দায়িত্ব থেকে ছুটি দিয়ে দেন। কিন্তু তিনি তাঁর সহকর্মী ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা, নার্স মাহমুদুর রহমান, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলী এবং জনকয়েক চিকিৎসা সহকারিকে নিয়ে হাসপাতালে রুগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত থাকেন।

১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন সিলেট মেডিকেল কলেজের কাছে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা নিকটবর্তী পাহাড়ের উপরে অবস্থিত সিভিল সার্জনের বাংলো থেকে আক্রমণ পরিচালনা করে। গুলির আঘাতে পাকসেনাদের গাড়ি বহরের প্রথম জিপটি উল্টে যায়। ফলে তিনজন পাকসেনা নিহত হয়। পাকসেনারা তাৎক্ষনিকভাবে হাসপাতাল এলাকা ঘিরে ফেলে। তারা হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকা থেকে লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। হাসপাতাল ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়া গেরিলা যোদ্ধারা তখন বিচ্ছিন্নভাবে সরে পড়ে।

হানাদার বাহিনীর মেজর রিয়াজের নেতৃত্বে একদল পাকসেনা হাসপাতালে প্রবেশ করে। ভেতরে কোনো মুক্তিযোদ্ধা না পেয়ে তারা আমার বাবা ডাঃ শামসুদ্দিন আহমদ, ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা, নার্স মাহমুদুর রহমান, পিয়ন মোঃ মুহিবুর রহমান ও মোখলেছুর রহমান, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলী সহ মোট নয়জনকে হাসপাতাল থেকে বাইরে এনে চত্বরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। প্রথমে বাবার (ডাঃ শামসুদ্দিন আহমদ) বাম উরুতে গুলি করা হয়। দ্বিতীয় গুলিটি তাঁর পেটের বা পাশে বিদ্ধ হয় এবং তৃতীয় গুলিটি তাঁর বক্ষ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। সাথে সাথে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরপর লাইনে দাঁড় করানো সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

১৩ এপ্রিল কিছুক্ষণের জন্য কারফিউ শিথিল হলে কয়েকজন নিকটাত্মীয় এসে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ছোট গর্ত করে দ্রুততার সঙ্গে সমাহিত করেন। অন্যদের মরদেহও পাশে সমাহিত করা হয়। বর্তমানে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে এখানেই বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।”

উপরোক্ত তথ্যগুলো বাপা এর সাধারন সম্পাদক আব্দুল করিম কিম সাহেবের গতকালের পোস্ট থেকে নেয়া, আমি জানিনা কারো এত সময় আছে কিনা পুরোটা কষ্ট করে পড়ার, তবুও আমার লিষ্টের সিলেটীদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনা টিকে বাঁচানোর জন্য একটু ভাবুন, হয়ত সিলেটের সংবাদপত্র গুলো এটা নিয়ে লেখালেখি করলে কোনো উপায় বের হতে পারে, যদিও গতবছর জানুয়ারীতে সাবেক অর্থমন্ত্রী এর ভিত্তিপ্রস্তরস্থাপন করে গেছেন, তার অনুজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবার কি আদৌ জানেন এই ধ্বংশলীলার কথা? জানলে নিশ্চয়ই এই স্থাপনা রক্ষায় এগিয়ে আসতেন, অন্তত সেই কাজটুকু তো করতে হবে, ওনাদের কাছে তো খবর টা পৌছে দিতে হবে। সিলেটের সংবাদমাধ্যম বা মিডিয়া কেউ কি এগিয়ে আসবে না এই ঐতিহ্য কে বাঁচাতে? না হলে কিছুদিনের মধ্যেই এই স্থাপনা ধুলায় মিশে যাবে, আর আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

লেখা সংগ্রহ।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

সর্বাধিক ক্লিক