প্রচ্ছদ

রক্ত পরিসঞ্চালনে করণীয় ও সতর্কতা

০৭ জুলাই ২০১৯, ০১:৩৩

sylnewsbd.com

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ :; পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বে ১০৭ কোটি ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয়। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ স্বেচ্ছা রক্তদাতা আর ৫৯ শতাংশ আত্মীয় রক্তদাতা। বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদানের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। উন্নত বিশ্বে স্বেচ্ছা রক্তদানের হার প্রতি ১ হাজারে ৪০ আর উন্নয়নশীল বিশ্বে চারজনেরও কম। হাত, পা অথবা চোখ ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব হলেও, রক্ত ছাড়া বাঁচার কথা কল্পনাও করা যায় না। মানবদেহে রক্ত তাই অপরিহার্য। দেহের কোষে কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছে দেওয়া, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য বর্জ্য ফিরিয়ে আনা, হরমোন, লবণ ও ভিটামিন পরিবহন, রোগপ্রতিরোধ, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ- সবকিছুতেই রক্তের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই কারও দেহে রক্তের অভাব ঘটলে তা প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে অন্যের রক্ত শিরার মাধ্যমে রোগীর দেহে প্রবেশ করানো তথা রক্ত পরিসঞ্চালন হয়ে ওঠে অন্যতম উপায়। যে কারণে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে : রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে প্রয়োজনভেদে রোগীর শরীরে সম্পূর্ণ রক্ত বা রক্তের কোনো উপাদান যেমন লোহিত কণিকা, অণুচক্রিকা বা রক্তরস দেওয়া হয়।

► যে কোনো কারণে অল্প সময়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে সাধারণত সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয়- যেমন দুর্ঘটনা, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, প্রস্রাবকালীন রক্তক্ষরণ ইত্যাদি।
► জটিল বা বড় ধরনের শল্যচিকিৎসার সময়ও সম্পূর্ণ রক্তের প্রয়োজন হয়।

► বিভিন্ন রকমের অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় সাধারণত লোহিত কণিকা দেওয়া হয়Ñ যেমন থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা, হুকওয়ার্মের কারণে অ্যানিমিয়া ইত্যাদি। অবশ্য আমাদের দেশে খরচের কথা বিবেচনা করে এসব রোগীকেও সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয়।

► এ ছাড়া হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরে অণুচক্রিকা দেওয়া হয়।

► রক্তরস দেওয়া হয় হিমোফিলিয়া ও অন্যান্য কোয়াগুলেশন ডিজঅর্ডারে এবং আগুনে পোড়া রোগীকে।

রক্ত পরিসঞ্চালন করলে কী জটিলতা হয় :

জীবন রক্ষার অন্যতম উপায় এই রক্ত পরিসঞ্চালন আবার কখনো কখনো তৈরি করতে পারে জটিলতা।

► রক্তবাহিত রোগের সংক্রমণ আমাদের দেশে এখনো একটি প্রধান সমস্যা। হেপাটাইটিস বি, সি, এইডসসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী জীবাণু সহজেই রক্তের মাধ্যমে রক্তগ্রহীতার দেহে প্রবেশ করতে পারে। এ পরিস্থিতির মূল কারণ রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে রক্তটি জীবাণুমুক্ত কিনা তা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা। অনুমোদনবিহীন ব্লাডব্যাংকগুলোতেই এসব রক্ত বিক্রি করা হয়। আর তা আসে মূলত নেশাসক্ত পেশাদার রক্তদানকারীদের থেকে। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ রক্ত বা ভেজাল রক্তও এসব ব্লাডব্যাংক থেকেই আসে।

► ভুলক্রমে এক গ্রুপের রক্ত অন্য গ্রুপের রোগীকে দিলে রক্ত হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। এ ধরনের ঘটনা কম হলেও একেবারেই হয় না তা নয়। এসব ক্ষেত্রে রক্ত সংগ্রহকারী ও পরীক্ষাকারী ব্ল­াডব্যাংক, চিকিৎসক অথবা নার্সÑ যে কারও ভুল বা অসতর্কতাই দায়ী। রোগী সাধারণত বুকে, পিঠে ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ করেন। চিকিৎসক দ্রুত ব্যবস্থা নিলে পরবর্তী জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়।

► এ ছাড়া যে কোনো পরিসঞ্চালনেই কাঁপুনি ও জ্বর আসা এবং অ্যালার্জি জাতীয় ছোটখাটো সমস্যা হতে পারে।

► যাদের কিছুদিন পরপর রক্ত নিতে হয় তাদের দেহে লৌহের আধিক্যসহ অন্যান্য সমস্যা হতে পারে।

► অনেক সময় অধিক রক্ত দ্রুত প্রবেশ করলে বৃদ্ধ অথবা হৃদরোগীর হার্ট ফেইলিউর জাতীয় সমস্যা হতে পারে।

অবশ্য রোগী বা তার আত্মীয়স্বজন সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন রক্ত পরিসঞ্চালনের আগেই, যখন দেওয়ার জন্য রক্ত খুঁজতে থাকেন। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ ব্ল­াডব্যাংক গড়ে উঠলেও নিরাপদ রক্ত এখনো দুর্লভ। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে রক্ত প্রয়োজন হলে তা হয়ে ওঠে সোনার হরিণ। এ ছাড়া যাদের ঘন ঘন রক্ত নিতে হয় তাদের বেশির ভাগ সময় যায় রক্তের খোঁজে। দুর্লভ গ্রুপের রক্ত হলে তো কথাই নেই। রক্ত যে কারোরই যে কোনো সময় প্রয়োজন হতে পারে, এ কথা মনে রেখে আমরা যদি এখনই প্রস্তুতি নিয়ে রাখি তবে রক্ত পরিসঞ্চালনের সমস্যা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। আমাদের যেসব উদ্যোগ নিতে হবেÑ

► নিজের ও আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা।

► নিকটস্থ ব্লাডব্যাংকের ঠিকানা ও ফোন নম্বর জেনে রাখা।

► শুধু নিবন্ধনকৃত ব্লাডব্যাংকে রক্তদান ও গ্রহণ করা।

► পেশাদার রক্তদাতার রক্ত না কেনা।

► নিজে নিয়মিত রক্ত দান করা ও সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা।

► রক্তবাহিত রোগে সংক্রমিত হলে রক্ত দান না করা।

রক্ত নেওয়ার আগে সতর্কতা :

► রক্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন রক্তের গ্রুপ ঠিক আছে কিনা দেখে নেওয়া।

► অপরিচিত পেশাদার রক্তদাতার রক্ত না নেওয়া। পেশাদার রক্তদাতারা অনেকেই মাদকাসক্ত, দেহে দেহে বহন করে হেপাটাইটিস বি, সি, এইডসসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী ও সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু।

► সবচেয়ে ভালো আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত সুস্থসবল লোকের রক্ত নেওয়া।

► স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে রক্তদাতার HbsAg, HCV, HIV ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, রক্তের অভাব ও অনিরাপদ রক্ত দুটোই জীবনের জন্য সমান হুমকি। তাই রক্তের বিকল্প শুধু রক্ত নয়, বরং ‘নিরাপদ রক্ত’। জেনে রাখুন-

► যে কোনো সুস্থ সাবালক ব্যক্তি রক্ত দান করতে পারেন। তবে ওজন হতে হবে কমপক্ষে ৫০ কেজি বা ১১০ পাউন্ড।

লেখক : সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বাধিক ক্লিক