প্রচ্ছদ

রাজনীতিতে জিন-ভূতের আছর

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:৪১

329

নঈম নিজাম :: একজন রাজনীতিবিদ কেমন হবেন? দুনিয়াজুড়েই রাজনৈতিক নেতাকে সবাই একই চোখে দেখে। আবার নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, মডেলসহ অন্য সব তারকাকে মূল্যায়ন করে আরেক রকমের। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন তখন কেউ তাকে কিছু বলত না। তিনি যা খুশি তা করতে পারতেন। শীর্ষ এই ব্যবসায়ীকে নিয়ে মার্কিন মিডিয়ার মূল্যায়ন বদলে যায় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার পর হিসাব বদলে যায় ট্রাম্পকে নিয়ে। সাধারণ মানুষ তখন তার খুঁত নিয়ে মেতে ওঠে। আলোচনায় সামনে আসে সুন্দরী রমণীদের সঙ্গে তার হাস্যরস করা ফটো। সেলফি তোলা নিয়েও মিডিয়া তাকে ছাড় দেয়নি। আমেরিকানরা এক আজব জাতি। কোনো মার্কিন যুবক ব্যক্তিজীবনে যা খুশি তা করলে কেউ মাইন্ড করে না। কিন্তু কোনো কংগ্রেসম্যান একটু-আধটু ভুল করলে ঝড় বয়ে যায়। সামান্য ছাড়টুকুও তারা রাজনীতিবিদ আর গির্জার পুরোহিতকে দিতে নারাজ। শুধু মিডিয়া নয়, উদারনীতির চিন্তাশীল আমেরিকানরাও তখন কট্টরপন্থি হয়ে ওঠেন। ছোট্ট খবরে মুহূর্তেই বদলে যায় পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ। ভাবখানা এমন আমজনতা যা খুশি তা করতে পারবে কিন্তু নেতাদের হতে হবে ধর্মগুরুর মতো। শুধু আমেরিকা নয়, পশ্চিমা সব দেশেই একই নীতি। এসব বিষয়ে ব্রিটিশদের অবস্থান আরও রক্ষণশীল। ব্রিটিশ মিডিয়ার চোখ সব সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিকে তাক করে রাখা। কোনো কারণে মিডিয়া মিস করলে সামাজিক গণমাধ্যম মুহূর্তেই এক হাত নিয়ে নেয়। কোনো ছাড় নেই। রাজনীতিবিদদের প্রশ্নে বাংলাদেশের হিসাব-নিকাশও খুব বেশি আলাদা নয়। তার পরও কিছু বিষয়ে আমাদের মানুষ সহনশীল। অনেক নেতাকে জনতা ছাড় দিয়ে রেখেছে। কাউকে কাউকে নিয়ে মানুষের মন্তব্য রাজা-বাদশাহরা একটু-আধটু করবেনই। এই ছাড়ে অনেক নেতা এখন বেপরোয়া চলনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। ভোটের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সবার ভাব কর্মীদের তোয়াক্কার দরকার নেই। বিজয় যে যার মতো করে নেবেন। মিডিয়াকে শাসনে রাখতে পারলে তো কথাই নেই। যত দিন যাচ্ছে নেতা ও জনতার সম্পর্কের জায়গাগুলোয় চিড় ধরেছে। আমাদের চিরচেনা রাজনৈতিক সংস্কৃতি চোখের পলকে বদলে যাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে এখন কর্মীরা ঠাঁই পান না। সুখ-দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে পারেন না। নেতা চলেন নিজের মেজাজ-মর্জিতে। ক্ষমতামুখী রাজনীতির নানা রং আর বাহারি মানুষের ভিড় সবকিছু বদলে দিচ্ছে। নেতাদের সেলফি প্রতিযোগিতায় কর্মীরা অসহায়বোধ করেন। পাঁচ তারকা আড্ডার আসর দেখে থমকে যান। নেতার বাড়ির ড্রয়িংরুমের গানের আসর সামাজিক গণমাধ্যমে দেখে হতাশ হন। তার পরও কিছু বলার নেই। সবকিছু সুবিধাভোগীরা দখল করে নিচ্ছেন। ত্যাগী নেতা-কর্মীরা সময়ের সঙ্গে অচল হয়ে পড়ছেন। ক্ষমতার রাজনীতি বদলে দিচ্ছে আমাদের চিরচেনা জগৎটাকে।

একটা সময় গণমানুষকে নিয়েই টিকে থাকতেন নেতারা। ঘুম থেকে উঠে বাড়িতে কর্মী না দেখলে ভয় পেয়ে যেতেন। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে পশ্চিম ধানমন্ডিতে ছিল আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাকের বাসা। এই বাড়িতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। তিনি বাকশাল করলেন কি আওয়ামী লীগ করলেন তাতে কিছু যেত-আসত না মাঠের কর্মীদের। সবার কাছেই তিনি ছিলেন রাজ্জাক ভাই। ক্ষমতায় না রাজপথে তা দিয়ে কেউ আবদুর রাজ্জাককে মূল্যায়ন করেনি। সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠতেন আবদুর রাজ্জাক। তারপর শুরু হতো কর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তা, সুখ-দুঃখের বয়ান শোনা। রাজনীতির মাঠে কর্মীবান্ধব এমন নেতা আর আসবেন না। রাজ্জাক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি করা কর্মী। মাঠেঘাটে কাটিয়েছেন পুরো জীবনটা। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ ছিল না। বিলাসী জীবন থেকে কারাগারকে আপন মনে করতেন বেশি। অভিমানীও ছিলেন। কর্মীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হলে আবার নিজেই সবকিছু সামলে নিতেন। আশির দশকের শেষ দিকে রাজ্জাক ভাইয়ের কাছে একদিন সময় চাইলাম। তিনি সকাল ৭টায় যেতে বললেন। আমিও সকাল ৭টায় গিয়ে হাজির। ভাবলাম দরজা খুলবে তো? গিয়ে দেখলাম ড্রয়িংরুম হাটবাজার। আমাদের নাঙ্গলকোটের জয়নাল ভাইয়ের কথা বলতে চাই না। ২৪ ঘণ্টা মানুষ নিয়ে থাকতেন। তার সঙ্গে রাজনীতি করতে গিয়ে আমাদের রাত কাটাতে হতো মানুষের কাছারি ঘরে অথবা হাটবাজারের দোকানে। প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদের বাড়িতে একদিন সন্ধ্যার পর দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি ভিতর থেকে নিজ হাতে কমলা নিয়ে এসে বললেন, তোমাদের জন্য এনেছি। ভাবখানা ছিল আমরা আসব জেনেই তিনি এই কমলা সিলেট থেকে আনেন। এর নাম আন্তরিকতা। বঙ্গবন্ধুর আরেক সহচর তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে বলতে হয়। অসাধারণ এই মানুষটি একসময় থাকতেন ধানমন্ডিতে। তার বাড়িতে সব সময় মানুষের ঢল। কর্মীদরদি এই নেতা মানুষকে জয় করতে পারেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ’৮৭ সালে রাজপথে কর্মসূচি ছিল আট-দলীয় জোটের। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে বের হওয়া মিছিলের সামনের ভাগে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। পুলিশের বাধায় হঠাৎ মিছিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ কয়েকজন কর্মীকে আটক করে। টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ হচ্ছে মানুষের ওপর। চলছে লাঠিচার্জ। হঠাৎ পুলিশের হাতে থাকা কর্মীদের একজন চিৎকার করলেন, তোফায়েল ভাই… বাঁচান। দাঁড়িয়ে দেখলাম, তোফায়েল আহমেদ এগিয়ে গেলেন পুলিশের দিকে। পুলিশকে ধমক দিতে দিতে জোর করে কর্মীদের ছাড়াতে থাকেন। অনেকটা পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে কর্মী ছিনিয়ে নেওয়া। এখন মাঠে সেই নেতাও নেই, সেই পুলিশও নেই। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পদে পদে বদলে গেছে। হানিফের সিটি ভোটে নির্বাচন কমিশন অফিসে সচিব জাকারিয়া একটু ভাব দেখিয়ে কথা বললেন। মুহূর্তে ধমকে ওঠেন তোফায়েল আহমেদ। ’৯১ সালের সংসদে তার বক্তব্যগুলো বই আকারে প্রকাশ করলে ইতিহাস হয়ে থাকবে আগামী প্রজšে§র জন্য।
তোফায়েল আহমেদের আরেকটি কথা মনে পড়ছে। ভোরের কাগজে আওয়ামী লীগ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। রিপোর্টটি আমার করা। তোফায়েল ভাই হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন রিপোর্টের সোর্স ২৯ মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাড়ির কেউ হতে পারেন। দুপুরের আগেই অফিসের নম্বরে ফোন পেলাম তোফায়েল ভাইয়ের। তখনো মোবাইল যুগ আসেনি। তিনি বললেন, অফিসে কী করছ? জানালাম, বোরহান কবীরকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। তিনি বললেন, দুজনই থাকো। কিছুক্ষণের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ চলে এলেন ভোরের কাগজ অফিসে। আমাকে আর বোরহানকে নিয়ে বের হলেন। সিঁড়িতে সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে দেখা। মতি ভাই হাসতে হাসতে বললেন, দুজনকে নিয়ে কই যান? তোফায়েল ভাইও হাসলেন, বললেন, দেখি কই যাওয়া যায়। গাড়িতে ড্রাইভার নেই। তিনি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আমাদের নিয়ে ঢুকলেন তার ধানমন্ডির বাসায়। ভাবীকে ডাকলেন। পরিচয় করালেন আনোয়ারা ভাবীর সঙ্গে। ভাবী বললেন, দুজনকে দেখেছি। আনোয়ারা ভাবী আমার চোখে একজন মহীয়সী নারী। সারা দিন মানুষের জন্য কাজ করেন। কয়েক বছর আগে হঠাৎ একদিন ভাবী ফোন করলেন। বললেন, শোনো, একটা ছেলেকে পাঠাচ্ছি। লোক নিচ্ছ তুমি শুনলাম। ওকে চাকরি দেবে। পরে জানলাম, ভাবী আলাদা করে সারা দিন মানুষের জন্য এভাবেই প্রতিদিন কাজ করেন। সর্বশেষ নির্বাচনের আগে ভাবীর সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছিল। তিনি ভোলার খোঁজখবর দেন। সেসব আলাদা কথা। বোরহান আর আমি খাবার টেবিলে বসলাম। ভাবী দুনিয়ার আয়োজন করেন। খেতে খেতে তোফায়েল ভাই আওয়ামী লীগ রাজনীতির বিভিন্ন ইতিহাস বলতে থাকেন। খাওয়া শেষে আড্ডা জমতে থাকে। বিকাল পর্যন্ত তিনি তার জীবনের ঘটনাবলি আর আওয়ামী লীগের নানা ইতিহাস তুলে ধরেন আমাদের কাছে। বিদায়ের সময় বললেন, তুমি লেখ। কিন্তু আমি চাই সবকিছু তোমার জানা থাকা দরকার। তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতি। সর্বশেষ বছর তিনেক আগে এক রাতে তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া জুড়ে দিলাম। কথা শেষ হওয়ার আগে ফোন কেটে দিলাম আমি। টানা কয়েক দিন তিনি ফোন করেন। আমি ধরি না। পরে একদিন সামনাসামনি দেখা। তিনি নিজেই এগিয়ে এলেন। বললেন, তুমি না বুঝে ফোন কেটেছ। বলতে চাইলাম কী আর বুঝলে কী? তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে রাগ করে থাকা যায় না। তিনি টেনে নিতে জানেন। আপন করতে পারেন। মানুষকে জয় করার সম্মোহনী ক্ষমতা রয়েছে তার। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কীভাবে মিশে থাকেন তা ভোলায় গিয়ে বার বার দেখে এসেছি। সারা দেশের আওয়ামী লীগ কর্মীরা এখনো মনে করেন তোফায়েল আহমেদের কাছে যাওয়া যায়। তিনি রাগ করবেন, কিন্তু ফেরাবেন না।

আওয়ামী লীগ নেতাদের মাঝে আমু ভাইয়ের প্রতি আমার আলাদা একটা দুর্বলতা সব সময় ছিল। আমু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও মানুষটাকে বড্ড বেশি আপন মনে হয়। কর্মীবান্ধব মানুষটি আপনজনদের পাশে দাঁড়ান বুক চিতিয়ে। আমু ভাইয়ের বাসায় সব সময় নেতা-কর্মীর ভিড় লেগেই থাকে। এই বয়সেও সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি কর্মীদের সময় দেন। আশির দশকে আমু ভাইয়ের বাড়িতে নিয়মিত যেতাম। সারা দেশের নেতার ঢল ছিল। তিনি সাংগঠনিক বিষয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতেন। এ সময় জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা-কর্মীরা ছিলেন ড. কামাল কিংবা রাজ্জাক ভাইয়ের অনুসারী। আমু ভাই খুঁজে বের করতেন শুধু শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা কোন নেতার। দেখা যেত সেই নেতা জেলা-উপজেলায় অজনপ্রিয়। আমু ভাই বেছে নিতেন শেখ হাসিনাপন্থি নেতাকেই। তাকে নিয়ে আসতেন সামনে। আমু ভাইয়ের ড্রয়িংরুম এখনো কর্মীতে ঠাসা থাকে। জীবনে কাউকে পদ ও অবস্থান দিয়ে মূল্যায়ন করেন না। ’৭৫ সালের পর থেকে এই মানুষটি আওয়ামী লীগে লড়াই করেছেন। দুঃসময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন যুবলীগে অথবা মূল দলে। সারা দেশে ভাইদের পলিটিক্স বন্ধ করে শেখ হাসিনার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইটা ছিল তার। কর্মীদের মূল্যায়ন পদ বা অবস্থান দিয়ে করেন না। স্টামফোর্ডের ড. হান্নান ফিরোজ ভাইয়ের চরম ঝামেলার মুহূর্তে অনেকে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। পুলিশের এক বড় কর্মকর্তাকে ফোন করলাম খবর নেওয়ার জন্য। সেই কর্মকর্তা জানান, হান্নান ফিরোজের পক্ষে আমির হোসেন আমু সাহেব ফোন করেছেন। ভালো লাগল শুনে। দুঃসময়ের মানুষদের মূল্যায়ন তার কাছে সব সময় ছিল। আওরঙ্গ-লিয়াকতের ’৭৫-পরবর্তী সাহসী ভূমিকা সবার জানা। সেই আওরঙ্গ-লিয়াকতের খারাপ সময়ে আমু ভাই ছাড়া কাউকেই দেখিনি। কুমিল্লার আফজল খান একসময় বলতেন, আমু ভাইয়ের কাছে সব সময় যাওয়া যায়। তিনি হচ্ছেন মাঠের কর্মীদের নেতা।

অনেক দিন আগে পীর হাবিব আর আমি ধানমন্ডির ভূত নামের এক রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সেনদাকে দুষ্টামি করে বললাম, এই রেস্টুরেন্টে নাকি ভূত আছে। ভিতরে ভূতের প্রদর্শনীও হয়। তিনি হাসলেন। বললেন রাজনীতিবিদদের দেখলে ভূতও পালায়। দেশে যা হচ্ছে, জিন-ভূত সবাই পালাতে শুরু করেছে। এখন যারা ভূত সেজেছে তারাও আগে পরে পালাবে। সেনদার সেই কথাগুলো এখন আবার মনে পড়ছে। আমাদের রাজনীতিতে মাঝে মাঝে জিন-ভূতের আছর লাগে। এই আছরে সত্যিকারের রাজনীতিবিদরা কোণঠাসা হন। তখন সামনে চলে আসে জিন-ভূতেরা। ক্ষমতার রাজনীতি তখন হয়ে ওঠে অর্থবিত্ত অর্জনের মূল হাতিয়ার। রাজনীতির পদ বিক্রি হয় অর্থের বিনিময়ে। উড়ে এসে রাজনীতিতে এমপি হয়ে জুড়ে বসা যায়। টাকা হলেই চলে। মানুষ অসহায় হয়ে সব দেখে। কারও কিছু বলার থাকে না। ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা হন। কাউয়া সামনে থাকে। কোকিলের বাড়িতে এসে ডিম পাড়ে। আবার চলে যায়। বড় নেতারা কর্মীদের চেনেন না। মনে করেন, সারা জীবন শুধু নেবেন, কর্মীদের দেবেন না। নেতারা বুঝতে চেষ্টা করেন না, ক্ষমতার রাজনীতি চিরস্থায়ী নয়। দল বা সরকার থেকে একবার বাদ পড়লে অস্তিত্ব আর থাকে না। মানসম্মান চলে যায় ঘরে-বাইরে। ক্ষমতার রাজনীতি আরও কঠিন। ইতিহাস সবাই ভুলে যায়। বিষয়টি শুধু সরকারি দলের জন্য বলছি না। সব দলে এক হাল। একটা সময় ছিল খালেদা জিয়ার চারপাশে চাটুকারের অভাব ছিল না। মধ্যরাত অবধি বিএনপি অফিসে ঢল ছিল। এখন কিছুই নেই। খালেদা জিয়ার অফিস ফাঁকা। বিশাল বিশাল কমিটি কোনো কাজেই লাগছে না। খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে মিছিল নেই। সমাবেশ নেই। পোস্টার-ব্যানার কিছুই নেই। অথচ একদা সবই ছিল। রাজনীতির হিসাব-নিকাশে একবার ভুল হলেই সবকিছু বদলে যায়। বিএনপিরও তাই হয়েছে। কবি নজরুল বলেছেন, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়Ñ এ কথাটা মনে রাখলেই রাজনীতিবিদদের কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলোÑ ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া। বুঝতে হবে নেতার প্রতি সম্মানবোধ আসমান থেকে পয়দা হয় না। আপনি শুধু নিয়ে যাবেন কর্মীদের দেবেন না তা হবে না। কর্মীদেরও সম্মান আপনাকে দিতে হবে। স্বাপ্নিক জগতে থেকে দীর্ঘ সময় রাজনীতি করা যায় না। সাময়িক সাফল্য রাজনীতির জন্য চূড়ান্ত কিছু নয়। রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় অনেক নেতা সামনে আসেন। আবার হারিয়ে যান। ক্ষমতার রাজনীতি রঙিন দুনিয়ার ফানুস। এ ফানুস একসময় চুপসে যাবে। আপনি যত বড় নেতা হোন ভুল বার বার করলে টিকে থাকবেন না। হারিয়ে যাবেন একসময়। কর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নিলে কারও অস্তিত্ব থাকবে না। আগে নিজের মূল্যায়ন করুন। নিজের সম্পর্কে ধারণা করুন। জোর করে সম্মান রাজনীতিতে সাময়িক আদায় করা যায়। দীর্ঘমেয়াদে নয়।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • 41
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    41
    Shares

সর্বাধিক ক্লিক