প্রচ্ছদ

রিও গ্র্যান্ডে নদীর কান্না ও ঘুমহীন রাত

০৭ জুলাই ২০১৯, ০৯:৪৫

sylnewsbd.com

শামীম আল-আমিন :: চোখে কেমন ঝাপসা দেখছে তানিয়া। সবকিছু এলোমেলো। মাথাটাও ঠিকভাবে তুলতে পারছে না। প্রচণ্ড ভার মনে হচ্ছে। কান্নার দাগ দু’চখোর নিচে। জ্ঞান হারিয়েছিলো সে। বুকফাঁটা আর্তনাদ থেমে গেছে। এখন যেটুকু আছে, তা কেবল বোবা কান্না। চোখ দুটো মেলার চেষ্টা করছে তানিয়া। আলো আঁধারি। সামনে কে দাঁড়িয়ে! ভ্যালেরিয়াইতো! তার দুই বছরের ফুটফুটে মেয়েটা। দুই হাত তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মিষ্টি করে হাসছে। যেনো বলছে, ‘মা কোলে নাও। আমি তোমার আদর খাবো’।

তানিয়া মাথা তোলার চেষ্টা করে। মৃদু কণ্ঠে ডাকে, ‘মা। আমার ছোট্ট সোনা পাখিটা। তুমি এখানে কিভাবে এলে? তুমি না মরে গেছো। তুমি না হারিয়ে গেছো বাবা’! এটুকু বলে চিৎকার করে উঠতে চাইলো তানিয়া। কিন্তু গলার কাছ দিয়ে শব্দ বের হয়ে আসছে না। কোথায় যেনো আটকে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। অসম্ভব এক কষ্ট! এই কষ্টের কোন নাম হয় না।

ভ্যালেরিয়া হাসছে। দেব শিশুর মতো সেই হাসি। দুই বছরের বাচ্চাটকে কেমন বড় বড় লাগছে। টেনে টেনে সে বললো, ‘কই মা, আমি তো মরে যাইনি। যার জন্মই হয়নি, সে মরে যাবে কিভাবে! দুই বছরের একটি শিশুর তো ঠিকমতো জন্মই হয় না। দেখা হয় না, পৃথিবীর আলো-আঁধার। সে এই পৃথিবীর রুঢ় বাস্তবতার কি বোঝে, বলো মা? অথচ বাস্তবতার কঠিন শিকার কখনো হতে হয়, এমন শিশুকেই। কি নির্মমতা! যার জন্মই হয়নি, তার কি মৃত্যু হয় মা”?

‘কি বলছে তার শিশু সন্তান। ওর মুখে তো ঠিকমতো কথাই ফোটেনি। কেবল মিষ্টি কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা কথা শিখেছে। এখন কিভাবে এত কথা বলছে! এত কঠিন কঠিন কথা’! তানিয়া নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছে। সে কোনরকমে উঠে বসলো। হাত বাড়িয়ে দিলো। কাছে আসতে গিয়েও, কাছে এলো না ভ্যালেরিয়া। ‘তোমার বাবা কোথায়? সেতো তোমার সাথেই ছিল’!

“বাবা..। বাবা হারিয়ে গেছে মা। হয়তো মরে গেছে। বাবাদেরতো মৃত্যু হয়”। ভ্যালেরিয়ার কথা শুনে ডুকরে কেঁদে উঠলো তানিয়া।
“আমি তখন শক্ত করে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম। বাবা বলছিলেন, ভয় পেও না। শক্ত করে ধরে রেখো। আমি আমার টি শার্টের ভেতরে তোমাকে ঢুকিয়ে নিয়েছি, পানির স্রোতে তুমি যেন হারিয়ে না যাও”। এ পর্যন্ত বলে থেমে যায় দুই বছরের মেয়েটি। একটু থেমে বলতে শুরু করে, এরপর আমার আর মনে নেই মা। তবে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সবকিছু ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার আর কিছু মনে নেই মা”।

মেয়ের কথা শুনে এবার চিৎকার করে কেঁদে উঠলো তানিয়া। তার শিশুকন্যার চারপাশ থেকে কেমন আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। সে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে, ‘মা আমরা কেন এভাবে ঘর ছাড়ি? কেন ছেড়ে যেতে হয় বাড়ির পাশের খেলার মাঠটাকে? কেন নিজ ভূমিতে থাকতে পারি না? কেন এত বিপদ মাথায় নিয়ে, জীবনকে বাজি রেখে, পৃথিবীতেই স্বর্গের খোঁজ করি? কেন আমরা এভাবে মরে যাই মা”?

ভ্যালেরিয়ার কথা শুনে কেমন যেন ওলটপালট লাগতে থাকে তানিয়ার। এ নিশ্চয়ই অন্য কেউ কথা বলছে। কোন একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। সেকি স্বপ্ন দেখছে! যে কথা বলছে, সেকি তার দুই বছরের দুধের শিশু, নাকি অন্য কেউ! কিছুতেই কিছু ভেবে পায় না তানিয়া। আবারো জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

দুই.

মেক্সিকো আর আমেরিকাকে যুক্ত করেছে রিও গ্রান্ডে নদী। খরস্রোতা নদী লম্বায় অনেক বড়। তবে প্রস্থ অতটা নয়। তবে সীমান্তে কড়াকড়ি থাকলে, এই নদী পেরিয়ে যাওয়াই অনেক কষ্টের। থাকে জীবনের ঝুঁকি। নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফলে এল সালভাদর থেকে আসা অস্কার অ্যালবার্তো মার্টিনেজ রামিরেজ। সঙ্গে তার স্ত্রী তানিয়া ভানেসা এবং একমাত্র কন্যা ভ্যালেরিয়া। তাদের পারিবারিক বন্ধু ম্যানুয়েলও আছেন সাথে।

দেশ থেকে অনেকটা জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছেন তারা। উদ্দেশ্য আমেরিকায় ঢোকা। সেখানে গিয়ে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করবে। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে মেক্সিকোর সীমান্ত নগরী মাতামরোসে পৌঁছেছে পরিবারটি। গিয়েই জানতে পারে সোমবার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সেতুটি বন্ধ থাকবে। এখনো হাতে সাতদিন। এই কয়টা দিন এখানে কোনভাবে থাকা যাবে না। অস্কার তার স্ত্রীকে বললো, ‘তানিয়া চলো, নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে শুরু করি’।
‘কিন্তু এভাবে হেঁটে কোথায় যাবো আমরা। খুব ক্লান্ত। শরীরওতো চলছে না। মেয়েটার শরীরও ভালো না’।
‘কিন্তু পেছনে ফেরার পথ নেই। চলো, এগিয়ে যেতেই হবে’।

বাধ্য হয়ে হাঁটতে শুরু করে পরিবারটি। দুই বছরের ভ্যালেরিয়া কখনো মা’র কোলে; কখনো বাবার কাঁধে। পাশে পাশে হাঁটছে ম্যানুয়েল। পথে পথে আরও অনেকের সাথে দেখা। সবার গন্তব্যই স্বপ্নের আমেরিকা। কিন্তু এই পথে অনেক বিপদ, অনেক শংকা। তবুও মানুষগুলো এগিয়ে চলেছে। একসময় নদীর একটি জায়গায় এসে থাকে অস্কারের পরিবার। সেখানে একটি গাছের নিচে বসে। জিরিয়ে নেয়। কিন্তু ভেবে পায় না, এই নদীটা পেরিয়ে ওপারে যাবে কিভাবে। ঐতো আমেরিকা দেখা যায়। কেবল নদীটা পেরিয়ে গেলেই হলো। ওপারে গেলেই প্রাণে বেঁচে যাবে তারা। তারপর সুন্দর জীবন। মেয়ের স্কুল। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা। নির্ভয়ে পথচলা। আর স্বচ্ছলতা। একটু দূরে। হাত বাড়ালেই যেন ধরা যাবে। কিন্তু এই দূরত্বই এখন অনেক মনে হচ্ছে তাদের কাছে। ওপাড়ে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। নৌকা নেই সাথে। আছে সীমান্তে কড়াকড়ি।

অস্কার বললো, ‘শোনো, এই নদীটা পেরিয়ে গেলেইতো হয়ে গেল। আমরা সাঁতরেই পেরিয়ে যাবো। প্রস্তেতো খুব বেশি না’।
অস্কারের কথা শুনে আৎকে ওঠে তানিয়া। “বলো কি, এই নদী কি সাঁতরে পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব! অতটুকু একটা মেয়েকে নিয়ে ওপাড়ে যাবো কিভাবে”?
“কথা বাড়িয়ে কোন লাভ নেই তানিয়া। এখানে রাত নেমে এলে আরও বিপদ। দিনে দিনে ওপারে চলে যেতেই হবে। আমি ভ্যালেরিয়াকে কাঁধে করে নিয়ে যাবো। তুমি আসবে ম্যানুয়েলের সাথে”। বলেই মেয়েটাকে পেছনে নিজের কাঁধে তুলে নিলো অস্কার। নিজের টি শার্টের ভেতরে ঢুকিয়ে নিলো ওর ছোট্ট মাথাটা। বললো, “শক্ত করে ধরে রাখিস বাবা। আমরা ঠিক পৌঁছে যাবো ওপাড়ে। ভয় পাবি না”। টি শার্টের ভেতরে বাবার পিঠে মাথা রাখলো। আস্থার এই পিঠ।

তানিয়ার মনটা কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে বিপদ হবে। বড় বিপদ। “বেঁচে থাকলে ওপারে দেখা হবে”। তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিলো অস্কার। এরপর পেছন ফিরে নদীতে নেমে পড়লো। একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে সে। পিঠে মেয়েটা জড়িয়ে ধরে রেখেছে বাবাকে। একটু পেছনে ম্যানুয়েলের হাত ধরে পানিতে নেমে পড়লো তানিয়াও। দিনের আলোতেই ওপারে পৌঁছাতে হবে।
দুপুর গড়িয়ে গেছে। ঝলমলে রোদ আকাশে। অস্কার এগিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে তানিয়া বললো, “ম্যানুয়ের আমি পারছি না। আমাকে পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে চলো”। কথা না বাড়িয়ে দুজনে ফিরে এলো মেক্সিকো সীমান্তের আগের জায়গাটিতে। পাড়ে উঠে বসে তাকিয়ে থাকলো নদীতে। একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে অস্কার। পিঠে তার প্রিয় সন্তান। অজানা আশংকায় তানিয়ার বুক কাঁপছে। আতংকে অস্থির হয়ে উঠলো সে। এরমধ্যে মনে হলো অস্কার যেন আর সাতার কাঁটতে পারছে না। দু’বার ডুবে যাওয়ার অবস্থা হলো। আবারো এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েটাকে ছাড়ছে না। ওপাড় থেকে তানিয়া চিৎকার করছে, “অস্কার এগিয়ে যাও। আর মাত্র একটু দূরে আমেরিকার মাটি। এইতো তুমি পৌঁছে গেছো”।

অস্কার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। এইতো একটু দূরে। এসে গেছে। কিন্তু খুব ক্লান্ত লাগছে। একবার আস্তে করে কেবল বললো, ‘মা, ভয় পেও না। আমিতো আছি”। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ডুবে যেতে থাকলো অস্কার আর ভ্যালেরিয়া। ডুবতে ডুবতে একসময় নদীর তীরে এসে আছড়ে পড়লো তারা। তা দেখে পাগলের মতো ছুটোছুটি করতে থাকলো তানিয়া। চোখের সামনে নিজের স্বামী আর সন্তানটি জীবনযুদ্ধে হেরে গেলো। আর বেঁচে থেকে তানিয়ার হারটা আরও মর্মান্তিক। একাকি, নির্মম এই জীবনটাকে কোথায়, কেমন করে যে বয়ে বেড়াতে হবে; সে ভাবনা ভাবার মতো অবস্থাও যে তার নেই! সে পরিস্কার শুনতে পেলো, রিও গ্র্যান্ডে নদী যেন কাঁদছে। সে কান্নার নোনা জল খরস্রোতা সেই নদীর পানিতেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আর তুফান তোলা শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেনো। নদী যেনো বলছে, “অনেকতো হলো! আমার বুকে এমন নিষ্ঠুর মৃত্যু আর যে সইতে পারছি না। তোমরা থামাও এই মৃত্যুর মিছিল”।

তিন.

নদীর তীরে কাঁদাপানির মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এক বাবা। তার পিঠে ছোট্ট একটি শিশু। মেয়েটির মাথা বাবার টি-শার্টের ভেতর ঢোকানো। ছোট্ট হাত দিয়ে সে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। পিতা-কন্যার নির্মম মৃত্যুর এমন ছবি ছাপা হলো খবরের কাগজে। মর্মান্তিক দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করেছেন সাংবাদিক জুলিয়া ল্য ডুউক। মেক্সিকোর স্থানীয় লা জর্নাডা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ছবিটি। স্বল্প সময়ের জন্যে জেগে উঠলো বিশ্ববিবেক। আর অপর্ণা নামের ফুটফটে এক কন্যা সন্তানের বাবা হিসেবে প্রচণ্ড কষ্টে নষ্ট হলো আমার রাতের ঘুম।
লেখক : সাংবাদিক

সর্বাধিক ক্লিক