প্রচ্ছদ

লাফার্জ-হোলসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ : ধ্বংস ফসলী জমি, হুমকির মুখে পরিবেশ

২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৫৮

329

নিজস্ব প্রতিবেদক : আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করণের অভিযোগ উঠেছে ছাতক লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে। রয়েছে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ভুমি অধিগ্রহণকৃত ভুমি মালিকদের সাথে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ। তাছাড়া, পরিবেশ দুষণের ফলে লাফার্জ এলাকার আশপাশ সবুজ গ্রামগুলি বিরাণ হলেও তোয়াক্কা করছেনা কর্তৃপক্ষ।
গ্রামবাসীর এনিয়ে একাধিক অভিযোগ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হলেও অদৃশ্য শক্তিতে লাফার্জ কর্তৃপক্ষের অবৈধ মাঠি উত্তোলন এখনও বন্ধ করা যাচ্ছেনা। পরিবেশ ধ্বংশের কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে উচ্চ আদালতে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ মাটি সংগ্রহ করে কারখানার অভ্যন্তরে বিশাল মাটির পাহাড় গড়ে তোলায় সংগৃহিত পাহাড়সম মাটির অতিরিক্ত চাপে ২০১১ সালে ছাতক সিমেন্ট কারখানায় সংযোগকৃত জালালাবাদ গ্যাসের হাইপ্রেসার লাইনে বিষ্ফোরণ ঘটে। এ বিষ্ফোরণের বিষয় নিয়ে ছাতক সিমেন্ট কারখানা ও জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ সরাসরিভাবে লাফার্জ হোলসিমকে দায়ী করলে কর্তৃপক্ষ এর ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।
২০০৬ সালে সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা নদীর উত্তরপাড় টেংগারগাঁও ও নোয়ারাই গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানা। বানিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন পরবর্তি নামকরণ করা হয় লাফার্জ হোলসিম নামে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনের শুরু থেকেই কারখানায় অবিরাম কিংকার ও সিমেন্ট উৎপাদনের সময় এবং কারগো ও ট্রাকে সিমেন্ট সরবরাহে উড়ন্ত ডাষ্ট, রাসায়নিক দ্রব্য, মাটি ও বালুকণা কারখানা সংলগ্ন নোয়ারাই, টেংগারগাঁও, বাতিরকান্দি, বাশটিলা, জয়নগর, মাড়ুয়া টিলা, মফিজ নগর, পাটিভাগ, টিলাগাঁও, বারকাহন, জোড়াপানিসহ কয়েকটি গ্রামের সবুজ পরিবেশ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
কারখানার অন্যতম কাঁচামাল মাটি সংগ্রহের কারনে বিরামহীনভাবে এলাকার ফসলী জমি ধ্বংস করে দিচ্ছে লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কারখানা। সেইসাথে কারখানার মাটি সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত ভারী যানচলাচলে রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাচ্ছে। সার্বক্ষণিক ধুলোময় দৃশ্য আশপাশ এলাকার পরিবেশ দূষিত করে তুলছে। কারখানার ডাষ্ট, ধুলো ও কনভেয়ার বেল্টের শব্দসহ বিভিন্নভাবে পরিবেশ ধ্বংসের কারনে লাফার্জ হোলসিমের বিরুদ্ধে এলাকার মানুষের রয়েছে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা। তবে অর্থলোভী স্থানীয় প্রভাবশালী মাটি ব্যবসায়ীদের কারণে এ ব্যাপারে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারছেনা।
এদিকে, ভারত থেকে মাটি ও চুনা পাথর আনার শর্তে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও পরিবেশ ধ্বংসের কারণ দেখিয়ে ভারতের পরিবেশ অধিদপ্তর লাফার্জ হোলসিমের মাটি সংগ্রহে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে লাফার্জ হোলসিম স্থানীয়ভাবে মাটির জন্য নতুন করে ভূমি অধিগ্রহনের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় কৃষকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে ফসলী জমির মাটি সংগ্রহ করে যাচ্ছে লাফার্জ হোলসিম। এদিকে লাফার্জ হোলসিমের মাটি সংগ্রহের কারনে এলাকার সহগ্রাধিক একর ফসলী জমি ইতিমধ্যেই জলাশয়ে পরিনত হয়েছে। এসব ফসলী জমি বর্তমানে ফসল উৎপাদন এমনকি মৎস্য চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
মাটি সংগ্রহের কাজ অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে এলাকার আরো ফসলী জমি ও টিলা ধ্বংস হওয়ার আশংকা রয়েছে। এলাকার সচেতন লোকজন পরিবেশ ও ফসলী জমি ধ্বংসে স্থানীয়ভাবে একাধিক প্রতিবাদ সমাবেশ করলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ এদিকে কোন নজর দিচ্ছে না। পরিবেশ ধ্বংশের কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে উচ্চ আদালতে। পরিবেশবাদী সংগঠন, উপজেলা কৃষি বিভাগ পরিবেশ ও ফসলী জমি নষ্ট করার কারণে লাফার্জ হোলসিমের বিরুদ্ধে পরিবেশ নষ্টের একাধিক রিপোর্ট প্রদান করলেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিচ্ছে না। ফসলী জমি থেকে মাটি সংগ্রহের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গেলো বছর ছাতকের সহকারী কমিশনার (ভুমি) কে আহবায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভা হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারী। ১২ ফেব্রুয়ারী কার্যালয়ের ৩৩৩ স্বারকের প্রতিবেদনে ছাতক সদর ইউনিয়নের মানসি নগর মৌজার ডুবির বিল, তির রাই মৌজার কাজিহাটা বিল ও ইসলামপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর মৌজার কাজির খাল থেকে লাফার্জ হোলসিমকে মাটি সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু লাফার্জ হোলসিম এসব এলাকা থেকে এ পর্যন্ত মাটি সংগ্রহ করতে দেখা যায়নি। লাফার্জের মাটি সংগ্রহ ও পরিবেশ বিনষ্ট সংক্রান্ত বিষয়ে নাগরিক পরিবেশ ও সমাজ কল্যাণ সংস্থার গত বছরের ১৫ মে উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত একটি রিটের প্রেক্ষিতে আদালত পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা ও পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট এবং সুনামগঞ্জের জেলা প্রসাশক সমন্বয়ে একটি তদন্ত টিম গঠনের মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন। তদন্ত টিমের দাখিলীয় রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ১৩ ডিসেম্বর আদালত প্রতিবেদনের আলোকে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সুনামগঞ্জ জেলা প্রসাশককে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু অদ্যাবদি লাফার্জ হোলসিম ফসলী জমি থেকে মাটি সংগ্রহসহ তাদের পরিবেশ দূষনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া অঞ্চল থেকে লাফার্জ কারখানার অভ্যন্তর পর্যন্ত সক্রিয় দীর্ঘ ১৭ কিলোমিটার কনভেয়ার বেল্ট’র উচ্চ শব্দের কারনে ছাতক-দোয়ারার সহস্রাধিক পরিবারের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অব্যাহত উৎপাদন ব্যবস্থার স্বার্থে লাফার্জকে কিছু শর্ত প্রদানের মাধ্যমে মাটি সংগ্রহের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তবে, শর্তভঙ্গ করা হলে বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ছাতক বাতিরকান্দি গ্রামের লায়েক মিয়া জানান, শর্তের আংশিক নয়, পুরো শর্তের বিপরীতেই লাফার্জ কর্তৃপক্ষ মাটি সংগ্রহ করে এলাকার পরিবেশ ধ্বংশ করে চলছে। প্রভাবশালী একটি মাটিখেকো চক্র মাটি ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় লাফার্জ কর্তৃপক্ষ অনেকটাই নির্বিঘেœ তাদের মাটি সংগ্রহ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাকালে ভূমি অধিগ্রহণ করার সময় ক্ষতিগ্রস্থ ভূমি মালিকদের পুনর্বাসনসহ এলাকার উন্নয়নে সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে বহু লোভনীয় সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল। উৎপাদনের প্রায় ১২ বছর অতিবাহিত হলেও স্থানীয়দের দেয়া একটি প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি কর্তৃপক্ষ।

195Shares

সর্বাধিক ক্লিক