প্রচ্ছদ

সিলেট প্রেসক্লাব গঠনের কিছু স্মৃতি

১৬ জুলাই ২০১৯, ১০:২৫

sylnewsbd.com

রফিকুর রহমান লজু :: সিলেট প্রেসক্লাব ১৩ জুলাই তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবে। প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ¯েœহভাজন ইকবাল মাহমুদ খবরটা জানিয়ে দেন এবং একটা লেখা দেবার অনুরোধ করেছেন। আমি বহু আগে থেকে এই দিনটিকে সিলেট প্রেসক্লাবের জন্মদিন হিসেবে পালনের জন্য উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে আসছি। যখন জানলাম দিনটি উদযাপন করা হচ্ছে তখন অপূর্ব এক সান্ত¡না অনুভব করলাম। এতে আমি যারপর নেই আনন্দিত হয়েছি। সিলেট প্রেসক্লাবের প্রথম কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যদের মধ্যে সম্ভবত আমিই সুন্দর পৃথিবীর রূপ-রস-নিয়ামত সমূহ উপভোগ করছি। অন্যদের মধ্যে আমীনূর রশীদ চৌধুরী, নূরুল হক, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, আব্দুল মন্নান, হিমাংশু শেখর ধর, শহীদ লোহানী, রজিউর রহমান, সুধীন্দ্র বিজয় দাশ (সলুবাবু), শামসুজ্জামান সুফী, নন্দগোপাল চৌধুরী বেঁচে নেই। অন্যরা কে কোথায় কিভাবে আছেন কিংবা আদৌ আছেন কিনা আমার জানা নেই। আমি তাদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের যে শুভ উদ্যোগটা নিয়েছেন, তার জন্য তাদের অভিনন্দিত করছি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জয়ন্তী নামে একখানি স্মরণিকা প্রকাশের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। একটি লেখা দেয়ার জন্য ইকবাল মাহমুদ অনুরোধ জানিয়েছেন। বহু আগের স্মৃতি থেকে ইকবাল মাহমুদের আবদার রক্ষা করার চেষ্টা করছি।
১৯৬৪ সালে আমার সরাসরি ছাত্রজীবনের ইতি কালে সিলেট (বৃহত্তর সিলেট) পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি (ইপজা) গঠিত হয়। সাংবাদিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ঢাকার মুনশিগঞ্জের সফিউদ্দিন আহমদের তাগাদায় এবং সিলেটের প্রবীন সাংবাদিক এএইচ সা’দত খান, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ও মৌলভী বাজারের দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি সৈয়দ মতিউর রহমানের সহায়তায় আমরা সিলেট জেলা সাংবাদিক সমিতি গঠন করি। আমি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। এ.এইচ. সা’দত খান ছিলেন সভাপতি। ইপজা ছিলো মফস্বল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন। ইপজার শক্তিতে আমরা ঢাকার পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের সম্মানী (পারিশ্রমিক) নিয়ে দরকষাকষি করতাম। ইপজার শক্তি বৃদ্ধি এবং মফস্বল অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রেসক্লাব গঠনে ব্রতী হই। বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক যুগভেরীর (প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৩০ এবং স্বাধীনতার উত্তরকালে দৈনিক হয়) সম্পাদক আমীনূর রশীদ চৌধুরীর সমর্থন ও প্রধান সহযোগিতায় আমরা সিলেট প্রেসক্লাব গঠন করি।
দিনটি ১৩ জুলাই। সিলেটের সাংবাদিক ও সংবাদপত্র জগতের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। এখন থেকে অর্ধশতাব্দীরও বেশিকাল আগে ১৯৬৫ সালের ওইদিন সিলেট প্রেসক্লাব গঠিত হয়। প্রেসক্লাব গঠনে দৌড়াদৌড়ি ও যোগাযোগে কর্মী হিসেবে আমার সঙ্গে পেয়েছিলাম নন্দগোপাল চৌধুরী, আব্দুল বাতিন তালুকদার, শামসুজ্জামান সুফী, শহীদ লোহানীকে। অন্যরা ছিলেন সহযোগী। মাথার ওপরে ছায়া হিসেবে ছিলেন যুগভেরী সম্পাদক আমীনূর রশীদ চৌধুরী, প্রাচনীতম সাহিত্য সাময়িকী মাসিক আল-ইসলাহ’র সম্পাদক নূরুল হক ও সাপ্তাহিক জনশক্তির’র সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী। রেডিও পাকিস্তান সিলেট কেন্দ্রের সহকারী বার্তা সম্পাদক পদে সেসময় যোগ দেন সুলতান আলী । প্রেসক্লাব গঠনের লক্ষ্যে সাংবাদিকদের ঐতিহাসিক সভাটি অনুষ্ঠিত হয় চৌহাট্টায় তার কার্যালয়ে। ঐতিহাসিক দিনটি ১৩ জুলাই ১৯৬৫।
যুগভেরী সম্পাদক আমীনূর রশীদ চৌধুরীকে সভাপতি নির্বাচিত করে সিলেট প্রেসক্লাবের গোড়াপত্তন হয়। ঐতিহাসিক সভাটি যার পৌরহিত্যে অনুষ্ঠিত হয় তিনি জনশক্তি সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী। প্রথম কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদ ছিলো না।
প্রথম প্রেসক্লাবের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নি¤œরূপ :
সভাপতি: আমীনূর রশীদ চৌধুরী
সহ-সভাপতি: নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী
সহ-সভাপতি: মুহাম্মদ নূরুল হক
যুগ্ম সম্পাদক: হিমাংশু শেখর ধর ঝণা বাবু ( সহ-সম্পাদক, সাপ্তাহিক যুগভেরী ও ইস্টার্ণ হেরাল্ড)
যুগ্ম সম্পাদক: আব্দুল মন্নান (সম্পাদক, সাপ্তাহিক আওয়াজ)
কোষাধ্যক্ষ: এম এ নূর (ইউনিটি)
সদস্য: রজিউর রহমান (এপিপি), সুধীন্দ্র বিজয় দাশ (দৈনিক অবজারভার), রফিকুর রহমান লজু (দৈনিক সংবাদ), শামসুজ্জামান সুফী (দৈনিক পাকিস্তান), সুলতান আলী (সহকারী বার্তা সম্পাদক, রেডিও পাকিস্তান সিলেট কেন্দ্র), আব্দুল বাতিন তালুকদার, এজি শামসুল আলম (জেলা জনসংযোগ অফিসার), সি এম হায়দার, শহীদ লোহানী (এপিপি), নন্দগোপাল চৌধুরী (দৈনিক সংবাদের স্টাফ প্রতিনিধি) এবং ফটো সাংবাদিক শহীদ লোহানীও ছিলেন।
সিলেট প্রেসক্লাব গঠিত হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে একটি গঠনতন্ত্রের প্রয়োজন হয়। একই সভায় হিমাংশু শেখর ধরকে আহবায়ক করে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন উপকমিটি গঠন করা হয়। উপকমিটির সদস্য ছিলেন রজিউর রহমান, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, শহীদ লোহানী এবং এজি শামসুল আলম।
সিলেট প্রেসক্লাব সেই ১৯৬৫ সাল থেকে ক্রমে ক্রমে এবং পরবর্তীকালে আরও সমৃদ্ধ, পূর্ণাঙ্গ ও ঐশ্বর্যময় প্রেসক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভূমি হয়। এই ভূমির ওপর একচালা টিনের ঘর হয়। টিনের ঘর থেকে একতলা পাকা ভবন দু’তলা ভবন এবং পরে দৃষ্টিনন্দন ভবন হয়।
বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর যখন প্রেসক্লাবের নিজস্ব ঠিকানার জন্য একখন্ড ভূমি পাওয়া যায়, ওই ভূমির ওপর ইমারত নির্মানের পথ সুগম হয় তখন প্রেসক্লাব পুনর্গঠিত হয়। গতি আসে কার্যক্রমে। সেই গতিধারা দিনে দিনে শানিত হয়েছে। আজ প্রেসক্লাবের সৃজণশীল কর্মকান্ডের খবর শুনে আনন্দিত হই। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেসক্লাব পূণর্গঠনের সাল ও তারিখকে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠাকাল বলে ভ্রান্তি তৈরী করেন। যে কারণে সিলেট প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে দীর্ঘদিন একটা ধু¤্রজাল ছিলো। বর্তমান কমিটি ১৯৬৫ সালের ১৩ জুলাইকে প্রতিষ্ঠাকাল ঘোষনা দিয়ে একটি ঐতিহাসিক কাজ করেছে বলে আমি মনে করি। শুধু তাই নয় ১৩ জুলাইকে প্রতিবছর ‘সিলেট প্রেসক্লাব ডে’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানালেন সাধারণ সম্পাদক। ইতিহাসকে নির্মোহভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য এ কমিটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
লেখক : সিলেট প্রেসক্লাব গঠনকালের একজন কর্মী।

সর্বাধিক ক্লিক