প্রচ্ছদ

সুন্দরীদের দাওয়াত পার্টি

২৬ অক্টোবর ২০১৮, ১০:৪১

329

মির্জা মেহেদী তমাল :: হাজারীবাগ এলাকার এপার্টমেন্টে দামি একটি গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে আসেন এক নারী। তার সারা গায়ে দামি স্বর্ণালঙ্কার। লম্বা। দেখতে সুন্দরী। গার্ড এগিয়ে এসে পরিচয় জানতে চান। ওই নারী এপার্টমেন্টের একটি ফ্ল্যাটের মালিক তানজিনার বাসায় যাবেন বলে জানান। তানজিনার আমেরিকা প্রবাসী ননদের বান্ধবী তিনি। গার্ড নিচ থেকে ইন্টারকমে কথা বলে তাকে যাওয়ার অনুমতি দেন। অনুমতি পেয়ে সেই নারী তানজিনার ফ্ল্যাটে হাজির। তবে তানজিনা তাকে আগে কখনো দেখেননি। তার ননদের বান্ধবী পরিচয় দেওয়ায় তাকে ফ্ল্যাটের ভিতরে বসতে দেন। সেই নারী তানজিনাকে বলেন, ‘আমি আমেরিকায় থাকি। আপনার ননদ আর আমরা পাশাপাশি থাকি সেখানে’। সেই নারী তানজিনাকে বলেন, র‌্যাডিসন হোটেলে তার ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। তাই দাওয়াত দিতে এসেছেন। বিয়ের জন্য তারা আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসেছেন। আলাপ আলোচনায় ওই মহিলা গৃহিণীর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সম্পর্কেও নানা কিছু বলেন। যা সত্য। এক কথায় দুই কথায় তাদের মধ্যে দারুণ জমে যায়। নানা কথাবার্তায় গৃহিণী তানজিনার মনে বিশ্বাস হয়। ওই মহিলাকে ড্রয়িং রুমে বসতে দেন। মহিলা বলেন, ‘আমেরিকা থেকে আমার ভাই ও অন্য সদস্যরাও এসেছেন। তারাও আপনার বাসায় বেড়াতে আসছেন। তারা নতুন অতিথি। তারা এসে অগোছালো দেখলে খারাপ লাগবে। আপনার ননদ কিন্তু বলেছিলেন আপনি নাকি সাজগোছ পছন্দ করেন। এসব বলে তানজিনাকে সাজগোছ করতে জোর করেন’। তানজিনা বলেন, তার স্বামী বাইরে আছেন। তিনি এলেই সাজগোছ করবেন। কিন্তু সেই মহিলা নাছোর। চাপাচাপিতে তানজিনা সাজগোছের প্রস্তুতি নিলেন। একপর্যায়ে তানজিনা আলমারি থেকে স্বর্ণালঙ্কারের বাক্স বের করে সাজগোছ করতে থাকেন। ইতিমধ্যেই ভাব জমায় ওই মহিলা ফ্ল্যাটের প্রতিটি রুম ঘুরে ফিরে দেখেন। বাক্সে থাকা অনেক গহনার মধ্যে কিছু নিয়ে সাজগোছ করেন তানজিনা। বাকিগুলো বাক্সেই থেকে যায়। বাক্সটি পাশেই রেখে দেন। কারণ বাসায় আসা অতিথি ওই মহিলার গায়ে যে পরিমাণ গহনা আছে, তার চেয়ে অনেক কম আছে ওই বাক্সে। ফলে ওই মহিলা গহনা হাতিয়ে নিতে পারে, সেটি গৃহিণীর কল্পনার বাইরে। সাজগোছ করার পর দুজনে আবার গল্প করতে থাকেন। এ সময় মহিলা মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। কথাবার্তার ভাব অন্যরকম। ফোনে তার ভাইকে উদ্দেশ করে বলছেন, বিদেশ থেকে আনা উন্নতমানের চকলেট নিয়ে আয় বাচ্চার জন্য। বেশি দেরি করিস না। এমন আলাপ আলোচনার একপর্যায়ে গৃহিণী ছোটখাটো প্রয়োজনের জন্য এক রুম থেকে অন্য রুমে যাতায়াত করছিলেন। এক সময় তিনি টয়লেটে যাবেন। তার আগে সুন্দরী অতিথিকে বলেন, ‘আপনি বসুন, আমি টয়লেট থেকে আসছি।’ এ সময় অতিথি বলেন, আপা আপনি এই ঠোপ ব্যাগটা রোখেন তো। এতে চার হাজার ডলার আছে। পরে এসে আমি নিয়ে যাব। আমার ভাই চলে আসতেছে। আপনি তাড়াতাড়ি টয়লেট থেকে আসুন।’

গৃহিণী ব্যাগ রাখতে রাজি হয় না। গৃহিণী বলেন, যদি হারিয়ে যায়, তখন কী হবে। তখন ওই মহিলা বলেন, আমেরিকায় অনেক টাকা কামিয়েছি। জানি আপনি খুবই দায়িত্বশীল মানুষ। হারানোর প্রশ্নই আসে না। যদিও নিতান্তই হারিয়ে যায়, তাহলে আমার কোনো দাবি নেই। নেন, চট করে বাথরুম সেরে আসুন। টয়লেট থেকে বেরিয়ে গৃহিণী দেখেন বাড়িতে ওই মহিলা নেই। সঙ্গে সঙ্গে নিচে থাকা গার্ডের কাছে গেলে তিনি মহিলা দ্রুত গাড়িতে চরে বেরিয়ে গেছেন বলে জানান। পরবর্তীতে বাসায় রেখে যাওয়া ডলারের ব্যাগ তল্লাশি করে দেখা যায়, তার ভিতরে সাদা কিছু কাগজ। খাটের ওপর রেখে যাওয়া স্বর্ণালঙ্কারের বড় বাক্সটি নেই। আরেকটি বাক্স খালি পড়ে আছে। প্রায় ২০ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার ছিল সেখানে। গৃহিণী বুঝতে পারে, এটি সেই মহিলার কাজ। তিনি দ্রুত আমেরিকায় যোগাযোগ করেন ননদের সঙ্গে। ননদ জানায়, এমন কোনো বান্ধবী তার নেই। তার পরিচিত কেউ বাংলাদেশেও যায়নি। গৃহিণীর স্বামী বাসায় আসেন। পুলিশকে জানায়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। ততক্ষণে তাদের থেকে অনেক দূরেই সেই প্রতারক সুন্দরী নারী।

রাজধানীতে সংঘবদ্ধ সুন্দরী নারী অপরাধী চক্র সক্রিয়। তারা দামি স্বর্ণালঙ্কার পরে আর দামি গাড়ি হাঁকিয়ে বিয়ের দাওয়াত কার্ড দেওয়ার কথা বলে টার্গেট করা বাসা বা ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। এরপর বাড়ির লোকজনের সঙ্গে ভাব জমিয়ে কৌশলে স্বর্ণালঙ্কার, টাকা পয়সাসহ মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। রাজধানীর হাজারীবাগ রায়ের বাজারের গদিঘর এলাকায় সম্প্রতি এমন ঘটনার শিকার গৃহিণী তানজিনা।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এরা সংঘবদ্ধ অপরাধী। তারা নানা কৌশলে বাসায় প্রবেশ করে এ ধরনের অপরাধ করে থাকে। তবে এ ধরনের অপরাধে জড়িতরা টার্গেট করা ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়। আর সঙ্গে নিকট প্রতিবেশী ছাড়াও ঘনিষ্ঠ অন্যরা জড়িত থাকে। তারাই মূলত প্রতারক চক্রের কাছে পরিবার সম্পর্কে তথ্য দেয়। সেই তথ্যকে পুঁজি করেই প্রতারণার এমন ঘটনা ঘটায়।
বিডি প্রতিদিন

0Shares

সর্বাধিক ক্লিক