প্রচ্ছদ

অগ্নিঝরা মার্চ
১১৫ নম্বর সামরিক আইন আদেশ জারি

১৩ মার্চ ২০১৯, ১৫:৪৪

sylnewsbd.com

‘‘পূর্ব বাংলা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আমরা এখন একটি পূর্ববাংলা সরকারের অপেক্ষায় আছি: মওলানা ভাসানী’’

জাকির হোসেন :: বাংলার জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অসহযোগ আন্দোলন দমনের জন্য স্বৈরাচারী সামরিক সরকার একত্তরের এই তারিখে একটি বিশেষ সামরিক আইন আদেশ জারি করে। আদেশে বলা হয়, প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীদের ১৫ মার্চ সকাল ১০টার মধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। অন্যথায় তাদের চাকরিচ্যুত ও পলাতক ঘোষণা করে সামরিক আদালতে বিচার করা হবে। এই আদেশের ফলে সরকারবিরোধী অসন্তোষ ও বিক্ষোভ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। রাত্রে সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে স্বাধীকার আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক আইনের আর একটি নির্দেশ জারিতে গভীর বিষ্ময় প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন,  আমরা যেখানে জনগণের পক্ষ হতে সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি সেখানে এই ধরনের আদেশ জারি জনগণকে উস্কানি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এদিন ভাসানীপন্থী ন্যাপ প্রধান  মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ভৈরবে এক জনসভায় বলেন, পূর্ব বাংলা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আমরা এখন একটি পূর্ববাংলা সরকারের অপেক্ষায় আছি। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার জন্য এখন স্লোগান দেওয়ার প্রয়োজন নাই। আর ওয়ালীপন্থী  ন্যাপ প্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান এদিন অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারাদেশের মানুষ এদিন অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয়। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে। প্রতিটি গ্রাম, শহর, নগর-বন্দরে চলে সংগঠিত প্রতিবাদ। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বিরোধী দলের নেতারাও সাধারণ মানুষের মানসিক প্রস্তুতি আঁচ করেন। মুক্তিকামী মানুষের পাশাপাশি আলেম সমাজের প্রতিনিধিরাও এদিন শামিল হন। সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান তারা।

এক বৈঠকে বিরোধী নেতারা এদিন অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। জমিয়াতুল উলামা-ই-ইসলামীর সংসদীয় দলের নেতা মাওলানা মুফতি মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সামরিক আইন প্রত্যাহার, ২৫ মার্চের আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এদিন পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে শীতলক্ষ্যায় একটি দীর্ঘ নৌ-মিছিল বের হয়। অন্যদিকে ঢাকা হতে এদিন জাতিসংঘ কর্মচারী ও বিদেশি নাগরিকদের অপসারণ শুরু হয়।

পরদিন ১৪ মার্চ (রোববার ) প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ১৩ মার্চের এসব ঘটনা  গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।  এ দিন (১৪ মার্চ, রোববার) ইত্তেফাক ‘উস্কানীমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করুন: সামরিক কর্তৃপক্ষের নয়া নির্দেশের জবাবে শেখ মুজিব’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। ইত্তেফাকে-এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্যন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল, ‘ভুট্টো-কাইয়ুমের দল ছাড়া পশ্চিমাঞ্চলের সব দলেরই এক কথা-, ‘২৬৫জন বিদেশী নাগরিক ঢাকা হইতে অপসারিত’, ‘গভর্নর হাউজের আঙ্গিনায় বোমা বিস্ফোরণ’ ইত্যাদি।

আজাদ এদিন ‘আগামীকাল হইতে স্টেট ব্যাংকের ক্লিয়ারিং হাউস চালু’  শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৫ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া ইত্তেফাক ‘সামরিক আইন আদেশ উস্কানীমূলক’, ‘১১৫ নম্বর সামরিক আইন আদেশ’, ‘৭ কোটি বাঙালী আজ যেখান হইতে নির্দেশ গ্রহণ করে ‘শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।

আর সংবাদ এদিন ‘মুজিবের দাবির সহিত সম্পূর্ণ একমত: ওয়ালী’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়াও সংবাদ এদিন ‘১১৫ নম্বর মার্শাল ল’ অর্ডার’, ‘এই ধরনের নির্দেশ উস্কানীমূলক: মুজিব’, ‘বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন, শ্লোগানের প্রয়োজন নাই : ভাসানী’  শিরোনামে কয়েকটি খবর  গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। ৭১-এর  ১৪ মার্চ (রোববার) আজাদ ও সংবাদে -এ  প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হল:

সামরিক আইন উস্কানীমূলক: মুজিব
স্টাফ রিপোর্টার:
 গতকল্য (১৩ মার্চ, শনিবার) রাত্রে সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক আইনের আর একটি নির্দেশ জারীতে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন যে, যে ক্ষেত্রে আমরা জনগণের পক্ষ হইতে সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি জানাইতেছি সে ক্ষেত্রে এই ধরনের আদেশ জারী জনগণকে উস্কানী দান ছাড়া আর কিছুই নহে। তিনি বলেন যে, যাহার এই ধরনের আদেশ জারী করিতেছেন তাহাদের পক্ষ হইতে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সজাগ হওয়া উচিত এবং স্মরণ রাখা উচিত যে, জনগণ আর এই ধরনের ভীতির নিকট নতি স্বীকার করিতে রাজী নহে। তিনি সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি এই ধরণের উস্কানীমূলক তৎপরতা হইতে বিরত থাকার আহ্বাণ জানাইয়া বলেন যে, ‘জনগণ এই ধরনের ভীতির মুখেও তাহাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখায় দৃঢ় সংকল্প। কারণ তাহার জানে যে, ঐক্যবদ্ধ জনতার মোকাবিলার শক্তি কারো নাই! (আজাদ: ১৪ মার্চ রবিবার, ১৯৭১) 

১১৫ নম্বর সামরিক আইন আদেশ
ঢাকা, ১৩ মার্চ।-
 যে সকল বেসামরিক কর্মচারী প্রতিরক্ষা খাত হইতে বেতন পাইয়া থাকেন তাহাদের আগামী সোমবার (১৫মার্চ) হইতে কাজে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। অন্যথায় তাহাদের চাকরি হইতে বরখাস্ত করা হইতে পারে এবং পলাতক হিসেবে সামরিক আদালতে তাহাদের বিচার অনুষ্ঠিত হইতে পারে। আজ ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক প্রশাসকের দপ্তর হইতে সামরিক আইনের ১১৫ নং আদেশে উপরোক্ত ঘোষণা করা হয়। (আজাদ: ১৪ মার্চ রবিবার, ১৯৭১) 

সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে ওয়ালী খান, শেখ মুজিবের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন রহিয়াছে
স্টাফ রিপোর্টার:
 ন্যাপ প্রধান খান আব্দুল ওয়ালী খান গতকাল (১৩ মার্চ শনিবার) ঢাকায় বলেন যে, অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি প্রতি তাহার পূর্ণ সমর্থন রহিয়াছে। গতকাল শনিবার করাচী হইতে ঢাকা আগমনের পর বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের নিকট জনাব ওয়ালী উপরোক্ত মন্তব্য করেন। (আজাদ: ১৪ মার্চ রবিবার, ১৯৭১) 

বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন: শ্লোগানের প্রয়োজন নাই-ভাসানী
ভৈরব ১৩ মার্চ (এনা)
-মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আজ এখানে বলেন, ‘পূর্ব বাংলা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আমরা এখন একটি পূর্ববাংলা সরকারের অপেক্ষায় রহিয়াছি। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার জন্য কোনো শ্লোগান দেওয়ার প্রয়োজন নাই। এখানে রেল ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় বক্তৃতাদান কালে ভাসানীপন্থী ন্যাপ প্রধান বলেন, পূর্ব বাংলার জন সাধারণ তাহাদের মৌলিক অধিকার কায়েমের জন্য সংগ্রাম শুরু করিয়াছে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের জন্য কিভাবে রক্ত দিতে হয় তাহা আমাদের জানা আছে।
মওলানা ভাসানী স্বাধীনতার জন্য শান্তিপূর্ণ, অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনে সকল শ্রেনীর জনগণের ধৈর্য্য ও একতার প্রশংসা করেন এবং বলেন, স্বাধীনতা ইতিহাসে এই ঐক্য অতুলনীয়। মওলানা জনসাধারনের ট্যাক্স প্রদান না করার জন্য শেখ মুজিব যে নির্দেশ দিয়াছেন তাহা মানিয়া চলার উপদেশ দেন এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি ও চোরচালান রোধের জন্য তাহাগিদকে সংগ্রাম পরিষদ গড়ার আহ্বাণ জানান। তিনি বিদেশী কাপড় ও মাদকদ্রবাদি ব্যবহার না করার উপদেশও দেন। (সংবাদ: ১৪ মার্চ রবিবার, ১৯৭১) 

ঢাকা হইতে জাতিসংঘ কর্মচারী ও বিদেশী নাগরিকদের অপসারণ শুরু
ঢাকা, ১৩ মার্চ (এপিপি)
-পূর্ব পাকিস্তান কর্মরত ১৫ জন জাতিসংঘ কর্মকর্তা এবং ৬০ জন্য পোষ্যকে আজ সকালে ব্যাংককে সরাইয়া লইয়া যাওয়া হয়। পশ্চিম পাকিস্তান হইতে প্রেরিত একটি বিশেষ বিমান ৩৭জন জার্মান নাগরিককে লইয়া ব্যাংকক যাত্রা করে। জাতিসংঘ সেক্রেটারী জেনারেল উ’থান্ট চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে ঢাকাস্থ জাতিসংঘ প্রধানকে প্রয়োজন হইলে তাহার কর্মচারীদের অন্যত্র সরাইয়া লওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেন। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ প্রধান একজন পশ্চিম জার্মান নাগরিক। আজ ৩৭ জন জার্মান নাগরিক ঢাকা ত্যাগ করেন এবং ইহার ফলে পূর্ব পাকিস্তান হইতে ২ শত ৭৯ জন জার্মান নাগরিক অপসারণের কাজ সমাপ্ত হয়। পূর্বাহ্নে ২ শত ৪২ জন জার্মান নাগরিক দুইটি দলে বিভক্ত হইয়া পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে। ৫০ জনের মতো জাপানী নাগরিকও আজ স্বদেশ যাত্রা করে।  (সংবাদ: ১৪ মার্চ রবিবার, ১৯৭১)  

অসহযোগ
(নিজস্ব বার্তা পরিবেশক) 
গতকাল  (১৩ মার্চ শনিবার) অসহযোগ আন্দোলনের ষষ্ঠ দিবস পরিপূর্ণ সাফল্যের সহিত অতিবাহিত হয়। গতকালের অসহযোগে রাজধানীর ঢাকা ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় আন্দোলনের সমর্থনে বেশ কয়েকটি মিছিল বাহির হয়। ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মশাল মিছিল, চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিক্ষোভ, মিছিল ও নারায়নগঞ্জে নৌ পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের মিছিল ইহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সকল মিছিলই অযুত কণ্ঠে মুক্তি সপথ  গ্রহন এবং গণসংগ্রামের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা হয়।
এদিকে অসহযোগ আন্দোলন হেতু গতকালও সারা বাংলায় সরকারী আধাসরকারী ও সায়ত্বশাষিত সকল দপ্তর তালা বদ্ধ থাকে। হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালত গুলিতে বিরাজ করে জনশূন্যতা। তবে নির্দেশ অনুযায়ী ব্যাংক, জরুরি সার্ভিস, হাট-বাজার, দোকানপাট খোলা ও সকল যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকে।  (সংবাদ: ১৪ মার্চ রবিবার, ১৯৭১)

জাহো/এসএমএম

সর্বাধিক ক্লিক