অন্ধকার গলিতে আলো জ্বালাতে অভিশপ্ত জীবন

প্রকাশিত: ৩:৩৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২২

অন্ধকার গলিতে আলো জ্বালাতে অভিশপ্ত জীবন

অনলাইন ডেস্ক :: সব হারিয়ে মুক্তি পেতে বেছে নেন অভিশপ্ত জীবন! অচেনা পুরুষেরা এখন তার দিনরাতের সঙ্গী। বিভীষিকাময় জীবনে ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুর হাতছানি। জীবিকার তাগিদে দিয়েছেন স্বপ্নের বিসর্জন। এখন অন্ধকার গলিতেই জীবনের আলো জ্বালানোর চেষ্টা তার।

বলছি সদ্য যৌনকর্মী বনে যাওয়া এক নারীর গল্প। এক সময় সবই ছিল তার। তবে এখন তিনি নিঃস্ব। যুদ্ধ করছেন বেঁচে থাকার। নিজের সোহাগ বিক্রি করে করছেন উপার্জন।

মাস দুয়েক আগে তার নিজের একটা বাড়ি ছিল। এখন সেই বাড়িও আর নেই তার। সুরমা নদীর বুকে হারিয়েছেন ঠিকানা। সেই থেকে ঘুরছেন পথে পথে। খুঁজছেন দিন শেষে মাথা গোঁজার ঠাঁই।

২৯ বছরের ওই নারী তিন মাস বয়সে বাবাকে হারান। এখানেই শেষ নয়। ১২ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে হয়ে পড়েন একা। আত্মীয়-স্বজনরা কেউ দাঁড়ায়নি তার পাশে। ১৩ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান নারায়ণগঞ্জে। সেখানে এক পোশাক কারখানায় শুরু করেন কাজ। এর বছর চারেক পরে ১৭ বছর বয়সে ২০১০ সালে করেন বিয়ে। একই সঙ্গে পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ ছেড়ে দিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নতুন জীবনের।

সুখেই কাটছিল তার সংসার। তার দাম্পত্য জীবনে জন্ম নেয় এক ছেলে সন্তান। তবে ২০১৫ সালে তার সংসারে বেজে উঠে ভাঙনের সুর। বনিবনা না হওয়ায় তাকে ডির্ভোস দেন তার স্বামী। তার জীবনে স্থায়ী হলো না সুখ। ফের হয়ে গেলেন তিনি একা। মাস খানেক পর ফিরে যান পুরনো পেশায় সেই পোশাক কারখানায়। দীর্ঘ সাত বছর করেন কাজ একটানা। তবে বেতনের টাকা দিয়ে তার জীবন না চলায় মাস পাঁচেক আগে সেই কাজও ছেড়ে দেন। তার ওই ছেলে সন্তানের বয়স এখন ১২ বছর। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সে। ছেলেটার দায়িত্ব পুরোপুরি তার ওপর। সেই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে নিজ গ্রামের এক নারীর হাত ধরে বনে যান যৌনকর্মী। এখন বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে ভদ্রপল্লীর অচেনা পুরুষদের হন সঙ্গী। সম্প্রতি বন্যায় হারিয়েছেন তার বাড়িঘরও।

কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, ‘মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে আমার। অভিশপ্ত জীবন ভালো লাগছে না। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বেঁচে আছি। তাকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। আর একটা বাড়ি করতে হবে। এ কারণেই অন্ধকার জগতে নেমেছি। নিজের জায়গা জমি নেই। আমার বাবার করা তিন শতকের ওপর একটি বাড়ি ছিল। সম্প্রতি সুরমা নদীর গর্ভে সেই বাড়ি বিলীন হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পাঁচ মাসেক আগে গ্রামের এক নারীর মাধ্যমে অভিশপ্ত এ পেশা বেছে নিই। এই সময়ের মধ্যে অনেক অচেনা পুরুষের শয্যা সঙ্গী হয়েছি। তারা সবাই ভদ্রপল্লীর বাসিন্দা। তবে অন্ধকারপল্লীতেই তাদের আনাগোনা বেশি। তবে আমাদের জীবনই শুধু অভিশপ্ত। সমাজ আমাদের মেনে নেয় না। অথচ ভদ্রপল্লীর সেই পুরুষরাই আমাদের পেশাকে টিকিয়ে রেখেছেন।’

অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সমাজ আমাদের ভিন্নদৃষ্টিতে দেখে। অথচ অনেক নারী আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার পরেও ভদ্রপল্লীতে থেকে বিভিন্ন অপকর্ম করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখে সমাজ। যত দোষ আমাদের।’

এখন প্রতিমাসে ২০-২৫ হাজার টাকা উপার্জন করছেন তিনি। এই টাকার অধিকাংশই ছেলে জন্য খরচ করতে হয়। তার ছেলে পড়াশোনা করে একদিন অনেক বড় চাকরি করবে এ আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার পেশা সম্পর্কে ছেলে কিছুই জানে না। আমি সবসময়ই চেষ্টা করি নিজের পেশাকে তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার।’

তিনি জানান, তার খুব ইচ্ছে করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পেতে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু তিনি একাই নন, তার মতো অসংখ্য নারী যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তারাও স্বপ্ন দেখে ফিরে পেতে স্বাভাবিক জীবন।
এস:এম:শিবা

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ