আইফোন ১১ ও ভাল বাবা

প্রকাশিত: ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২২, ২০২০

আইফোন ১১ ও ভাল বাবা

জুয়েল সাদত :: মেয়ের আলটিমেটাম? তিনদিনের সময় নিয়েছি, ২৩ তারিখ দুপুরের পর জানাতে হবে সে কি পাচ্ছে।।
ফোন নষ্ট হয়েছে, তার একটা ফোন দরকার?

ভাবছিলাম লিখব না?
তারপরও সোস্যাল মিডিয়া কে বাদ দিয়ে যখন জীবন- সংসার- জন্ম -মৃত্যু বিয়ে – জানাজা হচ্ছে না, সেখানে কেন বাদ দিব /
আমারও একটি বাবা ছিল,

খুবই কম সময় নিয়ে এসেছিলেন পৃথিবীতে। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারী ( আমি তখন সপ্তম শেনীতে) ২৯ তারিখ চলে গেলেন, ক্যান্সারের সাথে যুদ্ব করতে করতে, চেষ্টার সবটুকু করা হয়েছিল তখন। আজও অবাক লাগে ২০২০ সালে ও ক্যান্সার হলে ৬ মাস টিকানো যায় না। আমরা পুরো ৮৫ সালটা চেষ্টা করেছিলাম, তখন টাকা পয়সার অভাব ছিল না।
যাক, সে প্রসঙ্গ।। তখন ডাক্তাররা এক্সপেরিমেন্ট করছিল, নতুন এই অজানা রোগ নিয়ে। এ্যালপেথি, হমিওপ্যাথি সবই চলল। ঢাকা থেকে দেশের সেরা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার আলী আহমেদ কে বিমানে আনানো হয়েছিল। কত স্মৃতি।
আজও মালনিছড়া বাগানে কুলিরা স্মরন করে,যাত্রা পালার নির্দেশক,গ্রীন রুমের প্রানপুরুষ, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে চমৎকার মানুষ ছিলেন । আমাকে দশ বছর বয়স থেকে বন্দর বাজার থেকে বাজার করা,চা বাগানের টিলায় নিয়ে ঘুরতেন, সব কিছু শিখালেন। হয়ত ভেবেছিলেন আগে চলে যাবেন। আমার ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ উ্যকন্ঠা ছিল।

মধ্যবিত্ত সমাজটায় ছিল তখন পড়াশোনা অহংকার করার মত। আমাদের ভাল পড়াশোনা করানোর জন্য শ্রিমঙ্গল এলাকার ভাল চা বাগান থেকে ১৯৬৯ সালে বাবা ছোট পদের চাকরী নিয়ে মালনিছড়া চা বাগানে আসেন ( সেটা নিয়ে ভাবতে হয়, কত দুরদর্শি চিন্তা, বড় পদ রেখে ছোট পদের চাকরি নিয়ে সিলেট শহরে থাকার চিন্তা)। উনার সিলেট আসার সুবাধে আমাদের চাচাতো,ফুফাত বোন ভাই সবাই সিলেটে ভাল কলেজে পড়তে পারলেন । অবাক ১৯৬৯ সালের আব্বা আম্মার চিন্তা ধারনা ২০২০ সালে একই ফরমেটে আমরা দেশে- বিদেশেও।
আমরা দু ভাই এম সি কলেজে ও চারবোন সিলেটের অগ্রগামী মহিলা স্কুলে ( জিন্দাবাজার) পড়েন। আজও এই দুই প্রতিষ্টানে ভর্তি করতে পারলে অনেকেই তৃপ্তির ঢেউ তুলেন।
যাক,আব্বার ইচ্ছা আমাকে ক্যাডেট কলেজে পড়াবেন, আর্মিতে যেতে পারব, সে রকম একটা চিন্তা লালন করলেও সেটা হয়ে উঠেনি।

কারন ৮৬ সালে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে যাবার প্রস্তুুতি জানুয়ারী তে আব্বা মারা যাবার পর ভেস্তে যায়। অবাক হবার বিষয় আব্বা মারা যাবার পর কাঁদতে হয়নি, কারন আব্বার অনেক কষ্ট হচ্ছিল তাই। আজ চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, অনেক আদর্শিক মানুষ ছিলেন। ১২/১৩ বছর বয়সে আর কতটুকু চেনা যায়। তারপরও চমৎকার এতটা অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। আজ অনেক কিছু আছে আব্বা নেই। বিকশিত হবার সময়টা দেখানো গেল না।

আমার মা – জননি বাবার ৭৫ শতাংশ পুরন করেছেন। তিনিই বাবা, তিনিই সবকিছু।। আছেন কাছাকাছি সব সময়। বার্ধক্যে কিছুটা ভারাক্রান্ত, চমৎকার স্মৃতি চারন করেন নেই সময়গুলোর।
লেখাটা অকারনে লম্বা হয়ে গেল।
আসলে কোন তারিখ সময় দিয়ে তাদের স্মরন করতে হয় না। তারা প্রতিদিন থাকবেন অন্তরে।। তারা আমাদের কোন খেলনা কিনে দেবার সামর্থ অর্জন করেন নি, ভাল জুতা,ভাল স্কুল ব্যাগ,ভাল জামা কাপড় দিতে পারেন নি। সততার জীবন, কঠিন মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী সমাজের কারনে তাদের হয়ে উঠেনি।। তবে তারা অনেক কিছু করেছেন, আজ আমাদের বাচ্চাদের অনেক কিছু দেবার পরও তারা থাকে না। একটা স্বার্থের সম্পর্কে জড়ানো।
এই কথাটি অনেক সত্যি প্রবাসে।। বাচ্চাগুলো স্বার্থপর,আইফোন ১১ দিলে ভাল বাবা।।
না দিলে মিন।

সরি, অনেক লম্বা হয়ে গেল।

বাবারা সব সময় সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তৃপ্তি পায়।
মরহুম গোলাম মোছাওয়ির আমার বাবা, একটি সুন্দর উদাহরন দিয়ে শেষ করব। খুব সম্ভবত মুসলিম লীগার ছিলেন, সবাই জানেন বাংলাদেশ হবার আগে সব কিছু ই পাকিস্তান ছিল। পাকিস্তান কেন্দ্রিক ছিল। শহিদ আলকাছ নামে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের একজন মন্ত্রী ছিলেন, সিলেটের মানিকপীর টিলায়, অজু খানার সামনে কবর। আব্বা আমাদের বলে গিয়েছিলেন, উনার কবর হবে শহিদ আলকাছের পাশে। উনাকে সেখানেই রাখা হয়েছে।
শহিদ আলকাছ কে ছিলেন পরে জানলাম, তিনি সিলেট কোর্ট বিল্ডিং এ পাকিস্তানের পাতাটা টাঙ্গাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। মারা যান। শহিদ আলকাছের চমৎকার বর্নাট্য জীবন ছিল।
শহিদ আলকাছ কে কতটা পছন্দ করতেন আব্বা চিন্তা করে পাইনা আজও । তার পাশেই তিনি শায়িত হলেন।
দুজনের জন্য দোয়া।।

আমিন
লেখক : সাংবাদিক

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ