আকবর পুলিশ হেফাজতে থেকেও পালিয়ে যায় কিভাবে: রায়হানের মায়ের প্রশ্ন

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২০

আকবর পুলিশ হেফাজতে থেকেও পালিয়ে যায় কিভাবে: রায়হানের মায়ের প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:: ৭২ ঘন্টার মধ্যে এসআই আকবরকে গ্রেপ্তার, বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবিসহ ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন রায়হানের মা সালমা বেগম।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় নিহত রায়হান আহমদের পরিবার ও বৃহত্তর আখালিয়া এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সালমা বেগম।

এ সময় সালমা বেগমের পক্ষে নিহতের মামাতো ভাই শওকত হোসেন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে উলে­খ করা হয়, আমার ছেলে রায়হান আহমদ (৩৩) কে গত ১১ অক্টোবর রাতে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আপনারা গণমাধ্যম কর্মীরাই সবার আগে জনসম্মুখে তুলে ধরেন। যা পুরো সিলেটসহ সমগ্র বাংলাদেশ, এমনকি বহির্বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। ফলে, দেশে বিদেশে সর্বস্তরের মানুষ রায়হান হত্যাকারী খুনি পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে আন্দোলনে নেমে এসেছেন। আমাদের এলাকা বৃহত্তর আখালিয়াবাসী গত ১২ অক্টোবর থেকে লাগাতার আন্দোলন করে আসছেন।

ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ মিছিল, মানব বন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রায়হান হত্যাকারী বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ জড়িত সকল পুলিশ সদস্যের গ্রেফতারের দাবীতে ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য রায়হান হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাব ইন্সপেক্টর আকবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারী আরও ৮ পুলিশ সদস্য এখনো পুলিশি হেফাজতে থাকলেও এখনো তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছেনা। এ সব বিষয়ে কথা বলার জন্য আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।”

তিনি আরো বলেন, “আমার ছেলে রায়হান আহমদ একজন ডাক্তারের চেম্বারের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতো। কে গত ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতের কোন এক সময় তাকে আটক করে বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ। পরে তাকে একটি সিএনজি অটোরিশাযোগে ফাঁড়িতে নিয়ে যায় পুলিশ সদস্যরা। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আমার নিজের মোবাইলে একটি কল আসে। কল রিসিভ করলে অপর প্রান্ত থেকে আমার ছেলে রায়হান আর্তনাদ করে বলে, ‘আমাকে বাঁচাও। কিছু টাকা নিয়ে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আসো। ফোন পেয়ে রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ চৌধুরী ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছান। ফাঁড়ির পুলিশের কাছে রায়হানের অবস্থান জানতে চান হাবিবুল্লাহ চৌধুরী। পুলিশ জানায়, রায়হান ঘুমিয়ে আছে এবং তাকে যারা ফাঁড়িতে নিয়ে এসেছে, তারাও চলে গেছে। কর্তব্যরত পুলিশ হাবিবুল্লাহ চৌধুরীকে সকাল সাড়ে ৯টার সময় ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে আসতে বলে। কথামতো সকাল পৌনে ১০টার দিকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে হাবিবুল্লাহ চৌধুরী বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছালে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানায়, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ চৌধুরী দ্রুত ওসমানী হাসপাতালের জরুরী বিভাগে উপস্থিত হয়ে জানতে পারেন, সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে রায়হান মারা যান। খবর পেয়ে আমিসহ আমাদের আত্মীয় স্বজন ওসমানী হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে আমার ছেলের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখতে পাই। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পুলিশ সদস্যদের আসামী করে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয় কোতোয়ালি জি. আর মামলা নং- ৪২৩/২০২০ ইং)।”

এসময় আরও বলা হয়, “ঘটনার পর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাব ইন্সপেক্টর আকবরসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা আমার ছেলেকে ছিনতাইকারী সাজিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের স্বজনরা ওসমানী হাসপাতালে থাকা আমায় ছেলের মৃতদেহে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন দেখে বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানালে গণমাধ্যম কর্মীরা অনুসন্ধানে নামে।

গণমাধ্যম কর্মদের অনুসন্ধানেই জানা যায়, ১১ অক্টোবর রাতে আমার ছেলে রায়হানকে আটক করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা জানতে পারি, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তাকে আটকে রেখে রাতভর নির্মম নির্যাতন করা হয়। রাতেই বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সাব ইনস্পেক্টর তৌহিদ এলাহির মোবাইল ফোন থেকে আমাকে কল করে ১০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। বন্দরবাজার ফঁড়ির ইনচার্জ সাব ইন্সপেষ্টর আকবর হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আমার ছেলেকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। রায়হানের দুই হাতের কব্জি ও পায়ের হাড় আঘাতের পর আঘাতে ভেঙ্গে দেয়া হয়। তার হাতের আঙ্গুলের নখ প্লাস দিয়ে টেনে তুলে ফেলা হয়।”

তিনি বলেন, “গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর পুরো সিলেটবাসী তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে রায়হানকে হত্যাকারী পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শান্তির দাবীতে বৃহত্তর আখালিয়াসহ পুরো সিলেটের মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। ফলে, বাধ্য হয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃপক্ষ বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ সাব ইন্সপেক্টর আকবরসহ ও পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করেন এবং আরও ৩ জনকে প্রত্যাহার করেন। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা নিতে গড়িমসি করেন। পরে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর)-এর লিখিত নির্দেশের পর থানা কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে বাধ্য হন।

কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত: পুলিশের এই চিঠি চালাচালির পর্যায়েই মূল আসামী, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর হোসেন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুলিশ এখনো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। মামলার তদন্তভার ইতোমধ্যে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই)-এর নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রায়হানের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে দ্বিতীয় দফা ময়না তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, গুরুতর আঘাতের কারণেই রায়হানের মৃত্যু হয়েছে।”

“কিন্তু, রায়হান হত্যকারী পুলিশ সদস্যদের কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়নি। ফলে, রায়হান হত্যা মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা নিহত রায়হানের পরিবার ও বৃহত্তর আখালিয়া এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত দাবীসমূহ উপস্থাপন করছি-

১. রায়হান হত্যকান্ডের বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবীতে আমরা ইতোমধ্যে সিলেটের মাননীয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছি।
২. রায়হান হত্যায় জড়িত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবার হোসেন ভূঁইয়া সহ দোষী সকল পুলিশ সদস্যকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবী জানাচ্ছি।
৩. পলাতক সাব ইন্সপেষ্টর আকবর হোসেনকে গ্রেপ্তারে মাননীয় আইজিপির নির্দেশ কামনা করছি।
৪. পুরো ঘটনার ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কর্তৃক একটি পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রদানের দাবী জানাচ্ছি।
৫. রায়হান হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।
৬. আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে খুনী পুলিশ ইন্সপেক্টর আকবরসহ হত্যায় জড়িত সকল পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা না হলে বৃহত্তর আখালিয়াবাসীর উদ্যোগে হরতাল, সড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচী ঘোষনা করা হবে এবং উদ্ভুত যে কোন পরিস্থিতির দায়ভার এসএমপি পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে।

রায়হানের কারো সাথে কোন বিরোধ ছিল কি না এমন প্রশ্নে রায়হানের মা বলেন, আমার ছেলে সহজ সরল। এলাকার অনেকেই তাকে চিনেন না। তার ডিউটি, আর বাজার খরচ ছাড়া আর কোন কিছুই সে করতো না।

তিনি বলেন, পুলিশ জানিয়েছে- এসআই আকবর পলাতক। বাকী অভিযুক্তরা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাহলে আকবর কিভাবে পালিয়ে যায়। এটা দায়িত্ব অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। এসআই আকবরকে পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়। পথিমধ্যে আকবর পালিয়ে যায়। আকবর পালানোর ব্যাপারে পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে বলেও উলে­খ করেন তিনি।

অশ্র“ভেজা কন্ঠে রায়হানের মা বলেন, পুলিশ ছাড়া আর কেউ হলে তো এতক্ষনে গ্রেপ্তার করা হতো। পুলিশ দোষী হলে কি তার বিচার হবে না?

তিনি অবিলম্বে এসআই আকবরসহ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ