আমার বাবা স্বপ্ন দেখতেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়ে উঠা একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমতাভিত্তিক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের

প্রকাশিত: ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

আমার বাবা স্বপ্ন দেখতেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়ে উঠা একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমতাভিত্তিক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের

এনামুল হাবিব

১৯৪২ সালে হবিগঞ্জ জেলায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন আমার পিতা প্রফেসর মো: হাবিবুর রহমান। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কর্ম বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। মাঝে চার বছর (১৯৭৭-১৯৮১) লিয়েনে পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করেছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য প্রফেসর সদরুদ্দিন আহমেদ এর আহবানে সাড়া দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসেন সিলেটে। ১৯৯৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০১ সালে উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হলে তিনি নিজ বিভাগে থাকতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ তাঁর মেয়াদ না বাড়ানোয় অবসরে যান। পরে নব প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটান বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট-এর উপাচার্য্ হিসাবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৭ জুলাই, ২০০৬ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নেন।
প্রফেসর মোঃ হাবিবুর রহমান স্বপ্ন দেখতেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়ে উঠা একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমতাভিত্তিক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। জাতির পিতার অবদান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য ১৯৯১ সালে সার দেশে ’বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ’ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলে সেই বৈরি সময়ে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব নেন। উদীচি সহ অসংখ্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন।
সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৪টি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন, সমাজকর্ম পরিভাষা, সমাজকর্ম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস (সম্পাদনা), আত্মহত্যার আর্থ-সামাজিক ও মনস্তাত্তিক কারণ, Social work and Social development, Urbanization and Urban Social Service in Bangladesh।
তাঁর একাডেমিক গ্রন্থসমূহ একত্র করে কয়েক খন্ডে প্রকাশের চিন্তা ছিল কয়েক বছর যাবত। উৎস প্রকাশনের মালিক প্রিয় মোস্তফা সেলিম ভাই সেই কাজ অক্লান্ত পরিশ্রম আর বাবার প্রতি গভীর আন্তরিকতায় সম্পন্ন করলেন এই বছর। তাঁর সব একাডেমিক গ্রন্থ ও অন্যান্য কাজ নিয়ে ৫ খন্ডে রচনাবলী আকারে প্রকাশিত হল জুন মাসে। ১ম খন্ডের ভূমিকা লিখেছেন বাবার প্রিয় ছাত্র ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কর্ম বিভাগের অধ্যাপক তুলসী কুমার দাশ। ২য় খন্ডের ভূমিকা লিখেছেন তাঁর আরেকজন প্রিয় ছাত্রী সমাজ কর্ম বিভাগের অধ্যাপক আমেনা পারভীন এবং অধ্যাপক আ ক ম মাহাবুবুজ্জামান। ৩য় খন্ডের ভূমিকা লিখেছেন রয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্ অধ্যাপক প্রফুল্ল কুমার সরকার। আর ৪থ্র্ খন্ডের ভূমিকা লিখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাবার দীর্ঘদিনের সহকর্মী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। তাঁদের প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।
বাবার বহু লেখা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্ণাল ও সংবাদ মাধ্যমে প্রবন্ধ ও নিবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ব্যস্ত ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্প্রসারণ আর নিরন্তর লেখালেখির কাজে। সামাজিক বিভিন্ন বিষয়, প্রতিথযশা ব্যক্তিবর্গ্ , রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ নিয়ে তিনি যেমন লিখেছেন তেমনি লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতা নিয়ে। শিক্ষার চালচিত্র, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নিয়ে তিনি যেমন লিখেছেন তেমনি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান নিয়ে তাঁর ভাবনাও প্রকাশ করেছেন অনেক লেখায়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশিত হয়েছে ’বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড’, ’মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’, ’বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও আমাদের দায়িত্ব’, ’যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা’ ইত্যাদি অনেক লেখায়। জাতির চিন্তা চেতনা গঠনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যে অবদান তা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়, সময়ের আবর্তনে সবাই বিস্মৃত হয়ে যায়। সেই বিস্মৃত স্মৃতি ধরে রাখতেই তিনি অনেকের জীবন ও কর্ম তুলে এনেছেন তাঁর লেখনিতে। ’উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান গ্রাজুয়েট দেলোয়ার হোসেন আহমেদ, ’স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মচিন্তা, ’শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুপদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য’, ’রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মুজিবর রহমান’, ’বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের জীবনাদর্শ’, ’বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী’, ’কবি রাধারমণ পুরকায়স্থ, ’জননেতা পীর হাবিবুর রহমান, ’অধ্যাপক মুহাম্মদ আসদ্দর আলী স্মরণে’, ’শ্রদ্ধেয় কমরেড বরুণ রায়, ’জনদরদী নেতা আব্দুল হামিদ, ’শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সালমান চৌধুরী’, ’জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ স্মরণে’, ইত্যাদি বিভিন্ন লেখা অন্যতম। তাঁর কলমে উঠে এসেছে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এমএস কিবরিয়া হত্যাকান্ডের প্রসঙ্গ, প্রগতিশীল শিক্ষক ড. মোহাম্মদ ইউনুস, ড. তাহেরের নির্মম হত্যাকান্ডের বিষয়গুলো।
তাঁর অগ্রন্থিত লেখাসমূহকে একত্র করে ৫ম খন্ড প্রকাশের কাজটিও করেছেন উৎস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারি জনাব মোস্তফা সেলিম। ৫ম খন্ড ও আলাদাভাবে প্রকাশিত প্রবন্ধগুচ্ছের ভূমিকা লিখেছেন প্রফেসর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা দুইজন একসাথে কাটিয়েছেন বহু বছর, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মেধাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে তাঁরা দুজনেই কাজ করেছেন ক্লান্তিহীনভাবে। ভূমিকাটি নেবার সময় জাফর ইকবাল স্যারের কথাটি এখনও কানে বাজে, ’হাবিবুর রহমান স্যারের যে কোন কাজে আমাকে সব সময় কাছে পাবেন’। বাবার প্রতি জাফর স্যারের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তাঁর বিভিন্ন লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। বিষয় বৈচিত্রে ভরপুর প্রবন্ধগুচ্ছ পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে বিশ্বাস করি। একই সাথে সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক সকল গ্রন্থ নিয়ে সংকলিত ১ম থেকে ৪র্থ্ খন্ড একাডেমিক ও গবেষণার কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের কাজে লাগবে বলে প্রত্যাশা করি।
নশ্বর পৃথিবী থেকে মানুষের চলে যাওয়া অবধারিত। বাবা তাঁর কাজের মাধ্যমে মানুষের মাঝে বেচে থাকবেন, তাঁর আত্বা শান্তিতে থাক, মৃত্যু দিবসের আগে এই কামনা করি।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ