আমি সবসময় খুঁজি আমার দেখা প্রথম রাজনীতির নায়ককে

প্রকাশিত: ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২১

আমি সবসময় খুঁজি আমার দেখা প্রথম রাজনীতির নায়ককে

শাহরিয়ার বিপ্লব : কালনী নদীর বুকে স্কুল পালানো বালকের দল হয়তো এখনো অবাধ্য সাঁতারে মগ্ন হয়, কালো জলের উজানে বেয়ে যাওয়া কোনও এক জীবন মাঝির বৈঠার টানে কেঁপে উঠে নদীর তীর। উজান ধলের অন্ধকার রাতের পথ হারানো কোনও এক বাউলের ভেসে আসা অস্পষ্ট সুরের সাথে, দূর দিগন্তে আকাশের পানে তাকিয়ে থাকা উঁচু তাল গাছ নীরব স্মৃতির স্মারক হয়ে দখিনা বাতাসে হয়তো কাউকে খোঁজে বেড়ায় ।
কালিয়া গোটা হাওরের আফালের ঢেউয়ের সাথে সমান্তরালে বেড়ে উঠা কেউরালি আর ঝারমুনি ফুলেরা এখনো কারো আলিঙ্গনের আশায় হাত বাড়িয়ে থাকে।
পোতাবাড়ির পাশে কাচারি ঘরের বারান্দায় রাত কাটানো নরেন কাকার কানে এখনো ভেসে আসে দুখু সেনের দরাজ গলার ডাক।
হয়তো এখনো জাতীয় সংসদের নবীন সদস্যরা খোঁজে বেড়ায় একজন অভিজ্ঞ শিক্ষগুরুকে।
আমি সবসময় খুঁজি আমার দেখা প্রথম রাজনীতির নায়ককে।কি লম্বা বাবরী চুল।
পাঞ্জাবী পড়া।
হাতের নীচে শালের ভাঁজ। বুকের বাম অংশে ফুলের কারুকাজ। সিনেমার নায়কের মতো হেঁটে আসা। সময়টা ১৯৭৯ সাল।
শ্যামারচর বাজারে আব্বার নির্বাচনী মিটিং।
৭ মার্চের ভাষনটি আব্বা আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন ছোটবেলাতেই। তাই আব্বার যতো মিটিং এ যেতাম সবাই আমাকে মাইক ধরিয়ে দিতো ভাষনটি শুনার জন্যে।
সেই দিন বাজারে সুরঞ্জিত সেন কাকা আগেই এসেছিলেন। হয়তো দূরে বসে শুনছিলেন। হঠাৎ দেখি উপস্থিত লোকজন একজন উঁচু মানুষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর তিনি আমাদের মঞ্চের দিকেই আসছেন। এসেই আমাকে আদর করে বললেন, তোমাকে আশীর্বাদ করতে এলাম।
উপস্থিত সবাই তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছেন। আব্বা বললেন, সালাম করো। আমি পায়ে ধরে সালাম করলাম। একসময় তিনি আব্বাকে বললেন, আমি থাকলে তোমার মিটিং হবে না। তুমি মিটিং করো। আমি চলে যাই। কি সৌহার্দ্য। কি উদারতা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মঞ্চে চলে এসেছেন। কি মনোবল আর রাজনৈতিক শিষ্ঠাচার!
৯১ সালের মাঝামাঝি। সংসদের লিফটে উঠছি। লিফটের ভিতরে জায়গা হচ্ছে না। আমি ছোট, আর দর্শনার্থী। বাকিরা সবাই এমপি এবং সংসদের কর্মকর্তা। আমি নেমে যাচ্ছিলাম। তিনি তখন একজন কর্মকর্তাকে বললেন, ও আমার সাথে যাবে। আপনারা একজন পরে আসুন। কর্মকর্তা নামলেন। সংগী কর্মকর্তার মনে হয় একটু মন খারাপ হলো। তিনিও নামতে চাইলেন। বললেন, স্যার আপনারা যান। আমরা বরং পরেই আসি।
সুরঞ্জিত কাকা তখন কর্মকর্তাকে হেসে বললেন, আরে আপনারা সব নেমে গেলে আমরা স্মার্টনেস শিখমু কই থাইক্ক্যা? এই দেখুন, আপনি কালা রং এর জুতা আর চকোলেট কালারের বেল্ট পড়ছেন। কি সুন্দর লাগতাছে।
কর্মকর্তা তখন বললেন, সরি স্যার তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছি। তাই একটু ভুল হয়ে গেছে।
সুরঞ্জিত কাকা, হেসে বললেন, রক্ষা হইলো। আপনি যে বুঝতে পারছেন।
লিফট থেকে নেমে, আমাদের অন্য একজন এমপি সাহেব বললেন, দাদা, দুই রঙের জুতা ও বেল্ট অইলে সমস্যা কি?
কাকা বললেন, তুমি তো আধা সরকারি আধা বিরোধী। তোমার লাইগ্যা সমস্যা নাই। কিন্ত যারা স্মার্ট অফিসার তারা জুতার কালারের সাথে মিলাইয়াই বেল্ট পরবে। এটাই নর্মস অব ফ্যশান।
রাজনীতির এই ফ্যাশানবল স্মার্ট মানুষটিকে হয়তো কালনী নদীর জলের ঢেউ এখনো খোঁজে ফিরে। খোঁজবে অনন্ত কাল। যতদিল কালনী নদীতে জল থাকে।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ