আসুন সিলেটে একটি করোনা হাসপাতাল বানাই

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১০, ২০২০

আসুন সিলেটে একটি করোনা হাসপাতাল বানাই

তাজউদ্দিন তাজ :: করোনা যখন সিলেটে হানা দেয় অর্থাৎ মার্চ মাসের শুরুর দিকে আমি একটি কলাম লিখেছিলাম। ঐ কলামে আমি সিলেট নগরীর একটি বেসরকারী হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার আবেদন জানিয়েছিলাম।

এ লেখার প্রতিক্রিয়া আমাকে ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তারা আমার দাবীকে ‘হাস্যকর’ ও পাবগলের প্রলাপ বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, সরকার যেখানে করোনা চিকিৎসায় স্বয়ংসম্পূর্ন দাবী করছে, সেখানে বেসরকারী উদ্যোগে করোনা চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নেই।

আবার দূরদর্শী অনেকে আমার এই প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করেছিলেন। সরকারের সীমিত সাধ্য ও চরম অব্যবস্থাপনার আলোকে সিলেটে করোনা রোগীদের চিকিৎসার বিকল্প ব্যবস্থার স্বার্থে সিলেটের সচেতন মহলের বড় অংশ আমার এই দাবীকে সমর্থন করেছিলেন।

আজ খবর বেরিয়েছে, সিলেটের একমাত্র সরকারী করোনা চিকিৎসা কেন্দ্র শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে আর কোন সীট খালি নেই। ৬৫ টা শয্যার এই ইউনিটটি এখন রোগীতে পরিপূর্ণ। হাসপাতালের বারান্দায় এখন রোগী। কিন্তু, সীট খালি নাই। তাই ভর্তির সুযোগ নেই।

নগরীর দুটি বেসরকারী হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করা হবে- এমন ঘোষনা ইতোমধ্যে ৩ দফা দিয়েছেন বেসরকারী হাসপাতাল মালিক সমিতি। কিন্তু, বাস্তবে অবস্থা ভিন্ন। বন্দরবাজারের একজন ব্যবসায়ী যখন গুরুতর শ্বাস কস্ট নিয়ে একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলেন- বলা হলো সীট খালি নেই- ভর্তি করা যাবেনা। অবশেষে ৫ হাসপাতাল ঘুরে এম্বুলেন্সেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ঐ তরুন ব্যবসায়ী। সুতরাং, বেসরকারী হাসপাতালগুলোর এসব ঘোষণার উপর তাই আস্থা রাখার অবকাশ নেই। বেসরকারী হাসপাতালগুলোর এ ভূমিকার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কফিন মিছিল হয়েছে নগরীতে।

সিলেটে যে ভয়াবহ পরিস্তিতির সৃষ্টি হতে পারে- সে আশঙ্কা অনেকেই মার্চ মাসের শুরুতেই করেছিলেন। করোনা যে একটি ভয়াবহ রোগ- একটু যারা জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমের দিকে খেয়াল রাখেন- তারা বুঝতে পেরেছিলেন। তারাও একটি বিকল্প করোনা হাসপাতাল স্থাপনের দাবী আসছেন গত ৪ মাস ধরে।কিন্তু, হা হতষ্মি।

আমাদের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আছেন। সুশিক্ষিত চমৎকার মানুষ। কথাও বলেন চমৎকার। বেসরকারী হাসপাতালগুলোর ভূমিকা নিয়ে গণমাধ্যমে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েই তিনি তার দায়টা সেরেছেন। কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই- মন্ত্রী মহোদয় একটি জানেন না হয়তো।

সিলেটের করোনা চিকিৎসার প্রকৃত চিত্র তা অজানা। একটি লাইভ সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো- সিলেট শামসুদ্দিন হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই নেই, ভেন্টিলেটর মেশিন কিভাবে চলবে? তিনি বললেন, এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন। আমি জানি না। আরে বাবা, আপনি না জানলে কে জানবে? আমার মত অগা-মগা যতই জানিনা কেন- কোন লাভ নাই। আপনি পদে আছেন, তাই আপনাকে জানতে হবে। কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে সিলেটবাসীর নিরাপত্তা ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করার ম্যান্ডেট আপনি নিয়েছেন। আপনার মত মন্ত্রী এমপিরা বার বার নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় আসছেন, জনগণকে আর কিছু না হোক সাহস যোগাচ্ছেন। কই আপনি তো একবারও সিলেট আসেন নি?

যাই হোক, এ প্রসঙ্গে বেশী বলবো বা বলা যাবেনা। কারণ, আমার ঘাড়ে মাথা একটাই।
যে প্রসঙ্গে বলছিলাম- সিলেটে কেন একটি বিকল্প করোনা হাসপাতাল জরুরী?

শহীদ সামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে সীটের সংখ্যা ৩০টিরও কম। সরকারী এই হাসপাতালে কি চিকিৎসা হচ্ছে- তা আমাদের জানতে বাকি নেই। কাল আমি অসুস্থ হলেও সেখানেই যেতে হবে। সীট না পেয়ে বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে এম্বুলেন্সেই মারা যাব। এটাই বাস্তবতা।

অথচ, বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনী অর্থ খরচ করে চিকিৎসা নেয়ার সামর্থ্য সিলেটে অনেকেরই আছে। কিন্তু, সেই সুযোগ নেই কোন বেসরকারী হাসপাতালে। এটি কেন হবে? সরকারের সামর্থ্য সীমিত। সবার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। কিন্তু, বিত্তবানরা সরকারের এই সীমিত সামর্থ্যে ভাগ বসাবেন?

মনে করুন, সিলেটের কোন বিত্তবান অসুস্থ হলেন। মন্ত্রীর নির্দেশে তাকে একটি বেডের ব্যবস্থা করা হলো। অথচ, ব্যবস্থা থাকলে ঐ বিত্তবান বেসরকারী হাসপাতালেই যেতেন। টাকা খরচ কওে চিকিৎসা নিতেন। সরকারের উপর চাপ কমতো। ফলে, আমার মত লাল্লু-পাঞ্জু, যার বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার মত টাকা নেই, সে শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পেল না। এটি কেন হবে?

দেশের স্বাস্থ্যখাত যে কতটা দেউলিয়া তা আজ এসেছে খোদ বিএমও মহাসচিবের জবানিতে। করোনা চিকিৎসায় সরকারের ব্যর্থতার নিদারুন এক চিত্র উপস্থাপন করে দিয়েছেন, সিলেটের কৃতিসন্তান, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ডাঃ এহতেশামুল হক চৌধুরী। এরপর আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে?
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী হঠাৎ হঠাৎ উদয় হন। গত কয়েক দিন স্ত্রীর অসুস্থতার কারণেই হয়তো মাঠে ছিলেন না।

মঙ্গলবার আবার মাঠে নামে। হাসান মার্কেট বন্ধের নির্দেশ দিয়ে আসেন। রাস্তা থেকে হকারদের উচ্ছেদ করেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ দেন। কিন্তু, তার মত ঠুটো জগন্নাথের কথা কে শুনে?
একটি অনলাইনে খবর দেখলাম- সিলেটে ৫০০ শয্যার একটি করোনা হাসপাতাল স্থাপনের জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু, আমাদের সবারই জানা আছে, তার এই দাবী বন্দরবাজার ঘুরে জিন্দাবাজরে গিয়ে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে যাবে। এই দাবী সরকারের আরশে মুয়াল্লায় পৌছাবে না কোন দিন।

আর তাই আসুন- হাসপাতাল চাই, ভেন্টিরেটর চাই, অক্সিজেন চাই- এই চাই চাই দাবী প্রত্যাহার করি। তার চেয়ে মেয়র মহোদয়সহ সিলেটের সুশীল সমাজ এই দাবী তুলুন- আসুন একটি হাসপাতাল বানাই।
ইতোমধ্যে সিলেটের এক আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী তার বিশাল হোটেলটি করোনা হাসপাতালের জন্য সাময়িকভাবে দিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

মেয়রসহ সিলেটের মানুষ এই হোটেল ঘিরে কিছু স্বপ্ন আঁকতে পারেন। উদ্যোগ নেয়া হলে- দুয়েক সপ্তাহে এই আবাসিক হোটেলটিকে হাসপাতালে রূপান্তর কঠিন কিছু নয়। ঢাকার এক বিশিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তার সাথে গতকাল কথা হলো- বললেন সিলেটে বেসরকারী উদ্যোগে একটি করোনা হাসপাতাল চালু করা।

লেখক : সাংবাদিক,আইনজীবি

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ