আয়কর আইনের শতবর্ষ

প্রকাশিত: ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০২২

আয়কর আইনের শতবর্ষ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ :: ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল বাজেট বক্তৃতায় ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী (ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের অর্থবিষয়ক সদস্য) জেমস উইলসন (১৮০৫-১৮৬০) ভারতবর্ষে আধুনিক বাজেট ও আয়কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। সেই থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে জারিকৃত আয়কর সংক্রান্ত বিধি- বিধান সংকলন-সম্পাদনা-সংযোজন-বিয়োজন করে ‘ভারতীয় আয়কর আইন-১৯২২’ জারি করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এখনো সেই আয়কর আইন নামে-বেনামে বহাল আছে। এবার ২০২২ সালে আইনটির প্রবর্তন শতবর্ষ, সচরাচর জন্মশতবর্ষ যেভাবে পালিত হয়, আইনটির স্মরণ তেমনভাবে না হলেও অস্থিমজ্জাসহ এ দেশে তার উপস্থিতি বিদ্যমান। ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৬১ সালে ১৯২২ সালের আয়কর আইনের খোলনলচে পাল্টিয়ে তাদের সময় ও সমাজের জন্য প্রযোজ্য করে নতুন আইন তৈরি করে নিয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে অর্ডিন্যান্স আকারে আয়কর আইনের যে রূপরেখা দাঁড় করায় তা মূলত ওই আইনেরই প্রতিচ্ছবি। ফলে সেই থেকেই আইনটির আধুনিক সংস্করণ আইন পরিষদ থেকে পাস করার স্বপ্ন দর্শন ও স্বপ্ন পূরণের কোশেস শুরু। এখনো সে প্রয়াস মাঠপর্যায়ে। দাদা আইনের জন্মশতবর্ষ স্মরণকালে আইনটির কাছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সালতামামি যেমন চলছে তেমনি নতুন প্রজন্মের আইনের অভিষেকের আকাক্সক্ষাও প্রবল হচ্ছে। নয়া আইনটির মুসাবিদা এখনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পর্যায়ে। এরপর তাকে মন্ত্রিপরিষদ ও আইন পরিষদের পুলসিরাত পার হতে হবে। তারপর তার আকিকা। অপেক্ষার প্রহর গুনছে সবাই।

শতবর্ষী আয়কর আইনের প্রয়োগ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির পর্যালোচনায় যে বিষয়টি প্রথমে উঠে আসে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি। চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, আইনের প্রয়োগ তেমনি আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। আইনের ভাষা ও মেজাজ এবং প্রক্ষেপণ ও দর্শনে এর উদ্দেশ্য বিধেয় বিধৃত হয়ে থাকে। আইনপ্রণেতার মনোভাব, দূরদৃষ্টি, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, স্বভাব চরিত্র এবং আশা-প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে আইনের ভাষায়। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সঙ্গে, যাদের জন্য আইনটি তৈরি করা হয়, অর্থাৎ যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে। এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে তাদের সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে। আইন পরিষদ যে আইন তৈরি করে তার প্রয়োগ হয় যারা আইন তৈরির ক্ষমতা দিয়েছে তাদের ওপর। আর এ আইন প্রয়োগের দায়িত্বও আইনপ্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের। এখন পরিবেশ পরিস্থিতি যদি এমন হয় বা আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর বর্তাবে না এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ধরে নেয় যে, এ আইন অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, প্রয়োগের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রেও তারা যেন হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষ আইনপ্রণেতা ও প্রয়োগকারীর। এ প্রতিপক্ষতার পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধাত্মক। এ প্রেক্ষাপটে আইন অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দিনে দিনে গত ১০০ বছরে শাসকের ও শাসিতের মধ্যকার হরিজেন্টাল ও ভার্টিক্যাল সম্পর্কের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আয়কর সংক্রান্ত ধ্যান-ধারণা মতি-গতি স্বভাব চরিত্র সেভাবে পরিবর্তিত হতে সময় এখনো যেন বাকি। আয়কর ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক-পরিপূরক দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোয় সংগত কারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, পাকিস্তান আমলেও সেই একই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকা বা অনুসরণ ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। স্মর্তব্য, আজকের বাংলাদেশ তখন তদানীন্তন পাকিস্তানের উপনিবেশসম একটি প্রদেশ হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ তথা আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল। আর আয়কর রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।
ফলে দেখা যায় বাংলাদেশের বিদ্যমান আয়কর আইনটি জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রায়োগিক দিক থেকে নিবর্তন ও প্রতিরোধাত্মক। এ দেশে ভূমিকর বা রাজস্ব আদায়ের প্রথা প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে। রাষ্ট্র্রীয় নিরাপত্তা প্রদান, বিভিন্ন সেবার বিনিময়, কিংবা উৎপাদন বা সম্পদ ব্যবহার বাবদ নানান নামে নানান উপায়ে রাজস্ব বা টোল আদায়ের প্রথা সেই আদিযুগ থেকে চলে এলেও আধুনিক আয়কর বলতে যে বিশেষ কর রাজস্বের সঙ্গে সবাই পরিচিত, তার প্রবর্তন ও প্রয়োগ হয়েছিল সাত সাগর তেরো নদীর পার থেকে আসা বিদেশি বেনিয়ার দ্বারা। তাদের তৎকালীন সমাজে শিল্প বিপ্লবের পর পুঁজির প্রসার ঘটে এবং সেখানে সম্পদের ওপর, সম্পদ সৃষ্টি ও বিনিময় প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আয় অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ওই অতিরিক্ত আয়ের ওপর একটা হিস্যা দাবি করে বসে, যুক্তি এই, তুমি রাষ্ট্রের তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে আয় উপার্জন করছ, রাষ্ট্রের সেবা ও সুবিধা ভোগ করে লাভবান হচ্ছ, সুতরাং এসব অবকাঠামো নির্মাণ, এসব সুযোগ-সুবিধার সমাহার বাবদ রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তোমার অংশগ্রহণ চাই। ‘নেবে আর দেবে, দেবে আর নেবে এভাবে মিলাবে নিকাশ’, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটানোই আয়কর ব্যবস্থাপনার প্রধান কথা।

বলাবাহুল্য, ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই করযোগ্য আয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধিবিধানের ভাষায় এক ধরনের কুটিল মনোভাবের প্রকাশ পেয়ে তা জটিল, দ্ব্যর্থ ও কূটার্থবোধক হয়ে ওঠে। এ দেশে প্রবর্তিত আয়কর সংক্রান্ত সার্কুলারসমূহে জটিলতা যুগলবন্দি হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সরকারের তরফে করদাতাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচনায় না এলেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদার, পাইক-পেয়াদাসুলভ যুদ্ধংদেহি মনোভাব প্রকাশ পায়। উদ্দেশ্য থেকে যায় ‘তোমার আয় হোক আর না হোক অর্থাৎ বাঁচো-মরো রাজস্ব আমার চাই’। এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। অন্তরালে ব্রিটিশ প্রশাসনে বহুল কথিত একটা সাধারণ নির্দেশনা ছিল যেন এরকম, ‘চোর তো চুরি করিবেই কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকিতে হইবে’। করদাতাদের এরূপ বিরূপ ধারণায় বিবেচনা এবং তাদের ধরার ইন্ধন কর আইনের ভাষ্যে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরূপ পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যম রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃৃতির সূত্রপাত ঘটে। এরকমই পরিবেশে করদাতাদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে কর ফাঁকি কার্যক্রমে করদাতা আর আদায়কারীর মধ্যবর্তী সাহায্যকারীও যেন সহায়ক ভূমিকায় চলে আসে। এ জটিল, অনভিপ্রেত ব্যবস্থাদি আয়কর সার্কুলারের ভাষায় প্রতিফলিত হতে থাকে।

বাংলাদেশে ১৯৮৪ সালে প্রবর্তিত বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় প্রয়োগ-যোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে তা ধারণ করা ছাড়া ১৯২২-এর মূল আইনের ভাব ভাষা দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার দৃশ্যগোচর হয় না। বরং প্রতি বছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচারে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলির ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে অনেক ক্ষেত্রেই করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃৃতিও সুবিধাসংক্রান্ত মৌল দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত, বিকৃত ও বিস্মৃত। পক্ষান্তরে, যুগধর্মের সঙ্গে সংগতি রেখে কর নির্ধারণ ও আদায়সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ সরলীকরণ তথা করদাতা বান্ধবকরণের পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সমকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে আয়কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ সংবলিত সংশোধন, সংযোজন-বিয়োজন প্রয়াস বারবার বিলম্বিতই হয়েছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে অধুনা মনস্ক হতে চাইলেও সে দেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাসের, সংশয় সন্দেহের, জটিলতার আবর্তে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের নামে বরং আইনের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ার ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির পথ পরিক্রমায়। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহিতবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সেই আইন প্রয়োগে অভ্যস্ত আয়কর বিভাগ এবং সেই আইনের আওতায় করদাতাকে সহায়তাদানকারী সমাজও তাদের মেধা ও বিজ্ঞ কৌশলেও সময়ের দাবির প্রেক্ষাপটে আন্তরিক হয়েও যথা সংস্কারে সফল অবস্থায় উত্তরণে গলদঘর্ম হন। এ কথা অনস্বীকার্য থেকে যাবে যে, এ আয়কর আইনের ভাষা ও প্রয়োগ হবে সহজবোধ্য, জটিলতা পরিহারী এবং এর প্রয়োগ পদ্ধতি প্রক্রিয়া হবে স্বাচ্ছন্দ্যে সর্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত আয়করদাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে আয়কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর আদায় নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিক মাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এরূপ পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার স্পর্শকাতরতার অবসান ঘটবে। তবে এসব কিছুই নির্ভর করবে আয়কর আইনের ভাষা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে কার্যকর ও কল্যাণপ্রদ পরিবর্তন আনয়নের ওপর। আর সে প্রত্যাশা পূরণ প্রয়াসে আইন পরিষদ, নির্বাহী বিভাগ এবং করদাতা নির্বিশেষে সবার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক হবে।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান।

সূত্র : বিডি প্রতিদিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728     
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ