ইয়াহিয়ার ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা সত্যে পরিণত করল

প্রকাশিত: ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২১

ইয়াহিয়ার ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা সত্যে পরিণত করল

শেখ শহীদুল ইসলাম

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা দেশ যখন ঐক্যবদ্ধ, ঠিক তখন পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। পার্লামেন্ট বসবে। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ১৯৭১ এর ৩ মার্চ সংসদ অধিবেশন বসার কথা। ১ মার্চ হঠাৎ করেই অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করলেন ইয়াহিয়া খান। তৎক্ষণাৎ এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। মুহূর্তে সারা দেশ একটা প্রতিবাদমুখর অবস্থায় চলে গেল। সেদিন আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিং ছিল হোটেল পূর্বাণীতে। আমি তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। ডাকসু ভিপির রুমে আমরা যখন বসা, এমন সময় বেলা ১১টার দিকে এলো ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা। পার্লামেন্টের অধিবেশন মুলতবি করলেন তিনি। প্রতিবাদে আমরা মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য ছিল বঙ্গবন্ধু যেখানে সভা করছেন, সেই পূর্বাণী হোটেল। বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগের একটার পর একটা মিছিল আসা শুরু করল। সবার গন্তব্য একই দিকে। ঢাকা স্টেডিয়ামে সেদিন ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। দর্শকরা রাস্তায়

বেরিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ লোকে পুরো পল্টন ময়দান ভরে গেল। বঙ্গবন্ধু তখন পূর্বাণীতে সভা করছিলেন। সে সভায় সবাই বঙ্গবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছেন। পাকিস্তানিরা আমাদের ক্ষমতা দেবে কিনা, এ নিয়ে একটা শঙ্কা আগে থেকেই ছিল। ’৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক দিতে এসে দেওয়া তাঁর ভাষণে সেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। ষড়যন্ত্রের আভাস দিয়ে তিনি জনগণকে বলেছিলেন, ‘আপনারা ভোট দিয়েছেন, আপনাদের ভোটের মর্যাদা আপনাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। আমি ইতিমধ্যেই পার্লামেন্টের সদস্যদের নিয়ে শপথ গ্রহণ করেছি। আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকব। আপনাদের কাছে যে ওয়াদা- ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনা, সেটা থেকে আমরা বিচ্যুত হব না। কিন্তু আপনারা সতর্ক থাকবেন, ষড়যন্ত্র চলছে।’ আমরা দেখলাম, পয়লা মার্চ পার্লামেন্ট মুলতবি করে ইয়াহিয়ার ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কাকেই সত্যে পরিণত করল। সমগ্র জাতি সেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ অধিবেশন মুলতবি করার পেছনে ভুট্টোরও ষড়যন্ত্র ছিল। তার দল ‘পিপলস পার্টি’ পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু পার্লামেন্ট অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের ছোট ছোট দলগুলো মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। অনেকে ঢাকা আসাও শুরু করে দিয়েছিলেন। এ সময় ভুট্টো ওখান থেকে একটা বিবৃতি দিলেন- ‘সংসদে কেউ যেতে পারবে না, সংসদে কেউ যদি যায় তাহলে এটা একটা কসাইখানা হবে। যারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সংসদে যাবে তাদেরকে শেষ করে দেওয়া হবে।’ এ রকম হুমকি দেওয়াটা ছিল সামরিক আইনের লঙ্ঘন। অথচ আমরা দেখলাম, যিনি এমন থ্রেট দিলেন, সেই ভুট্টোর বিরুদ্ধে সামরিক আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। উল্টো ইয়াহিয়া খান পার্লামেন্ট মুলতবি ঘোষণা করলেন। আমরা পূর্বাণীতে গিয়ে দেখি জায়গায় কুলোচ্ছে না। জনগণকে নিয়ে পল্টন ময়দানে চলে এলাম। সেখানে দেখলাম মানুষে পরিপূর্ণ। ওখানেই তৎক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সিদ্ধান্ত পেলাম। আমরা পয়লা মার্চ থেকে হরতাল আহ্বান করে দিলাম। এদিকে পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, ইয়াহিয়ার ঘোষণা আমরা মানি না। আমাদের অধিকার বানচাল করার জন্যই পার্লামেন্ট মুলতবি করা হয়েছে। ওইদিন থেকেই ছাত্র-জনতা-শ্রমিক স্লোগান পাল্টে দিল। আগে স্লোগান ছিল- ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন বা সংবিধান রচনা। ওইদিন থেকে স্লোগান এলো ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ পল্টন ময়দানে স্বতঃস্ফূর্ত জনসভায় আমরা ১, ২ ও ৩ মার্চ হরতাল দিলাম। ৩ মার্চ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা বললাম। ৩ তারিখে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও ডাকসু মিলিয়ে এক বিরাট সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হয়েছিলেন। ওই সভাতেই প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা দিলাম। ইশতেহারটা লেখা ছিল আমার। পাঠ করেছিলেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। ওইদিন বঙ্গবন্ধুর আসার কথা নয়। হঠাৎ করেই তিনি এলেন। ৩ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত হরতালের ঘোষণা দিলেন। ওই ঘোষণার পর সারা বাংলাদেশ হরতালে অচল হয়ে গেল। সেদিনই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চ তিনি পরবর্তী কর্মসূচি দেবেন।
লেখক : মহাসচিব, জাতীয় পার্টি (জেপি)। অনুলেখক : শামীম আহমেদ।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

আমাদের ফেইসবুক পেইজ