একজন পার্থ সারথি এবং . . . . . . .

প্রকাশিত: ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০১৯

একজন পার্থ সারথি এবং . . . . . . .

দেবব্রত রায় দিপন : সুরমার বুক দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় শুরু হল যাত্রা দু’জনের। সময়টা বর্ষাকাল। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। যেনো একটি দ্বীপের দিকে আমরা যাত্রা করছি। নৌকার ভেতর থেকে এবার উপরে উঠে গেলেন আমার সাথে থাকা সাংবাদিক। আমিও বাধ্য হয়েই উঠে গেলাম উপরে। ছাদের উপরে বসে বিশাল সুরমা নদীটি দেখতে তখন বেশ লাগছিল তখন। দূরে স্থিত প্রাজ্ঞ সন্নাসীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বৃক্ষগুলো যেনো হাত নেড়ে নেড়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। সাথে থাকা ক্যামেরা নিয়ে তিনি একের পর এক ফটো তুলতে লাগলেন। আমি সিলেট থেকে যাবার সময় ওই দিন সিলেটের ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কলাম পড়ছিলাম। কলামের লেখক আমার সাথে থাকা ওই সাংবাদিক। ফটো তোলা শেষ হয়ে গেলে তিনি নদীপথে ফেলে আসা গ্রামগুলো সম্পর্কে একের পর এক জানতে চাইলেন। যতোটুকু আমি জানি তার সবটুকুই বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু না ! উনার প্রশ্ন শেষ হচ্ছেনা কিছুতেই। একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি বেশ ক্লান্ত। এবার সুর পাল্টালেন তিনি । আমার কাছে বসে বললেন, আপনার এই এলাকা ভ্রমণ আমার জন্য এক পরম সৌভাগ্যের। প্রকৃতির এতো নিবিড়তা এমনটি আর সচরাচর আর কোথাও চোখে পড়েনি। আপনি বরং একটি কাজ করতে পারেন। আমাকে বলতেই জিজ্ঞাসা করলাম-কি করতে হবে ? তিনি বললেন- আপনি প্রতিদিন একটি বিষয়ের উপর একটি ফিচার লিখতে পারেন। আমি বললাম-আমি তো এসবের কিছুই জানিনা। কিভাবে লিখবো ? তিনি বললেন, আপনি যা বুঝেন-সেভাবেই লিখে আমাকে দেবেন। আমি পুরো ফিচার তৈরি করে দেবো। কথা বলতে বলতে নৌকা চলে আসলো আমাদের বাড়ির ঘাটে। আমার সেকি আনন্দ ! সাথে করে নিয়ে এসেছি একজন সাংবাদিক। বাবাও পরিচয় পর্ব শেষ করে অতিথির আপ্যায়নে ব্যস্থ। আমি সেই ফাঁকে বাড়ির পিছন দিকটা ঘুরে এসেই দেখি গল্প প্রায় শেষ। এখন যে কাজের জন্য আমাদের বাড়ি আসা, সেই কাজের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে দু’জনকে। এতোক্ষণ যে সাংবাদিকের কথা বলছিলাম তিনি পার্থ সারথি দাস। বর্তমানে কালের কণ্ঠ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার। তারিখটা খুব সম্ভবত ৯২/৯৩ সালের। তখন বর্ষা মাস। আমরা দু’ভাই মিলে নগরীর লোহার পাড়া আবাসিক এলাকায় থাকলাম। বড় ভাই দীনবন্ধু রায় দিপক তখন সিলেট মদন মোহন কলেজ থেকে বাণিজ্যে ¯œাতক ডিগ্রি শেষ করেছেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। বাসায় তখন প্রায়ই আসতেন বিখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী প্রয়াত ভবতোষ চৌধুরী, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির মাহবুব মোর্শেদ, সাংবাদিক সুনির্মল সেন, প্রবীণ রাজনীতিবিদ সৈয়দ আব্দুল হান্নানসহ আরো অনেকে। একদিন ভবতোষ চৌধুরী সাথে নিয়ে আসলেন পার্থ সারথী দাসকে। ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের পর আমার সাথেও পরিচিত হলেন তিনি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে তখন একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার বিবরণ জানাতে ভবতোষ চৌধুরী সাথে করে নিয়ে এসেছেন পার্থ সারথীকে। আমাদের বড় কাকা আমবাড়ি বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পিযুষ কান্তি রায়ের জায়গা জোড়পূর্বক দখল করে নিতে আসে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র। এদের বাঁধা দিতে গিয়ে প্রহৃত হন আমার বড় কাকীমা নীলিমা চৌধুরী। খবরটি যখন আমার বড় ভাইয়ের কাছে এসে পৌছে, তখন কিছুতেই তিনি ছাড় দিতে রাজি নন। বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে কথা বলার পর সবার পরামর্শক্রমে ঘটনাস্থলে একজন সাংবাদিক পাঠানোর বিষয়টি ঠিক করা হলো। কথা অনুযায়ী আমার বড় ভাই পরদিন রোববার পার্থ সারথীকে সাথে নিয়ে আমাদের বাড়ি যাবার নির্দেশ দিলেন। হাতে ভাড়া বাবদ ধরিয়ে দিলেন নগদ ১ হাজার টাকা। সেই থেকে পার্থ সারথী নামটি আমার সাথে মিশে গেছে বিভিন্নভাবে। বলা চলে সিলেট থেকে যাবার পথে পথে সাংবাদিকতা বিষয়ক খুঁটিনাটি অনেক উপাদানও পেয়ে যাই পার্থ দাদার কাছ থেকে। এরপর থেকে উদীচীর প্রোগ্রাম, সিলেটের প্রগতিশীল সকল আন্দোলনে খুঁজে পাই এই লোকটিকে। দেখা হলেই নতুন আইডিয়া এবং নতুন তথ্য। লোকটির সাথে দেখা হলেই নেশা বেড়ে যায় সাংবাদিকতায়। আর অবশেষে সেই সুযোগটাও পেয়ে বসি। দৈনিক সিলেট বাণী পত্রিকায় চিঠি পত্র লেখার সুবাদে সুযোগ পেয়ে যাই সংশোধনী বিভাগে। সেই থেকে শুরু হয় আমার সংবাদপত্রে যাত্রা। বলা চলে- পার্থ সারথী দাসকে অনুসরণ করেই আমার সাংবাদিক হয়ে উঠা। সেই থেকে এই। দেখা হয় মাঝে মধ্যে। ঢাকায় থাকার সুবাধে খুব ঘণিষ্টতা না থাকলেও সিলেট আসলে দেখা হয়। অল্প-বিস্তর কথাও হয়। কিন্তু এখনও পাল্টে যাননি তিনি। সিলেটে ১ দিনের ছুটিতে আসলেও অবকাশের সুযোগ নেননি একবিন্দু। নিরন্তর সংবাদের পিছু ছোটে চলা এক দু:সাহসী সৈনিক তিনি। ১৯৯৯ সালে তিনি যুক্ত হন প্রথম আলো পত্রিকার সাথে। তখন থেকেই আমি প্রথম আলোর নিয়মিত একজন গ্রাহক। প্রথম আলোতে নিজস্ব স্টাইলে তিন্নি সংবাদ লিখতেন প্রতিদিন। শব্দ চয়নের ভিন্নতা এবং ভিন্নস্বাদে পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকপুরে প্রবেশ করতেন তিনি। ঘওে বসে কিংবা মোবাইলে কথা বলে সংবাদ তৈরীর পুরোপুরি বিপরীতে তিনি। কিছু ঘটলেই হাতে টাকা না থাকলেও স্পটে ছুটে যেতেন তিনি। সেখান থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে শব্দের ঝালাই দিতেন তিনি বেশ শক্তভাবে। অবশ্য তিনি শুধু সংবাদই লিখতেন না। সিলেটের শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম বাহক তিনি। উদীচীর সাথেও ছিলেন সম্পৃক্ত। সম-সাময়িক বিষয় নিয়ে নানা উপসম্পাদকীয় তখন সিলেটের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ হতো। মোট কথা কাজ পাগল এক সংবাদ কর্মী পার্থ সারথি দাস। সহকর্মী অনেকেই বলেছেন , ঢাকায় নিউজ পাঠানোর পর তিনি খাবার খেতেন । খুব সৎ, নীতির সাথে কখনও আপোষ করেননি। টাকার প্রতি কোন কালে তার কোন মোহ ছিল না । তিনি সংবাদ লেখার সময় কোন প্রভাবশালীর রক্ত চুক্ষুকে ভয় করতেন না । সিলেটে থাকাকালে সাংবাদিক নেতা হওয়ার চেষ্টা কখনও তার মধ্যে কাজ করেনি । এক সময় প্রয়োজনের তাগিদে তিনি ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় প্রথমে মানবজমিন , পরে সাপ্তাহিক ২০০০ , আর তারও পরে ২০০৯ সালে কালের কণ্ঠে যোগ দেন। এখনো তিনি কালের কন্ঠে কাজ করছেন। পার্থ কখনও ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি । তেলে মাখায় কখনও তেল দেননি । কখনও কোন টাকাওয়ালার পা-চাটেননি । এখন পা-চাটার প্রতিযোগিতা চলছে । আজ সিলেটে পার্থ সারথিদেও বড্ড অভাব। গত ২৮ জুন শুক্রবার বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার তিনি এসেছিলেন প্রতিবেদন লেখার কৌশল শেখাতে। ইউএসএইড, বাংলাদেশ মানবধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএস) ও উজ্জীবন-এর যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী এ কর্মশালায় সিলেটে কর্মরত ২৫ জন গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন। দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার পার্থ সারথি দাস হাতে কলমে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষন দেন । এছাড়া তিনি সুনামগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের ৫০ জন সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার প্রশিক্ষন দেন । এই সব সাংবাদিকদের মধ্য থেকে আর পার্থ সারথি দাস বেরিয়ে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি। একজন পার্থ সারথিকে অনুসরণ করেছি বলেই এখনো ছা’পোষা সাংবাদিকতায় নাম লিখিনি। কাউকে বিগত দিনেও তৈলা মর্দন করিনি, আগামীতেও করবোনা। জানি এ যাত্রা বন্ধুর নয়, তবুও মানবিক মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই আমৃত্যু। পার্থ সারথিদের জয় একদিন হবেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ