একজন শিক্ষাব্রতী, ভাষা সংগ্রামী, বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমান…

প্রকাশিত: ২:২২ পূর্বাহ্ণ, মে ৫, ২০২১

একজন শিক্ষাব্রতী, ভাষা সংগ্রামী, বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমান…

মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা ::

গতকাল ৪ মে ছিল ভাষা সংগ্রামী, বরেণ্য অর্থনীতিবিদ, লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. আখলাকুর রহমানের ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি। অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতি তাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করে। জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর তিনি লাভ করেছেন আরো একাধিক সম্মাননা।

আখলাকুর রহমান ১৯২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাবা দারাস চৌধুরী ছিলেন একজন ভূমিমালিক। পেতল, কাপড় এবং ভূমির ব্যবসা ছাড়াও গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষকতা করতেন তিনি। আর এ পাঠশালাতেই মাত্র তিন বছর বয়সে শুরু হয় শিশু আখলাকের প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর হাইস্কুলে পড়ার জন্য প্রথমে বালাগঞ্জ ও পরে হবিগঞ্জে যান। সিলেটের মদনমোহন কলেজ থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি থেকে বিএ সম্পন্ন করেন। ঢাকায় ফিরে অর্থনীতিতে এমএ-তে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এমএ শেষ করে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দু’বছরের মাথায়ই রিসার্চ এসিস্টেন্ট হিসেবে চলে যান ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারে। এরপর যোগ দেন পাকিস্তানের পেশওয়ার ইউনিভার্সিটিতে। এসময় তিনি পাকিস্তান ইকনমিক জার্নালের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ড. আখলাকুর রহমান যোগ দেন করাচিতে অবস্থিত পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্সের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হিসেবে। এখানে থাকাকালেই ১৯৬২ সালে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে করাচিতে তিনি ছিলেন পাকিস্তানের একটি সুপরিচিত ব্যাংক ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। যুদ্ধ শুরু হলে সেখানকার আটকে পড়া বাঙালীদের জন্যে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ড. আখলাক। দেশে ফিরে অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন ড. আখলাকুর রহমান। ১৯৮০ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইবার সিনেটের সর্বোচ্চ ভোট পেলেও কেবল রাজনৈতিক কারণে তাঁকে উপাচার্য করা হয়নি।

ড. আখলাকুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনও উল্লেখযোগ্য। সিলেটের মদনমোহন কলেজে পড়ার সময় থেকেই তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। পূর্ববঙ্গে সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মীদের একজন ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে সেসময় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সরকারের রোষানলেও তিনি পড়েন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ড. আখলাক। সেসময় তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন তরুণ প্রভাষক। একটি দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি গঠনে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে যেসব অভিমত তিনি রেখেছেন তা আজো প্রণিধানযোগ্য। জাসদের জন্মলগ্নে তিনি ছিলেন একজন তাত্ত্বিক নেতা। ১৯৭৫ সালে কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে তিনি জাসদের বিভিন্ন কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন জাসদের একজন উপদেষ্ঠার মতো। এ কারণে তাঁকে কারাভোগও করতে হয়।

তিনি ছিলেন একজন পন্ডিত ব্যক্তি। দুই পাকিস্তানের অর্থনীতি বা পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য বিষয়ে ষাটের দশকের মাঝামাঝি তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি ১৯৭৪ সালে ‘বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধনতন্ত্রের বিকাশ’ শীর্ষক গ্রন্থ রচনা করেন। সত্তরের দশকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ শিরোনামে সাম্রাজ্যবাদ বিষয়েও তার গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং Development and growth Economics ও বাংলাদেশ কীভাবে বৈদেশিক ঋণ থেকে বের হতে পারে, তা নিয়ে তিনি গবেষণা গ্রন্থ লেখেন। তাঁর অারেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই “মার্কসীয় অর্থনীতি”।

ড. আখলাক ছিলেন একজন নীতিবান মানুষ। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদী রাজনীতির অনুসারী হওয়ার কারণে কর্মজীবনে অনেক বড় বড় সুযোগ হাতছাড়া হলেও নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেন নি। গভীর আত্মমর্যাদাবোধের কারণে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। একজন সমাজবাদী হিসেবে নিজের আর্থিক সমৃদ্ধি সত্ত্বেও দরিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের কথা কখনো ভুলতেন না। দরিদ্রের সেবায়, অসহায়ের সমর্থনে যখন যেখানে পেরেছেন ছুটে গেছেন। জীবনের শেষের দিকে নিজের উপজেলা জগন্নাথপুরে তাঁর মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি শিক্ষা ট্রাস্ট। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত “জোবায়দা খাতুন শিক্ষা ট্রাস্ট” থেকে বৃত্তি লাভের।

আধ্যাত্মিকতার প্রতিও তার ছিল এক দুর্নিবার আকর্ষণ। আর এ আকর্ষণের কারণেই ১৯৭৪ সাল থেকে গুরুজী শহীদ আল বোখারীর সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। যোগধ্যানের অনুশীলনে একাত্ম হন। ধ্যানের শক্তিকে ব্যবহার করে বহু মানুষকে হিলিং করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে যোগ মেডিটেশন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ড. আখলাকুর রহমান। ১৯৯২ সালের ৪ মে তিনি ৬৭ বছর বয়সে মারা যান। ড. আখলাকুর রহমানের মহাপ্রয়াণ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে তৈরী করে এক গভীর শূন্যতা। পরম করুণাময় দেশপ্রমিক ও মানবদরদী এই শিক্ষাব্রতীর আত্মার অনন্ত প্রশান্তি দান করুন।

ডক্টর আখলাকুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : বাংলাদেশ টেলিভিশনের সিলেট প্রতিনিধি,
সাংবাদিক

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ