একটি ব্যাখ্যা বা নষ্ট মনের কষ্ট

প্রকাশিত: ২:০০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

একটি ব্যাখ্যা বা নষ্ট মনের কষ্ট

সামিয়া রহমান :; আপনাদের মনে আছি কি, একসময় এই বাংলাদেশের মানুষও কলের পানি খেত। কতটা আগের ঘটনা তা মনে করতে পারছি না। কিন্তু কেন যেন মনে হয় ঘটনাটি স্বপ্ন নয়, সত্যি। আবার ঠিক কতটা আগে থেকে আমরা ফুটিয়ে পানি খাওয়া বা ফিল্টার পানিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তাও মনে করতে পারছি না। সেটিও এখন মনে হয় বহু অতীতের ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার পানি উন্নয়নের তিনটি প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ উদ্বোধনের সময় ঢাকা ওয়াসাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, এ প্রতিষ্ঠানটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় পানি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার মতে, ঢাকা ওয়াসা পানির উৎপাদন ও সরবরাহে শতভাগ সক্ষমতা লাভ করেছে। এখন আর সেই হাহাকার নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিনয়ী। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান। তিনি সবাইকে উৎসাহিত করতেই পারেন। কিন্তু এ বছরেই প্রায় চার মাস পানি ছাড়া ঢাকারই একটি মোটামুটি অভিজাত এলাকাতে ছিলাম বলেই কথাটির সঙ্গে একমত হতে কোথায় যেন বাধে। বহু সাধ্য সাধনা করে, একে তাকে ধরে, বহু অর্থের বিনিময়ে আমার এলাকার বাসিন্দারা তাদের ন্যায্য পানি সম্প্রতি পাওয়া শুরু করেছেন। অবশ্যই সুপেয় পানি নয়। তার পরও পানি তো বটে। সত্যি কথা বলতে কি, যেদিন এই বাংলাদেশে বসে নিরবচ্ছিন্নভাবে সুপেয় পানি পাওয়া শুরু করব, সেদিনই সাধারণ মানুষ হিসেবে ধন্যবাদ দিতে পারব। মজার বিষয় হলো, আমার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক যখন এ বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়েছিলেন, ওয়াসার কর্মচারী জানিয়েছিলেন, আমার বিল্ডিংয়ে পানি দেওয়া যাবে না। কারণ এ বিল্ডিংয়ে সাংবাদিকের বাস। তার কাছ থেকে যেহেতু নগদ অর্থ মিলবে না তাই পানির ফোঁটাও আমাদের ভাগ্যে জুটবে না। সেদিন অফিসে কলিগদের সঙ্গে আড্ডায় বলছিলাম, ফিল্টার পানি খেতে খেতে আমরা এমনই অভ্যস্ত যে দেশের বাইরে গেলেও বোতলের পানি কিনি। ট্যাপের পানি খেতে কোথায় যেন বাধে, মনে হয় ঠিক নয়, এই পানি ঠিক নয়। অভ্যস্ত হতে পারছি না তাই। বাকস্বাধীনতাও কি অভ্যস্ত হওয়ার বিষয়? তাই কি পাঠক? হয়তো আরও ৫-১০টি বছর গেলে ভিন্নমত পোষণ করার ক্ষেত্রেও বলতে পারব, এত কথা বলা ঠিক নয়। আবরারের মৃত্যু তো তাই বলে।

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। ফুটেজে দেখা যাওয়া হত্যাকারীদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। তার পরও কতিপয় অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট বা গোড়াপন্থির কেউ কেউ আবরারের হত্যাকে জায়েজ করার স্বার্থে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবরারকে তুলাধোনা করছেন। কি, আবরার নাকি শিবির করতেন। আচ্ছা শিবির, জামায়াত, বিএনপি বা নাস্তিকতা করলেই কি তাদের হত্যা জায়েজ হয়ে যায়? তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কী প্রয়োজন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই বা কী দরকার? যে ছেলেটির বইয়ের তাকে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থাকে, তাকে কি এক নিমেষেই শিবির বানিয়ে দেওয়া যায়? নাকি তাতে হত্যার নিষ্ঠুরতা, ভয়াবহতা জায়েজ হয়ে যায়? কিছু হলেই বলা হচ্ছে, অপরাধীরা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী। তাহলে সাধারণ মানুষ হিসেবেই জানতে ইচ্ছা হয়, এই অনুপ্রবেশকারীদের প্রবেশের অধিকার দিল কে বা কারা? তাদের কেন চিহ্নিত করা হচ্ছে না? নাকি তাদের আড়াল করার জন্যই ভিকটিম হয়ে যায় শিবির? সোশ্যাল মিডিয়ায় এতটাই দাম্ভিক প্রচারণা যে বলা হচ্ছে- ধইরে ধইরে এদের খুন কর।… হায় বাংলাদেশ! এতটাই নিষ্ঠুর আমরা! এতটাই প্রতিক্রিয়াশীল যে, আজ আওয়ামী লীগের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে কপালে বিএনপি-জামায়াতের তকমা জোটে। বিএনপির অন্যায়ের সমালোচনা করলে গালি খেতে হয় সরকারের দালাল বলে। ভারতের সমালোচনা করলে শুনতে হয় পাকিস্তানের দালাল, আর পাকিস্তানের সমালোচনা করলে শুনতে হয় ভারতের চর। ইসলামের প্রশংসা করুন, আপনাকে মৌলবাদী তকমা দেবে এরা। আর হিন্দুদের পূজায় আনন্দ করুন বা শুভেচ্ছা জানান, আপনি হয়ে যাবেন নাস্তিক। আমি বা আমরা যে কী, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতাও বোধহয় আর আমাদের হাতে নেই।
যে প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য বলেন, জানাজায় তিনি যেতে পারেননি, কারণ মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ব্যস্ত ছিলেন, তাকে নাকি ওপর মহলকে কনভিন্স করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অভিভাবক যদি এমন কথা বলেন, তবে বলুন তো সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কেন স্বস্তি পাবেন? সাধারণ ছাত্রদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি আছে যে ওয়েব পেজে দেখা যাচ্ছে, সেটি কেন বন্ধ করতে যাচ্ছে বিটিআরসি, খুব জানতে ইচ্ছা করে। কেন সরকার মনে করে সব প্রতিবাদই সরকারবিরোধী প্রতিবাদ। কারোর ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও কি অন্যায়? জামায়াত-শিবিরের সুযোগ নেওয়ার কথা ভাবছেন? জামায়াতিদের হাতে সুযোগটা তুলে দিচ্ছে কে? অন্যায়গুলো করছে কে? শিবির-জামায়াত-বিএনপি একসময় ভয়াবহতা চালিয়েছিল বলে সেই একই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের দল আওয়ামী লীগের সহকর্মীদের কাছ থেকে কি আশা করা যায়? ওরা অধম বলে কি আমরা-আপনারাও অধম হবেন?

প্রধানমন্ত্রী শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। তার পরও এদের টনক নড়ে না। পুকুর খনন শিখতে বিদেশ যাওয়া, ৫ হাজার টাকা দামের বালিশ, ৮৬ হাজার টাকার পর্দা, ৫ হাজার টাকা দামের বই কেন ৮৫ হাজার টাকায় কেনা হবে? অস্বাভাবিকতা কেন এখন এতটাই স্বাভাবিক? সেদিন ফেসবুকে এক বন্ধুর স্ট্যাটাসে দেখলাম, লিখেছেন- আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইঞ্চি ইঞ্চি করে সব অর্জন করেন, আর এসব ঘটনা মাইলের পর মাইল তাকে পেছনে সরিয়ে দেয়। এই কতিপয়রা কেন এ সমাজে প্রাধান্য পায়? কে দেয়? ভিন্নমত কেন সহ্য হয় না এ দেশে? একটি পরিবারে বাবা মা স্বামী স্ত্রী সন্তানদের মধ্যেও তো ভিন্নতা থাকে, তবে একটি দেশে থাকলে সমস্যা কোথায়! শুধুই সহমতের সংস্কৃতি, তেলের সংস্কৃতি কি আদৌ কোনো ভালো কিছু বয়ে আনবে? এই তেলবাজরা কি সময় পাল্টে গেলে তাদের ভোল পাল্টাবে না তার গ্যারান্টি কোথায়?

হেলাল হাফিজ বলেছিলেন-

কষ্ট নেবে কষ্ট

একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে

কষ্ট নেবে কষ্ট ।

তার মতো করেই বলতে ইচ্ছা করছে আজÑ

নষ্ট মনের কষ্ট নয়,

ভ্রষ্ট ছেলের কষ্ট নয়,

ওরা লাল সবুজের সৃষ্ট নয়।

বাবা মায়ের হাতটি ছেড়ে,

সিঁড়ির গোড়ে পড়ে থাকা

কালো রঙের কালশিটেতে

মানুষ বধের হত্যাযজ্ঞে

অসহায় এক কষ্ট।

ভ্রষ্ট ছেলের নষ্ট হবার কষ্ট,

ভিন্নমতের ভুল ব্যাখ্যার

রুষ্ট হবার কষ্ট,

শুনবেন নষ্ট দেশের কষ্ট!

নাকি নষ্ট মনের কষ্ট!

এই ভিন্নমতের জন্য আমার গর্দান যাবে না তো!

লেখক : হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, নিউজ টোয়েন্টিফোর।

সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের ফেইসবুক পেইজ