একাত্তরের একটি স্মৃতিচারণা : ত্রিপুরার কুলাই থেকে সিলেট….

প্রকাশিত: ১২:২০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২১

একাত্তরের একটি স্মৃতিচারণা : ত্রিপুরার কুলাই থেকে সিলেট….

অজয় পাল ::

সাত সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে সহসা
জেগে উঠলাম । বাইরে থেকে শুক্লা বৌদির কন্ঠ ভেসে এলো : ” দাদা , ও দাদা , উঠুন — দরজা খুলুন ” । কোনো খারাপ খবর মনে করে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখি বৌদির মুখে একদলা হাসি ঢেউ খেলছে । শুক্লা বৌদিকে ওমন করে হাসতে কখনো দেখিনি । রহস্য জানতে চাইলে কোনো ভনিতা না করেই বললেন , আগে মিষ্টি , পরে বাকিটা । বিনা ভাড়ায় চার মাস ধরে বৌদির ঘরে আছি ,আর এ-তো সামান্য মিষ্টির বায়না । তথাস্তু বলতে একটুও বিলম্ব হলো না আমার । বৌদি এবার হাত ধরে আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন তাঁদের মূল ঘরে । বিছানায় বসে রেডিওতে আকাশবাণী শুনছিলেন শুক্লা বৌদির স্বামী মন্টুদা । আমাকে দেখামাত্র উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন , ” রেডিও শুনুন , বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে ” ।
আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম আমি । বলেন কি দাদা ? রেডিওর আওয়াজটা বাড়িয়ে দিয়ে ফের বললেন , শুনুন ।
এবার কান খাড়া করে শোনলাম , পাকবাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়েছে এবং আজই ( ১৬ ডিসেম্বর ) ঢাকায় আত্মসমর্পণ করবে । আকস্মিক এমন আনন্দের সংবাদ শুনে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না । বৌদি বললেন , বসুন , চা বানিয়ে আনি । বললাম , এখন না বৌদি । আমি আসছি । এই বলে ফিরে গেলাম নিজের ঘরে । প্রাতকর্ম সেরে অল্পক্ষণ পরেই বেরিয়ে পড়লাম । উদ্দেশ্য একটাই , রাস্তায় শরণার্থীদের প্রতিক্রিয়া দেখা । দূর-দূরান্তের শরণার্থী শিবিরগুলোতে তখন জয়বাংলা শ্লোগান চলছিলো । স্থানীয় জনগণের মধ্যেও আনন্দের উচ্ছ্বাস ছিলো লক্ষ্যনীয় ।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কুলাই বাজারে একাত্তরের ছয়টি মাস ধরে ছিলো আমার অবস্থান । শুরুতে এক নিকটাত্মীয়ের বাসায় ছিলাম । দুর্বিসহ জীবন যাপনের এক পর্যায়ে বাজারের চা- বিক্রেতা মন্টুদার বাসার একটি কক্ষে ভাড়াটে হিসেবে থাকলেও চারমাস ভাড়া দেয়া হয় নি । মন্টু দা অবশ্য ভাড়ার জন্য কখনো চাপ দেননি । আমি বাজারের ভেতরে এক নিকটাত্মীয়ের সুবাদে একটা ছাপড়া ঘরে টুকটাক ব্যবসা করতাম এবং সুযোগ হলেই বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেশে আটকে পড়া পিতা- মাতা সহ ছোট ভাইদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় কিনা জানার চেষ্টা করতাম । মাঝে মধ্যে আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জাগরণ পত্রিকায় লিখতাম ।
ফিরে আসি আগের কথায় । সেই যে ঘর থেকে বেরোলাম , আর ফিরে যাওয়া হয়নি মন্টুদার ঘরে । ঘরের বিছানা পত্র ও রাতের এঁটো বাসন কোসন পড়ে থাকলো অগোছালো । দোকানটিও পড়ে থাকলো তালাবদ্ধ । এই বেরিয়ে যাওয়াটাই যে শেষ যাওয়া , সেটাও বলা হলো না মন্টুদা কিংবা শুক্লা বৌদিকে । অকৃতজ্ঞ ও নির্লজ্জের মতো আজ বলছি , বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পঞ্চাশ বছর পরও সেই মন্টুদা ও তাঁর পরিবারের খোঁজ খবর একটি বারের জন্যও নেয়া হয়নি আমার । অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেছি । এই পরিবারটি এখন কেমন ও কিভাবে আছে , সে তথ্যটিও আমার অজানা । চার মাসের ঘর ভাড়াও অপরিশোধ্য রয়ে গেছে । এই অমার্জনীয় অপরাধটুকু ক্ষমা করে দিও মন্টুদা / শুক্লা বৌদি ।
সেদিন কুলাই বাজারের প্রধান রাস্তায় এসে দেখি ভিন্ন এক চিত্র । দন্ডায়মান একটি ট্রাকে তাড়াহুড়ো করে উঠছেন শরণার্থীরা ,আর ট্রাকের সহকারী ” খোয়াই , খোয়াই ” বলে হাকডাক করছে । সবার মুখেই তখন জয়বাংলা শ্লোগান । এরই মধ্যে লক্ষ্য করলাম ট্রাকে উঠে বসা পরিচিত এক শরণার্থী গোস্বামী বাবু আমাকে ট্রাকে উঠার জন্য ইশারা করছেন । আমি সাতপাঁচ না ভেবে উঠে পড়লাম । গোস্বামী বাবু বললেন , সীমান্ত খুলে দিয়েছে । চলুন , মা-বাবার সন্ধান করবেন না ? বললাম , আমি যে মন্টুদাকে কিছুই বলে আসিনি । জবাবে বললেন , অসুবিধা কি ,‌ প্রয়োজনে দু’একদিন পরে আবার ফিরে আসবেন । ভাবলাম , তাইতো । মা-বাবার খোঁজ খবর নিয়ে আবার ফিরে আসবো ।
অল্পক্ষণের মধ্যেই খোয়াই সীমান্তে পৌঁছে গিয়ে দেখি , সদ্য শত্রুমুক্ত বাংলাদেশ অভিমুখে শরণার্থীদের স্রোত বইছে । কোনো যানবাহন নেই । হাঁটা ছাড়া গত্যন্তর
নেই । জনস্রোতে আমরাও মিশে গেলাম । বলে নেয়া ভালো , রওয়ানা হবার আগেই সীমান্তে কুলাই বাজারের একজন ক্ষুদে ব্যবসায়ীর সাথে দেখা হয়ে গেলে তার মাধ্যমেই মন্টুদার কাছে একটি চিরকুট পাঠিয়ে আমার অবস্থান জানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি । আমি জানি না , এটা তাঁর কাছে পৌঁছেছিলো
কি না ।
পায়ে হেঁটে হবিগঞ্জে পৌঁছার পরেই নবীগঞ্জ অভিমুখী একটি ট্রাক পেয়ে যাই । সঙ্গত কারণেই আমার প্রথম গন্তব্য এই নবীগঞ্জ । একাত্তরের এপ্রিল মাসে মা-বাবাসহ ছোট ভাইদের নবীগঞ্জে রেখেই অগ্রবর্তী দল হিসেবে আমরা বড় তিন ভাই খোয়াই সীমান্ত দিয়ে ভারতে পৌঁছাই । একদিন পর তাদের সকলেরই খোয়াই এসে পৌঁছার কথা । কিন্তু নির্ধারিত দিনে আমরা খোয়াই গিয়ে দেখি , সীমান্ত জুড়ে চরম উত্তেজনা । এপারে ভারতীয় সেনাবাহিনী , আর ওপারে পাকবাহিনী অবস্থান নিয়ে আছে । সেই থেকে মা-বাবাসহ ভাইদের সাথে দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যোগাযোগ ছিলো বিচ্ছিন্ন ।
ট্রাকে চেপে নবীগঞ্জে পৌঁছেও তাদের কোনো সন্ধান পেলাম না । কেউ সঠিক কোনো তথ্যও দিতে পারলো না । আবার ফিরলাম হবিগঞ্জ । সেখান থেকে শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে লস্করপুর রেলওয়ে স্টেশন লাগোয়া আদ্যপাশা গ্রামে পৌঁছালাম । এখানে আমার মামার বাড়ি । একজন নিকটাত্মীয় জানালেন , তারা বাহুবলের নন্দনপুর গ্রামে আমাদের আদি বাড়িতে গিয়েছিলেন । সেখানে আলবদর রাজাকাররা বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় এবং আমাদের এক জ্যাঠতুতো ভাইকে হত্যা করে । পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সিলেটে চলে যান । এর বেশি আর কোনো তথ্য জানা গেলো না । এবার আমার সিলেট অভিযাত্রা । শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ফের ট্রাকে চাপলাম । সিলেটের মজুমদারী এলাকার এক তরুণের সাথে এই ট্রাকে বসেই কথাবার্তা । শেরপুর থেকে সে ট্রাকে উঠেছিলো । তরুণটি জানালো ,১১ ,১২ ও ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিমান থেকে প্রচন্ড হামলা চালায় । এতে বহু লোক হতাহত হয়েছে । খবরটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো । মা-বাবাসহ ছোট ভাইয়েরা বেঁচে আছে কিনা ,সে চিন্তায় আমাকে পেয়ে বসলো ।
সন্ধ্যার আগেই ট্রাকটি এসে দক্ষিণ সুরমা পৌঁছায় । লক্ষ্য করলাম , সুরমা নদীর দুপারে অসংখ্য মানুষের
জটলা । পাক বাহিনী কর্তৃক ডিনামাইট হামলায় বিধ্বস্ত কিনব্রিজটি ঝুলে আছে নদীর মধ্য বরাবর । নৌকায় নদী পারাপার চলছে । তোপখানা বরাবর আমিও নদী পেরোলাম । এপারের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তখন ভেসে আসছিলো “জয় বাংলা ” জয় ধ্বনি । ওদিকে আমার মোটেই ভ্রুক্ষেপ নেই । দাড়িয়াপাড়ার বাসায় পৌঁছে কি খবর শুনবো , সেই দুশ্চিন্তায় আমাকে পেয়ে বসেছিলো । রাস্তার ডানে বামে কোনো মানুষের দিকেই তাকাচ্ছিলাম না । ভয় ছিলো এই , যদি পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে যায় , আর শুনিয়ে দেয় কোনো দুঃসংবাদ ।
আমি কেবল-ই হাঁটছি । ইতোমধ্যে মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় নিম্বার্ক আশ্রমের সামনে পৌঁছে গেলাম । আশ্রমের পেছনেই পুকুর পাড়ে তখন আমাদের
বসতি । আশ্রমের সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করে এবার সোজা বাসার দিকে । পুকুরের বাঁকটা ঘুরতেই দেখি মা আমার বারান্দায় দাঁড়িয়ে । মা – কে দেখামাত্র আনন্দ আমাকে জেকে ধরে । ভো দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম । মা প্রথমে আমাকে চিনতেই পারছিলেন না । ভালো করে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখার পর সে কি কান্না আমার মায়ের । সেই দুর্লভ মুহূর্তের স্মৃতি গত ৫০বছরে বহুবার আমাকে দোলা দিয়ে গেছে । একটি বারের জন্যেও ভুলতে পারিনা । ইতোমধ্যে ভাইয়েরাও এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে । বাবা তখন বাসায় ছিলেন না । অল্পক্ষণের মধ্যেই বাবাও চলে এলেন । কি আনন্দ তখন আমার ।
আজ বলতেই হয় , একাত্তরের এই দিনটির কথা যখনই মনে পড়ে , বারবার আমার কাছে ফিরে ফিরে আসে ত্রিপুরার সেই কুলাই বাজার , সেই মন্টুদা ও শুক্লা বৌদি সহ সেখানকার অগনন প্রিয় মুখ । এই মুখগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেন টেইলর অমর শর্মা , ব্যবসায়ী ছানাদা , অতুল বাবু ও হীরালাল বাবু । সেই কষ্টের দিনগুলোতে কুলাই বাজারে অমর শর্মার দোকানে বসে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনতাম । তাঁরা বলতেন , অন্যায় করে কেউ কখনো পার পায়না । পাকিস্তানও পার পাবে না । আজ হোক , কাল হোক, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই । সেটাই সত্য হয়েছে । অমরদা , প্রণাম তোমাদের সকলকে ।

 

আমাদের ফেইসবুক পেইজ