একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ের নেপথ্যে

প্রকাশিত: ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২০, ২০২১

একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ের নেপথ্যে

লে. জেনারেল সাঈদ আতা হোসেইন (অব.) অনুবাদ : মেজর নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ (অব.) পিএইচডি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিজয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ইতিহাসে এই দিনটি আবেগময়। এই বিজয়ের নেপথ্যে যে আত্মদান ও বেদনা লুকিয়ে আছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। আমি এমন সময় এ বিষয়ে লিখছি, যখন ইতিহাসের গৌরবময় দিকগুলোই কেবল বেশি উপস্থাপিত হচ্ছে। আমার প্রত্যাশা লেখাটি দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মাঝে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ সৃষ্টি করবে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরের মার্চে দুটি বিশেষ কারণে এক সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রথমত ১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর ভোলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। এই দুর্ভোগের পর পশ্চিমা শাসকদের উদ্ধার তৎপরতা, দুর্যোগকবলিত মানুষের প্রতি তাদের বিলম্বিত দায়িত্ববোধ, অপর্যাপ্ত ত্রাণ ও অমানবিক আচরণ আগে থেকেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি আরও বাড়িয়ে তোলে। বাঙালিদের সঙ্গে উর্দুভাষী পাকিস্তানিদের এমনিতেই অনেক অমিল ছিল। বাঙালিদের সাংস্কৃতিক আবেগ ধর্মীয় আবরণে ঢেকে রাখার কৌশলকে মেনে নিতে পারেনি বাঙালি সমাজ। এরই মধ্যে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়ের ২৭ দিনের মাথায় সমগ্র পাকিস্তানে (পূর্ব ও পশ্চিম) সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় এবং সমগ্র পাকিস্তান শাসনের নৈতিক অধিকার লাভ করে। এই বিজয়কে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো কিংবা তৎকালীন সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান কিছুতেই মানতে পারেননি। মূলত একজন বাঙালি সমগ্র পাকিস্তান শাসন করবে- বিষয়টি ছিল তাদের ধারণার বাইরে। দুই পক্ষের মধ্যে ২৪ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আবেগের দ্বন্দ্ব এ দুটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেন কাচের মতো ভেঙে পড়ে এবং পশ্চিমা সামরিক শাসক ও বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদদের মাঝে এক জটিল ও অচল পরিস্থিতি তৈরি করে। পাকিস্তান সেনা কর্তৃপক্ষ এ সময় প্রকৃত সত্য অনুধাবন ও রণকৌশলগত দিক অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। বিশেষত তারা ভারতীয় নেতৃত্বের সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতাকে ছোট করে দেখে এবং নিজস্ব ক্ষমতার অহংকার ও আত্মতুষ্টিতে ডুবে থাকে।
মার্চের শেষে গণহত্যা শুরু হলে উভয়পক্ষ সম্পূর্ণ বিপরীতে বা পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যায়। পাকিস্তান এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সক্ষমতার ওপরও ভরসা রেখেছিল। কারণ এ দুটি দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে ভারতের প্রতি সোভিয়েট ইউনিয়নের দৃঢ় সমর্থন উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতকে বাড়তি সুবিধা প্রদান করে। অন্যদিকে এর ফলে সপ্তম নৌবহর ও এন্টারপ্রাইজ (নৌবহর)-সমূহ বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ হ্রাস পায়। পরবর্তীতে একইভাবে চীনের আধিপত্যও হ্রাস পায়।

তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল স্যাম মনেকশো (পরবর্তীতে ফিল্ড মার্শাল) এমন এক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে কিছু সামরিক ও রণকৌশলগত পরামর্শ দেন। তবে ভারতের জাঁদরেল কূটনৈতিক আমলা চন্দ্র শেখর দাশগুপ্ত সেনাপ্রধানের সঙ্গে এক্ষেত্রে একমত হতে পারেননি। জেনারেল মনেকশোর বিবেচনায় এপ্রিল থেকে জুলাই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার উপযুক্ত সময় নয় বিধায় ভারতের উচিত যুদ্ধ কিছুটা দেরিতে শুরু করা। এর নেপথ্যে তিনি বেশ কিছু কারণ ও যুক্তি উপস্থাপন করেন। তার মতে এ সময়ে যুদ্ধ শুরু হলে দক্ষিণদিক থেকে চীনের সেনাবাহিনী আক্রমণ করতে পারে। এতে ভারতীয় বাহিনীকে পাঞ্জাব ও রাজস্থানের পাকা ও আধাপাকা ফসলের মাঠ ধরে ট্যাংক ও অন্যান্য সামরিক বহর নিয়ে এগোতে হবে এবং যুদ্ধ করতে হবে। ফলে ফসল বিনষ্ট হবে ও খাদ্য সংকটে পড়বে ভারত। ভারতীয় বাহিনীকে পাকিস্তানিদের ওপর যে শক্তি নিয়ে আক্রমণ করা আবশ্যক, তার সমর্থনে ব্যাপক প্রশাসনিক বা লজিস্টিক সমর্থন প্রস্তুত করাও ছিল সময় সাপেক্ষ। তবে কূটনৈতিক চন্দ্র শেখর ও তার সমমনা আমলাদের দৃষ্টিতে এসব যুক্তি ছিল বাকপটু জেনারেল মনেকশোর একটি শ্রুতিমধুর উপস্থাপনা মাত্র। একমাত্র সেনাবাহিনী প্রধানের পক্ষেই এমন যুক্তি দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তারা। তবে যথাযথ প্রস্তুতির জন্য সময় নেওয়া এবং চূড়ান্ত আক্রমণে যাওয়ার জন্য দেরি করার পক্ষেই মত দেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই সিদ্ধান্ত যে কতটা দূরদর্শী ছিল এবং এ জন্য জেনারেল মনেকশো যে কতটা কৃতিত্বের দাবিদার, এ নিয়ে পরবর্তীতে কেউ আর সন্দেহ বা প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি।

পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বাহিনীর দ্রুততার সঙ্গে আক্রমণের সামরিক পরিকল্পনার বিপরীতে ইসলামাবাদ তথা পাকিস্তানের পরিকল্পার মূলে ছিল তাদের একটি বিশ্বাস; যার সারমর্ম পূর্ব পাকিস্তানের সুরক্ষা নির্ভর করে পশ্চিম পাকিস্তানের সুরক্ষার ওপর। পাকিস্তান কেন এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ ছিল, তা নিয়ে কমই আলোচনা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক ও লেখক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তার মতে যদি পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানে (পূর্ব দিকে) এত সেনা না পাঠিয়ে ভারতকে পশ্চিম পাকিস্তান সংলগ্ন রণাঙ্গনে (পশ্চিম দিকে) যুদ্ধ করতে এবং সামরিক শক্তি নিয়োগ করতে বাধ্য করা যেত, তবে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের অভিযান বন্ধ বা স্থগিত রাখা যেত। তবে যাই হোক, সবাইকে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি ও অন্যান্য আয়োজন হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি, বরং ক্রমাগতভাবে এই প্রস্তুতি চলে। তখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিলেও ইসলামাবাদের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাকে অবহেলা করা সহজ ছিল না। পূর্ব রণাঙ্গনে যুদ্ধ চলাকালেও পশ্চিম রণাঙ্গনে পাকিস্তান বাহিনী ভারতের মূল ভূখন্ডে কোনো জোরালো আক্রমণ চালানোর মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি; যা থেকে ধারণা করা যায়, পাকিস্তানিরা যুদ্ধের শুরুতেই নিজেদের পরাজিত ভাবতে শুরু করেছিল। ভারতীয় নৌবাহিনী কর্তৃক করাচি বন্দরে নৌযান বা সামুদ্রিক জাহাজ গমনে বাধা বা ব্লকেড সৃষ্টি করার ফলে আগে থেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পাকিস্তানিদের ভিতর প্রবল মানসিক চাপ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভারতীয় বিমান বাহিনীর পূর্ব রণাঙ্গনের আকাশকে নিজ দখলে রাখা এবং পশ্চিমে পাকিস্তানি বাহিনীর যে কোনো বিমান আক্রমণ প্রতিহত করার সক্ষমতা ছিল। এর ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্থলভাগে তাদের অভিযান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক সুবিধা, নমনীয়তা ও বিকল্প উদ্ভাবনের সুযোগ লাভ করে।

মূলত ভারতের রাজনৈতিক দর্শন ও লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট ও সুচিন্তিত। এই রাজনৈতিক দর্শন থেকেই উঠে আসে সামরিক উদ্দেশ্য, যা দ্রুত বিজয় লাভের অন্যতম নিয়ামক শক্তিরূপে অবদান রাখে। সর্বোচ্চ মহলের নীতিনির্ধারকদের জন্য এই রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মূলত যুদ্ধ শুরুর সময় বা যুদ্ধের ব্যাপ্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যের দূরত্ব কমাতে পারলেই কেবল একজনের বিষয়ে অন্যের অনাবশ্যক নাক গলানো বন্ধ করা সম্ভব। ভারতের পশ্চিমাংশের পাকিস্তান বাহিনীর যে কোনো বড় অভিযান নস্যাত করার জন্য ভারতীয় সেনারা ব্যাপক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং পাল্টা হুমকি প্রদান বা প্রতি-আক্রমণের প্রত্যাশিত প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ভারতের পরিকল্পনায় আরও প্রাধান্য পায় পূর্ব পাকিস্তানের ভূখন্ডে পর্যাপ্ত ভূমি দখল ও নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেখানে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর আবাসস্থল নির্মিত হবে এবং একটি অস্থায়ী সরকার দেশের অভ্যন্তরেই প্রতিষ্ঠিত ও কার্যক্ষম হবে। সুনির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি অতি দ্রুত যুদ্ধ অভিযান বা আক্রমণ পরিচালনা আবশ্যক ছিল। এক্ষেত্রে ঢাকা দখল করাই কি মূল উদ্দেশ্য ছিল নাকি সুযোগ পেলে সঠিক সময়ে ঢাকা দখলের জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছিল, এ নিয়ে প্রশ্ন, তর্ক-বিতর্ক সব সময়ই ছিল, যা আরও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। যদি পাকিস্তানিরা যথাযথভাবে যুদ্ধ করতে পারত, তবে ঢাকা দখলের সঠিক সময় নির্ধারণ অনেক বিলম্বিত হতো। বাস্তবে ভারত মাত্র ১৪ দিনে সীমান্ত পেরিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। এর নেপথ্যে ভারতীয়দের মানসিক ও শারীরিক বা বৈষয়িক প্রস্তুতি ছিল এবং একটি মূল মন্ত্র ছিল, যা হলো ‘আর একটা দিন যুদ্ধ কর’ (ফাইট এনাদার ডে)। ভারতীয় চতুর্থ কোরের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগত সিংয়ের নেতৃত্বে যে গেরিলা বা অনিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ পরিচালিত হয়, তাও বিজয় অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তিনি হেলিকপ্টার যোগে তার সৈন্যদের মেঘনা নদীর অপর প্রান্তে বা ঢাকার দিকে দ্রুত নামিয়ে ছিলেন, যার ফলে ভারতীয় কমিউনিকেশন জোন সর্বপ্রথম ঢাকার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

(নোট : লেখক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাঈদ আতা হোসেইন (অব.) ভারতের কাশ্মীরে শ্রীনগরস্থ ১৫ কোরের অধিনায়ক ছিলেন। বর্তমানে তিনি সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব কাশ্মীরের আচার্য। লেখকের অনুমোদন ক্রমে ২৯ নভেম্বর ২০২১ তারিখে ভারতের চেন্নাই থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘দি নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদক মেজর নাসিরউদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি, একজন গবেষক, কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক)।

সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
17181920212223
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ