এক দিনে ৫৮ চা শ্রমিককে হত্যা করেছিল পাকবাহিনী

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৫, ২০২১

এক দিনে ৫৮ চা শ্রমিককে হত্যা করেছিল পাকবাহিনী

স্বপন দেব, নিজস্ব প্রতিবেদক :: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে এক দিনে একসাথে ৫৮ চা শ্রমিককে হত্যা করেছিল পাকবাহিনী। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী। এদিন চা শ্রমিক পরিবারের ৭০ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরমধ্যে ১২ জন বেঁচে যান ভাগ্যক্রমে। আর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন ওই বাগানের চা শ্রমিক পরিবারের ৫৮জন।
জানা গেছে, এই বাগানের ম্যানেজার ছিল একজন বিহারী। ২৫ শে মার্চের কিছু আগে ম্যানেজার বাগান ছেড়ে চলে যায়। ২৫ শে মার্চের পর অনেক কর্মচারীরাও বাগান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। বাগানে শুধু রয়ে যান অনাহারে অর্ধাহারে নির্জীব দেহের চা শ্রমিকেরা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট না দেয়ার কারনে মৌলভীবাজারের তখনকার মুসলিম লীগ নেতা এসে তখন শ্রমিকদের নিয়মিত ভয় দেখাতেন।
১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল বর্তমান রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানে প্রবেশ করে পাক হানাদার বাহিনী। ৭০ জন চা শ্রমিককে ধরে ভাইয়ের সামনে ভাই, ছেলের সামনে বাবা, বাবার সামনে ছেলেকে বিবস্ত্র করে। এরপর তাদের পরনের কাপড় দিয়ে প্রত্যেকের হাত বেঁধে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে কোনোমতে ১২ জন চা শ্রমিক মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে যান। গণহত্যার ওই জায়গায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নিজস্ব অর্থায়নে একটি বধ্যভূমি নির্ম্মান করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের উদ্যোগে সংরক্ষণ করা বধ্যভূমিটি এখন ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনার স্বাক্ষী।
তথ্যানুসন্ধানে আরো জানা যায়, বাগানে ঢুকেই হানাদার বাহিনী অসহায় গরীব শ্রমিকদেরকে রেশন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একত্রে জমায়েত করে। সাথে করে নিয়ে আসা একটি বেসামরিক বাসে শ্রমিকদের উঠতে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রায় ৭০ জন শ্রমিককে বাসে ভর্তি করে বাস রওয়ানা দেয় মৌলভীবাজার শহরের দিকে। তবে একটু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরই বাস একটি খাদে পড়ে যায়। শ্রমিকদের তখন বাধ্য করা হয় বাসটি টেনে তুলতে। ঘটনাস্থলেই আরেক পাকিস্তানী মেজর আসেন।
এরপর সবাইকে একটি নালার পাশে নিয়ে বিবস্ত্র করে তাদের পরিধেয় বস্ত্র দিয়ে হাত পা বেঁধে ফেলা হয়। তারপর শুরু করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। মোহিনী গোয়ালা, রবি গোয়ালা, মহেশ কানু, নারাইল কুর্মীসহ ১২ জন সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। আহত অবস্থায় ভারতে গিয়ে এই ১২ জন চিকিৎসা নেন। তাদের মাধ্যমেই জানা যায় এই নির্মম হত্যকান্ডের খবর।
আর যারা ত্রিশ লক্ষ শহীদের খাতায় নাম লিখিয়ে যান তাদের অনেকেরই নাম এখনো জানা সম্ভব হয় নাই। তবে এদের মধ্যে উমেশ সবর, হেমলাল কর্মকার, লক্ষনমূড়া, বিজয় ভূমিক, আকুল রায় ঘাটুয়ার, মাহীলাল রায় ঘাটুয়ার, বিনোদ নায়েক, সুনারাম গোয়ালা, প্রহ্লাদ নায়েক, মংরু বড়াইক, বিশ্বনাথ ভুঁইয়া, শাহজাহান ভুইয়া, ভাদো ভুইয়া, আগুন ভুইয়া, জহন গোয়ালাসহ আরো অনেকেই ছিলেন।

স্থানীয় দালালরা সক্রিয় ছিল এসব হত্যাকান্ডে। তারাই পরে শ্রমিক ঝুপড়ি গুলোতে চালানো হয় লুটপাট। নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে এই বাগানে।
ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনার স্বাক্ষী এই স্থানটি সরকার কিংবা চা বাগান কর্তৃপক্ষ সংরক্ষনের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দীর্ঘদিনেও গ্রহণ না করায় স্থানটি অরক্ষিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক লেখালেখি হওয়ার পর ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ১নম্বর রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমদ বদরুলের হস্তক্ষেপে ও দেওড়াছড়া চা বাগান কর্তৃপক্ষের সহযোগীতায় দেওড়াছড়া চা বাগানের বধ্যভূমির স্থান চিহ্নিত করে চা শ্রমিকদের গৌরবগাথা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষনের উদ্যোগে নেওয়া হয়। ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ইউনিয়নের নিজস্ব অর্থায়নে এখানে একটি বধ্যভূমি নির্ম্মাণ করা হয়েছে। এরপর থেকে প্রতিটি জাতীয় দিবসে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও চা বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
আলাপকালে রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমদ বদরুল জানান, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল দেওড়াছড়া চা বাগানে এসাথে ৫৮ জন চা শ্রমিককে হত্যা করে পাকবাহিনী। এই স্থানটি আমরা সংরক্ষণের উদ্যোগে নিয়েছি এবং একটি বধ্যভূমি নির্মাণ করেছি। এছাড়া দেওড়াছড়া চা বাগানে গণহত্যার স্থানকে যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি স্মৃতিসৌধ নির্ম্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প প্রেরণ করা হয়েছে।

 

 

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ