এমসি কলেজে এবার ভবন নির্মাণে কাটা হচ্ছে টিলা!

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২০

এমসি কলেজে এবার ভবন নির্মাণে কাটা হচ্ছে টিলা!

 

নিজস্ব প্রতিবেদক :::
বিতর্ক যেনো পিছুই ছাড়ছে না সিলেটের মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের। সোয়াশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই কলেজটিতে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। ছাত্রাবাসে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড়ের মধ্যে এবার এই কলেজের ভবন নির্মাণে টিলা কাটার অভিযোগ ওঠেছে। এরআগে ২০১২ সালে এমসি কলেজের শতবর্ষী ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগ ও ২০১৬ সালে ক্যাম্পাসের ভেতরে খাদিজা আক্তার নামে এক ছাত্রীকে কুপানোর ঘটনায় এমসি কলেজের নাম দেশে-বিদেশে আলোচিত হয়।

সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ৮ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই ঘটনার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে প্রবেশে নিষাধাজ্ঞা জারি করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকার সুযোগে এমসি কলেজের ভেতরে চলছে টিলাকাটা। খননযন্ত্র যন্ত্র দিয়ে কাটা হচ্ছে ‘থ্যাকারের টিলা’ নামের একটি ঐতিহাসিক টিলা। যদিও সংশ্লিস্টরা টিলা কাটার অভিযোগি অস্বীকার করেছেন।

জানা যায়, এমসি কলেজের পুরনো ক্যান্টিনের জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছে ১০ তলা একাডেমিক ভবন। ২০১৭ সালের আগস্টে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ভবনের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তবে উদ্বোধনের অনেক পরে শুরু হয় নির্মাণ কাজ। করোনার কারণেও গত কয়েকমাস কাজ বন্ধ ছিলো। সম্প্রতি আবার কাজ শুরু হয়েছে।
প্রায় ১২৪ একরের বিশাল ক্যাম্পাসের উঁচু নিচু টিলা, দিঘী, গাছের সারি আর আসাম প্যাটার্নের সেমি পাকা ভবনের জন্য পর্যটকদের কাছেও আকর্ষনীয় এই কলেজ ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসের ভেতরে দিঘীর পাড়ে নির্মিত হচ্ছে দশতলা ভবন। নির্মাণ কাজের শুরুতেই উঁচু এই ভবনের কারণে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য নষ্ট হ্ওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তবে তাদের শঙ্কা আমলে না নিয়ে শুরু হয় ভবন নির্মাণের কাজ। এই ভবন নির্মাণে ভেঙ্গে ফেলা হয় পুরনো ছাত্রাবাস।

 

 

শনিবার এমসি কলেজে গিয়ে দেখা যায়, ধর্ষণকান্ডের পর থেকে বন্ধ রয়েছে কলেজের মূল ফটক। ফটকে রয়েছেন পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী। কাউকে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। জরুরী প্রয়োজন থাকলে নিরপত্তাররক্ষীর খাতায় নাম নিবন্ধন করে ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে।

ক্যাম্পাসের ভেতরের দিঘীর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, নতুন ভবনের পাইলিং কাজ শেষ করে লিন্টার টানা হচ্ছে। খনন যন্ত্র দিয়ে পাশের টিলাশ্রেণীর ভূমি থেকে মাটি কেটে ফেলা হচ্ছে নির্মানাধীন ভবনের জায়গায়।

কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, যে টিলাটি কাটা হচ্ছে সেটি ‘থ্যকারের টিলা’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক টিলা।

বৃটিশ শাসনামলে সিলেটের প্রথম কালেক্টর উইলিয়াম ম্যাকপীস থ্যাকারের বসবাসের জন্য ১৭৭২-৭৫ সালের দিকে এই টিলার উপর বাংলো তৈরি করা হয়। ১৮৯২ সালে রাজা গিরিশচন্দ্র রায় তার পিতামহের নামে ‘মুরারিচাঁদ কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমদিকে এর ক্যাম্পাস ছিলো শহরের বন্দরবাজার এলাকায়। পরে টিলাগড়ে থ্যাকারের টিলা এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। টিলার উপর থ্যাকারের বাংলোটি বর্তমানে এমসি কলেজ অধ্যক্ষের বাংলো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঐতিহাসিক এই টিলারই ঢালু অংশ কাটা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সমিতি (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, শনিবার আমি সরেজিমনে এমসি কলেজে গিয়ে টিলা কাটার প্রমাণ পাই। এরআগে করোনার বন্ধের সুযোগে সিলেটের শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ভবন নির্মাণের নামে টিলা কর্তন করা হয়। এবার এমসি কলেজেও একই কান্ড হচ্ছে। অথচ এমসি কলেজের বিশাল ক্যাম্পাসে ভবন নির্মাণের জন্য জায়গার অভাব ছিলো না। তিনি বলেন, সিলেটে টিলা কাটা বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু কেউ তা মানছে না। প্রশাসনও এ ব্যাপারে নিরব।

শনিবার এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, নির্মানাধীন ভবনের পাশেই আছেন ঠিকাদার হুমায়ুন কবির। তার উপস্থিতিতেই চলছে টিলা কাটা। এ ব্যাপারে হুমায়ুন কবির বলেন, আমাকে কলেজ কর্তৃপক্ষ বলেছেন, এটি টিলা নয়। পাইলিংয়ের সময় এই জায়গার মাটি নিয়ে পাশে রাখা হয়েছে। ফলে এই মাটি কেটে এনে আবার ভবনের জায়গায় ফেলে দিচ্ছি।

শনিবার এমসি কলেজের ফটকে নিরপত্তার দায়িত্বে ছিলেন শাহপরান থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, টিলা কাটার অভিযোগ পেয়ে আমি মৌখিকভাবে সংশ্লিস্ট ঠিকাদারকে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। বিষয়টি কলেজ অধ্যক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি এসে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।

এ ব্যাপারে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সালেহ আহমদ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, যে জায়গার মাটি কাটা হচ্ছে সেটি কোনো টিলা নয়। ভবন নির্মাণের আগে পাইলিংয়ের সময় নির্মাণস্থল থেকে মাটি খুঁড়ে পাশে রাখা হয়েছিলো। সেই মাটিই কেটে আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিলো। এ কারণে ফেলে রাখা মাটিতে ঘাস উঠে গেছে। একারণে এখন টিলার মতো দেখাচ্ছে।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ