কঠিন দায়িত্ব; বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত: ১১:৪৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০

কঠিন দায়িত্ব; বড় চ্যালেঞ্জ

দুলাল আহমদ চৌধুরী :

আমরা কঠিন এক সময় পার করছি। অদ্ভুত অন্ধকার ঘিরে আছে চারদিক। অদৃশ্য এক ভাইরাসের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে সারা বিশ্বের মানুষ। পুরো পৃথিবী যেন থমকে আছে। এই দুর্দিনে নতুন কিছু শব্দের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি-লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, সোশ্যাল ডিস্টেন্স। আমরা গত প্রায় পাঁচ মাস যাবৎ যতটা বিচ্ছিন্ন ছিলাম ও আছি, যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও মানুষ এত বিচ্ছিন্ন হয় না। আজও পুরো বিশ্ব একে অন্য থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। পৃথিবীর তাবৎ বড় বড় এয়ারপোর্টের ব্যস্ত সব রানওয়ে এখনো পুরোপুরি সরব হয়নি।

শহরে শহরে প্লাটফর্মে স্থীর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনগুলো এখন সীমিত আকারে চলতে শুরু করলেও বলা যায় অনেকটা যাত্রীহীন। গাড়ির চাকাও ঠিক একই নিয়মে ঘুরছে। জীবন চলার তাগিদে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে কলকারখানা খুললেও তা পর্যাপ্ত নয়। প্রায় পথে বসে গেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা। চাকরি ও পেশা হারিয়ে বিপন্ন মানুষের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। জীবন সংগ্রামে টিকতে না পেরে শহর ছেড়ে পরিবার নিয়ে গ্রামে পাড়ি দিয়েছেন অনেকেই। এর মধ্যে হানা দিয়েছে বন্যা-চরম দুর্দিনে মানুষ।

দুই. এই দুর্দিনে কঠিন এক দায়িত্ব এসে পড়েছে ঘাড়ে। সম্প্রতি মানবকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ কাগজটির সম্পাদক হিসেবে আমাকে দায়িত্বভার দিয়েছেন। যতটা না গুরুদায়িত্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন তা সফলভাবে পালন। ডিজিটাল সাংবাদিকতায় এমনিতেই মুদ্রণ কাগজের দুঃসময় চলছে। করোনাকালে তা আরো কঠিনতর হয়ে উঠেছে। বড় সব কাগজই পৃষ্ঠা-বিন্যাসে হিমশিম খাচ্ছে। কঠিন করোনাকালে অনেক কাগজের প্রকাশনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ।

সার্বিক পরিস্থিতিতে অনেকে দাঁতে কামড় দিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এখনো। নানা প্রতিক‚লতায় প্রতিদিন ছাপা কাগজ বের করছেন, কিন্তু পৃষ্ঠা কমাতে বাধ্য হয়েছেন। লকডাউন সময়ে মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দিতে অসম এক যুদ্ধে নেমেছিলেন সংবাদকর্মীরা। অদৃশ্য ঘাতক করোনা ভাইরাসের আঘাতে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সম্মুখযুদ্ধ করে আক্রান্ত হয়েছেন অনেক সংবাদকর্মী, প্রাণও দিয়েছেন কয়েকজন। কিন্তু যুদ্ধ থেমে নেই। যে-যার অবস্থানে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে যাচ্ছেন, সার্বিক পরিস্থিতির সঠিক খবরটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

এই কঠিন সময়ে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাকে সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। আমি জানি কাজটি কঠিন। একজন ভালো সাংবাদিক হয়ে ওঠা যত কঠিন এর চেয়ে অনেক কঠিন একজন সম্পাদক হওয়া। রিপোর্টার ভুল করলে দায় থাকে সম্পাদকের কাছে, কিন্তু একজন সম্পাদক ভুল করলে পুরো রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। একজন রিপোর্টার হয়তো নির্দিষ্ট বিট কিংবা নির্ধারিত অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কাজ করেন।

সে তুলনায় তার জবাবদিহিতার জায়গাটাও অনেক ছোট হয়। একজন সম্পাদককে অনেক বিভাগের বহু বিষয় নিয়ে প্রতিদিন কাজ করতে হয়। সেখানে বার্তাকক্ষের সংবাদ সম্পাদনা থেকে প্রতিটি বিভাগের দিকে দৃষ্টি রাখতে হয়। ছুটিহীন প্রতিদিন কাটে তার বেলা-অবেলা। এ জন্যই হয়তো মহাকালের প্রাতঃস্মরণীয়রা বলে গেছেনÑ‘রাজনীতিবিদরা যখন ঘুমান, সংবাদপত্র তখন রাজ্য পাহারা দেয়’।

তিন. দেশে সংবাদপত্র শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। নব্বইয়ের দশকে ‘আজকের কাগজ’ এসে সংবাদপত্রের ইতিহাসে আধুনিক ধারার যে বিকাশ ঘটিয়েছিল, কালের ধারাবাহিকতায় আজ তা শিল্পে রূপ নিয়েছে। দেশে এখন ছোট-বড় অনেক পত্রিকা। সাংবাদিকতার পরিসরও অনেক বেড়েছে। পত্রিকার বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্য এসেছে। নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা যোগ হয়েছে। ইন্টারনেট সমৃদ্ধ, মুক্ত সাংবাদিকতার দিকও বদলেছে।

নিউজপ্রিন্টের ছাপা অক্ষর প্রযুক্তির সময়ে এসে মুঠোফোনের আঙুলের তলায় গিয়ে ঠেকেছে। এখন এক ক্লিকেই সব খবর পড়া যাচ্ছে। সব শ্রেণির মানুষই এখন খবরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারছেন সহজে। এর পরও সংবাদপত্র শিল্প নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়া একদিকে যেমন গণমাধ্যমের ক্রমবিকাশ দ্রুত ঘটাচ্ছে, তেমনি নিউজপ্রিন্টের জন্য বৈরী পরিবেশও তৈরি করছে। নতুন প্রজন্ম এখন যন্ত্রনির্ভর।

ইন্টারনেটের প্রসারে তাদের মুঠোফোনেই এখন বিশ্ব সংযোগ করে নিয়েছে। পুরো বিশ্বের গণমাধ্যম তাদের সামনে উন্মুক্ত। তারা চাইলেই একটি সংবাদের পাঠ শেষে মতামত কিংবা বিশ্লেষণ করে নিতে পারছেন। আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকেও যা ছিল কল্পনাতীত।

তবে আশার কথা হচ্ছে, কাগজের মুদ্রণ থেকে ডিজিটাল প্রশাখায় রূপান্তরিত হয়ে সাংবাদিকতার পরিসর যেমন বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে কনটেন্টও। অনেকটাই উন্মুক্ত পরিবেশে বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বা ফ্রিল্যান্স রাইটার, উন্নয়নকর্মী যারা নিজেরা কোনো বিষয়বস্তু নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন, তারা ব্যাপকভাবে খবরের কাগজে লিখতে শুরু করেছেন। ফলে সাংবাদিকতা বহুমাত্রিকতা পাচ্ছে।

প্রতিটি কাগজের ওয়েব ভার্সন থাকায় সেসবের প্রতিফলনও পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের সহজাত আকাক্সক্ষা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু নিত্যনতুন পরীক্ষণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। উন্মুক্ত সময়ের এই সুযোগগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। পত্রিকায় নতুন কনটেন্ট যোগ করতে চাই। তরুণদের লেখার আকাক্সক্ষা- নতুন নতুন বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর নানা মাত্রায় সাজাতে চাই মানবকণ্ঠ।

চার. একটি রাষ্ট্রের ভিত যেমন টিকিয়ে রাখে সংবাদপত্র, তেমনি একটি সংবাদপত্রের ভিতও নির্ভর করে একজন সম্পাদকের ওপর। সম্পাদক নড়বড়ে হলে ওই সংবাদপত্রের ভিত্তিও ঠিক থাকে না। এই উপমহাদেশের প্রথম বাংলা সংবাদপত্রের সম্পাদক কবি ঈশ্বর গুপ্ত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও কাগজের সম্পাদনা করেছেন।

নজরুলের মুকুট পাওয়া কবি শামসুর রাহমানও পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এখনো দেশে প্রথম সারির সব কাগজের সম্পাদকরাই বড় মাপের। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ধারক হিসেবে অনেক যশস্বী সম্পাদকের নাম আমাদের মননে ঠাঁই করে আছে। সেখানে আমার নামটি কতটুকু জুতসই হবে তা নির্ভর করবে কাজে, সময়ের বিচারে। আমাকে এই কঠিন কাজের ক্ষেত্রটি তৈরি করে দিয়েছে দৈনিক মানবকণ্ঠ।

কাগজটির কর্তৃপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ আসনটিতে আমাকে বসিয়েছেন। আমি জানি আসনটি বড়, কিন্তু বসে থাকার সুযোগ নেই। আমি নিজের দায় থেকে বলছি-মানবকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ যে সম্মান আমাকে দেখিয়েছেন, এই সম্মানের পুরোটাই ব্যয় করতে চাই এই পত্রিকার বিকাশের মধ্য দিয়ে।

আমি কথা দিচ্ছি-মানবকণ্ঠ যেমন আমাকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছে, মানবকণ্ঠকেও সর্বোত্তম সিংহাসনে পৌঁছানোর অদম্য ইচ্ছা থাকবে আমার। কাজ করব সে লক্ষ্যেই। আমার মগজে-মননে সব সময় কাজ করবে মানবকণ্ঠের জয়গান। অদম্য ইচ্ছায়, সত্যনিষ্ঠ কাজে মানবকণ্ঠ সামনে এগিয়ে যাবে-এ আমার বিশ্বাস। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই গুরুদায়িত্ব পালনে আমি সব মহলের সহযোগিতা পাওয়ার আশা রাখছি।

পাঁচ. দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় সাজাতে চাই মানবকণ্ঠ। আমি জানি বৈশ্বিক দুর্যোগের কঠিন এ সময়ে কাজটি মোটেও সহজ নয়। কিন্তু বাঙালি হিসেবে বুকে সাহস আছে। কারণ এই বাংলা আর বাঙালির উদ্ভবের ইতিহাস হলো সাহসের ইতিহাস। আমাদের আছে ভাষা-সংগ্রামের অদম্য ইতিহাস, আছে ৯ মাসের আত্মত্যাগের গৌরবগাথা। তাই বিশ্বাস করি বায়ান্ন আর একাত্তরের সাহস যাদের বুকের গহীনে এখনো ফোটায় রুধির গোলাপের সাহস- তাদের গন্তব্য অনেক দূর।

পূর্ব অভিজ্ঞতায় বলতে পারি সম্পাদনায় সৃজনশীলতা থাকলে, প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞে দক্ষতার ছাপ থাকলে, পারস্পরিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ও একটি নির্ভুল পদ্ধতি সহজেই পারে একটি কাগজ পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে। লেখক-পাঠকের যুথবদ্ধতা-হৃদয়ের এ বন্ধন আরো দৃঢ় করতে পারে যদি সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা থাকে। সবার ওপরে দেশ, দেশের মানুষকে নিয়ে চলে অন্তহীন পথচলা। এভাবেই পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে কাগজ, সংবাদ ও সাংবাদিকতা।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ