করোনাকালে মানবিক সাড়া

প্রকাশিত: ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

করোনাকালে মানবিক সাড়া

ড. আতিউর রহমান :; করোনা সংকটে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও পর্যুদস্ত। এমন সংকটে আমরা আগে কখনো পড়িনি। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এ দেশ, আমাদের সমাজ। আর তাই সমাজের ভিতর যে আত্মশক্তি তাকে জাগ্রত করে এ মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করার কোনো বিকল্প নেই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়- ‘আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা।’ আমিও বিশ্বাস করি অতীতে বহুবার যেমন কঠিনতম দুর্যোগের মুখে আমরা জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করেছি এবারও তেমনি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় করোনার এ ঘোর সংকটও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। জাতি হিসেবে দুর্যোগের মুখে অটল থাকার আমাদের যে ইতিহাস সেটাই আমাদের ভরসার মূল কেন্দ্র। মনে পড়ছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও ছিল বাঙালির এ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর অগাধ আস্থা। তাই আজ থেকে চার দশকের বেশি আগে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ যখন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, বৈশ্বিক মন্দা অবস্থা আর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মতো বহুমুখী সংকটের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল তখনো তিনি বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংকট উত্তরণের সংস্কৃতির ওপর আস্থাশীল ছিলেন। তাই ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সভায় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন যে, তাঁর দেশবাসী বহু দুর্ভোগেও কাবু হবে না, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের ইচ্ছাশক্তির জোরে জয়ী হবে শেষ পর্যন্ত। সংকটে সকলে এক জোট হয়ে নির্ভীকভাবে লড়াই করা সত্যিই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তো রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন- ‘আমরা দুখের বক্রমুখের/চক্র দেখে ভয় না করি/… হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে/করি মোরা পরিহাস।’

করোনা দুর্যোগেও এ সামাজিক ঐক্য আমাদের শেষ ভরসা। আজ জীবন ও জীবিকা দুই-ই আক্রান্ত। সমাজ ও অর্থনীতি স্তম্ভিত। বাংলাদেশ বিগত বিশ্বমন্দা কাটিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই তার গত কয়েক দশকের অর্জন এখন ভূলুণ্ঠিত। প্রবৃদ্ধি কমছে এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের সদাপরিশ্রমী মানুষও আজ ঘরবন্দী। একই সঙ্গে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একাংশের জীবন ও জীবিকাও হুমকিতে। সরকার অবশ্যি চেষ্টা করে চলেছে। বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাতকে দাঁড় করাতে চাইছে। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জটি বিরাট। সরকারের একার পক্ষে এ খাতকে সক্ষম করে তোলা খুবই মুশকিল। ব্যক্তি খাত, এনজিও এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করা গেলে হয়তো এটা করা সম্ভব। তবে এ কাজে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গুণমানের বাস্তবায়ন। তবে করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে সামাজিক সচেতনতা। এটা যুদ্ধের সময়। কাজেই মানুষকে সেভাবে তৈরি করতে হবে।
রাষ্ট্রের শত চেষ্টা সত্ত্বেও সমাজের নানা স্তরের নানাজন অভাব-অনটনে প্রায় দিশাহারা হয়ে গেছে। কেবল সরকার নয়, ব্যক্তি খাত, অসরকারি খাত এবং নানান সামাজিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে করোনায় বিপন্ন মানুষকে বাঁচাতে। তবু অনেকের দুর্দশার কথা না বলাই থেকে যাচ্ছে। করোনাকালে জীবিকা হুমকিতে পড়ায় বিপদে পড়া অনেক মানুষই থেকে যাচ্ছে আমাদের দৃষ্টির অগোচরে। দেশের নানা প্রান্তে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্তরা এদের অন্যতম। যারা গান শেখাতেন, তবলা বাজাতেন, বাঁশি বাজাতেন, বাউল গান গাইতেন তাদেরও রোজগার নেই বললেই চলে। এরা ত্রাণের তালিকায় নেই। নিজেরাও জীবিকার সন্ধান করে নিতে পারছেন না। সাধারণত সমাজই এগিয়ে আসে সংকটে পড়া এসব মানুষকে বাঁচানোর জন্য। এবারেও ব্যত্যয় ঘটেনি। মানুষ সাধ্যমতো হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য। তবু পরিবেশ-পরিস্থিতি এতটাই অনিশ্চিত যে, হঠাৎ বিপদে পড়া এ মানুষগুলোর অসহায়ত্বের মাত্রা গভীর। আর এখানেই সমাজের দায় বেশি। সমাজের দুর্দিনে সংস্কৃতি তাকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে। তাই সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের দুর্দিনে সামাজিক সংগঠনগুলোর তাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা।

আমরা বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সমাজকে অনেকটাই সক্রিয় হতে দেখেছি। এ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়, বন্যা বা ঝড়ের সময় দেখেছি কীভাবে জেগে ওঠে সমাজ সচেতন মানুষ। একাত্তরে পুরো অসহযোগ আন্দোলনের সময় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখেছি সংস্কৃতিজনেরা কি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের মুক্তির গান গেয়েছেন। তাদের পাশে থেকেছেন। তারও আগে সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের লাখ লাখ মানুষের প্রাণ গেল। ঘর নেই। খাবার নেই। প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে আমাদের সংস্কৃতিজনদের উজ্জ্বল প্রতিনিধিরা দিনের পর দিন দুঃখী মানুষের পাশে থেকে তাদের মনে ভরসা জুগিয়েছেন। তাদের ব্যথায় ভরা হৃদয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তাই আজ যখন দেশের নানা প্রান্তের সংস্কৃতিজনেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে করোনজনিত অর্থনৈতিক অচলাবস্থার শিকার হচ্ছেন তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ তাড়না অনুভব করা খুবই স্বাভাবিক।

আমাদের জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ সংস্কৃতিমনা মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত সংস্কৃতি ও কৃষ্টি চর্চার একটি সুপরিচিত মঞ্চ। প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের হাতের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে এ সংগঠনটি। প্রয়াত অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীও ছিলেন এর নির্বাহী সভাপতি। ডা. সারোয়ার আলি, মফিদুল হক, মিতা হক, আবুল হাসনাত, পাপিয়া সারওয়ার, বুলবুল ইসলামসহ অনেক সংস্কৃতিসেবীই এর সঙ্গে যুক্ত। সন্জিদা আপার গভীর আগ্রহে আমি সংগঠনটির নির্বাহী সভাপতি হিসেবে তরুণ সংগঠকদের উৎসাহ দিয়ে থাকি। কাজ তরুণরাই করেন। বুলবুল, লিসা, সেমন্তী, ময়না, তানিয়া, তুর্য, আমীন, আলোময়সহ আরও অনেকেই কি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতাসহ এ সংগঠনটি পরিচালনা করে থাকে তা বলে বোঝাতে পারব না। আমাদের শাখাগুলো পরিচালনা করেন স্থানীয় গুণী শিল্পী ও সংস্কৃতিজন। গত মার্চে করোনা সংকটের একেবারে শুরুতেই আমরা জানতে পারলাম প্রান্তিক শিল্পীদের পরিবারগুলো সাধারণ ছুটির কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থায় কষ্টে আছে। স্বভাবতই এ বিপর্যস্ত সময়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। বাঙালির সংস্কৃতি সম্পদের রক্ষক এই শিল্পীসমাজকে এ দঃসময়ে সামান্য সহযোগিতা দিতে পারলেও আমাদের সামাজিক দায় খানিকটা পূরণ হবে এ আশায়। একটি ত্রাণ কমিটি গঠন করলাম। ৬৩টি শাখা থেকে পরিবারের সদস্য, বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করে একটি ‘কম্পিউটারাইজড’ তালিকা তৈরি হলো। গুণীজনসহ উনিশ ধরনের প্রায় ১ হাজার ২০০ বিপন্ন শিল্পী পরিবারকে তিন ধাপে এরই মধ্যে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। চরাঞ্চলের কিছু বিপন্ন শিল্পীও নগদ সহায়তা পেয়েছেন। তিন ধাপে সব মিলে প্রায় সাড়ে ২১ লাখ টাকা আমরা এরই মধ্যে শিল্পীদের হাতে পৌঁছে দিতে পেরেছি। এ ছাড়া বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে ১ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে দুস্থ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণের জন্য।

প্রথমেই আমরা সম্মিলন পরিষদের সদস্যদের স্বেচ্ছায় অর্থ দিয়ে বিপন্ন শিল্পীদের সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছিলম। ভালো সাড়াও পেয়েছিলাম। পরে দেশে-বিদেশে থাকা বিত্তশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও আহ্বান জানাই। দীর্ঘদিন দেশের ব্যাংকিং খাতের রেগুলেটর হিসেবে কাজ করায় দেশের ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা বা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বিপন্ন প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন সেটাও জানা ছিল। তবু মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি মাহবুবুর রহমান, সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলমগীর কবির ও এমডি কামাল হোসেন, আইপিডিসির এমডি মমিনুল ইসলাম এবং ব্যাংক এশিয়ার এমডি আরফান আলী আমাদের সম্মিলন পরিষদের আহ্বানে যত দ্রুততার সঙ্গে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তা সত্যিই আমাকে আবেগে আপ্লুত করেছে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন, এবং ছায়ানটও আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। এসব প্রতিষ্ঠান মিলে অনুদান দিয়েছে ২২ লাখ ৪ হাজার ৪৭৮ টাকা। এর বাইরে এইচএসবিসি রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। প্রবাসী শুভাকাক্সক্ষীদের অনুদানও আমাদের দারুণ অনুপ্রাণিত করেছে। ইমতিয়াজ ও তার সংগঠন আনন্দধারা লন্ডনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে হোমায়রা, মকসুদ, আর অস্ট্রেলিয়া থেকে শামসুল, মুকাররাবিন আমাদের এ মানবিক কাজে যেভাবে যুক্ত হয়েছেন সেজন্য তাদের শুধু ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না। বিপন্ন সংস্কৃতিজনদের রক্ষা করতে সমাজের সর্বস্তর থেকে যে সাড়া পাওয়া গেল তা দুর্যোগে মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ানোর একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। করোনা দুর্যোগ কত দিন থাকবে তা এখনো কেউ বলতে পারছে না। আর এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অচলাবস্থার দুর্ভোগ হবে আরও দীর্ঘ। এর মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা জানিয়ে দিয়েছেন করোনার কারণে নতুন করে দরিদ্র হবে অন্তত দেড় কোটি মানুষ। সরকার তার নিজের জায়গা থেকে সংকট মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালু রাখবে এ আস্থা আমার আছে। কিন্তু সরকারের বাইরের অন্য অংশীজনদের অর্থাৎ বৃহত্তর সমাজের পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলার ধারাবাহিক কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে যে সংকট উত্তরণ সম্ভব নয় সে বিষয়েও আমি নিঃসন্দেহ। তাই যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করলাম তাদের দেখাদেখি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ও পর্ষদের চেয়ারম্যানদের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ অনেকটাই রয়ে গেছে। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমাদের সমাজের সম্পদশালী উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ প্রদান ছাড়াও নানা পর্যায়ের বিপন্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার নানা মানবিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী বিকাশ স্বাস্থ্য খাতে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। আমাদের অর্থ পাঠাতেও তারা দারুণ ক্ষিপ্রতার ও দক্ষতার প্রমাণ রেখেছে। ব্র্যাক ব্যাংকও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। আরও অনেকেই হয়তো এভাবে কাজ করছেন। তবে সম্পদশালীদের এ সংকটে আরও বেশি সক্রিয় দেখতে চাই।

সামনের দিনগুলোয় করোনায় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ চাই উদ্ভাবনী আর সম্মিলিত উদ্যোগে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যেই ‘ক্রাউড ফান্ডিং’-এর মাধ্যমে বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ ও তা ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় তারা যেভাবে বৃহত্তর সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। একইভাবে ফুড ফর অল ফাউন্ডেশনও অনলাইনে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে। অনলাইন কানেকটিভিটির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে সব অংশীজনই এ দুর্যোগের সময় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বহু মানুষকে এক করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারেন। ব্যক্তি খাতের অনেকেই নিজ নিজ সক্ষমতাকে করোনায় বিপন্ন মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে এগিয়ে এসেছেন। যেমন আবুল খায়ের গ্রুপ তাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন প্লান্ট সংস্কার করে বেশ কয়েকটি হাসপাতালের অক্সিজেন সিলিন্ডার বিনা পয়সায় রিফিল করে দিচ্ছে। আরও অনেক ব্যবসায়িক গ্রুপের ফাউন্ডেশনগুলো একইভাবে এগিয়ে এসেছে। তবে দ্রুততম হারে অতিধনীর সংখ্যা বাড়ছে যে দেশে সে দেশে বিত্তশালীদের সে রকম সেবামূলক তৎপরতা এখনো নজরে পড়ছে না। আর সম্মিলিত উদ্যোগের দিকেও বিশেষ মনোযোগ দরকার। কারণ আমাদের একেক অংশীজনের দক্ষতা একেক জায়গায়। এসব দক্ষতা ও সক্ষমতাকে এক জায়গায় নিয়ে আসা গেলে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অনেক বেশি কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া ও বাস্তবায়ন সম্ভব। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় বসুন্ধরা গ্রুপের ২ হাজার ১৩ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের কথা। সরকারের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের সঙ্গে যুগপৎ কাজ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা এ হাসপাতালটি নির্মাণ করতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়। তবে এখনো হাসপাতালটি চালু করা যায়নি। জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন কোনো অংশীজনকে সঙ্গে নিলে এ উদ্যোগটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যাবে বলে মনে করি। যেমন ধরা যাক ব্র্যাকের কথা। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কাছে কার্যকরভাবে বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্র্যাকের সফলতা অবিসংবাদিত। ব্র্যাকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের এ হাসপাতালটিকে করোনা আক্রান্ত নিম্ন আয়ের মানুষের সেবায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরও দুুর্যোগকালে বিপন্ন মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে অভিজ্ঞ। তাদেরও এখানে কাজে লাগানো যেতে পারে।

এখন গ্রামে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের আছে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক। এ তরুণরা এসব ক্লিনিকে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে এবং মানুষের মধ্যে করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকে করোনা চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো নিশ্চিত করা গেলে গ্রামেই বেশির ভাগ রোগীর চিকিৎসা সম্ভব হবে। গুরুতর রোগীদের বড় হাসপাতালে রেফার করবে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। তার মানে জাতীয় ও তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে একটি সুসমন্বয় নিশ্চিত করা যাবে। স্থানীয় সরকার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোট কথা, করোনার মতো মহাদুর্যোগে মানুষের পাশে মানুষকে দাঁড়াতে হবে। সবাইকে যার যার অভিজ্ঞতা আর সক্ষমতার জায়গা থেকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে সরকারি প্রচেষ্টার সম্পূরক উদ্যোগ দাঁড় করাতে। মনে রাখতে হবে, করোনা দুর্যোগের মুখে মানবতার ডাকে আমাদের ছোট ছোট সাড়াগুলো একসঙ্গে তৈরি করতে পারে প্রতিরক্ষার এক মহিরুহ। মানবিক উদ্যোগের এমন মহিরুহই পারে এমন ক্রান্তিলগ্নে আমাদের প্রয়োজনীয় ছায়া দিতে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

যোগাযোগ : dratiur@gmail.com
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ