করোনার প্রভাবে পেশা পরিবর্তনের হিড়িক

প্রকাশিত: ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০

করোনার প্রভাবে পেশা পরিবর্তনের হিড়িক

মিজান চৌধুরী :;

‘হোটেলের মালামাল বিক্রি হবে- টেবিল, চেয়ার, ফ্যান, চুলা, হাঁড়ি-পাতিল, ক্যাশ টেবিল ইত্যাদি মোবাইল- ০১৬৩৬-৬৯১৯১৪’ শিরোনামের একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল বৃহস্পতিবার। সাদা পাতায় কম্পোজ করা বিজ্ঞাপনটি রাজধানীর হাজারীবাগ কালুনগরে একটি বৈদ্যুতিক পিলারে লাগানো ছিল।

উল্লিখিত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে রিয়াদুল নামের যুবক অপরপ্রান্ত থেকে জানান, করোনায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় হোটেলে বিক্রি কমছে, অন্যদিকে মাসিক ভাড়া ১২ হাজার টাকাসহ কর্মচারীদের বেতন ৩০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। ৩ মাস বসে ৯০ হাজার টাকা নগদ পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে।

লোকসানের মুখে পড়ে হোটেলটি বন্ধ করতে হয়েছে। এজন্য ফার্নিচার বিক্রির পোস্টার দিয়েছি। তিনি জানান, একক মালিকানাধীন হোটেল ব্যবসা গুটিয়ে এখন মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিনোদন পার্কে হিসাবরক্ষক (অ্যাকাউন্ট অফিসার) কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন এমবিএ পাস করা ফয়েজ চৌধুরী (ছদ্মনাম)। কিন্তু করোনার কারণে পার্কটি বন্ধ হয়ে গেলে তার নিয়মিত বেতন আটকে যায়। ৪ মাস ঘরে বসে থেকে এখন অনলাইনে একটি ব্যবসা করার চেষ্টা করছেন।

ফয়েজ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সংসারে স্ত্রী গর্ভবতী। এ সময়ে চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংসার পরিচালনা, স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এখন নতুন পেশা হিসেবে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন।

করোনার এ সংকট পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য তরুণ রিয়াদুল ও ফয়েজ চৌধুরীর মতো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কর্মজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন পেশা পরিবর্তন শুরু করছেন। এরা বেশিরভাগ হচ্ছে চাকরি হারানো ও ব্যবসা বন্ধ হওয়া কর্মহীন মানুষ। মূলত টিকে থাকার জন্য নতুন পেশার সন্ধানে নেমেছেন তারা।

জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, জীবিকার তাগিদে অনেকে পেশা বদল করছেন। তবে এটি সাময়িক, স্থায়ী হবে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমে এলে যারা পেশা পরিবর্তন করেছেন তারা আগের জায়গায় ফিরে আসবেন। তিনি আরও বলেন, অনেক শিক্ষিত মানুষ চাকরি হারিয়ে নতুন নতুন পেশা নিয়ে বসছেন। এটি হয়তো বেঁচে থাকার জন্য। তবে এটি দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে না।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান যুগান্তরকে বলেন, সেবাজনিত পেশাতে বেশি মন্দা চলছে। ছোটখাটো দোকানে বেচা-কেনা হচ্ছে না। ঢাকামুখী অনেক মানুষ আগেই সহায়-সম্বল বিক্রি করে এসেছিলেন।

পেশা হারিয়ে সেই গ্রামে ফিরে যাওয়ার অবস্থাটুকু নেই। অনেকে পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখেই ঢাকায় এসেছিলেন। তারা হয়তো ফিরে গিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকবেন। এতে গ্রামীণ শ্রম বাজারে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমের মূল্যও কমে যেতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসেবে দেশে কর্মে নিয়োজিত ছিলেন ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ। করোনার কারণে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। সরকার ঘোষিত লকডাউনে (২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত) ৬৬ দিনে এসব মানুষ কাজ হারান। তবে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত কর্মহীন লোকের সংখ্যা ১৪ লাখ।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে বলেছে, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় প্রবাহের জেরে বিশ্বজুড়ে ৩৪ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। এ ক্ষতির তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশেরও।

জানা গেছে, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছেন অপ্রতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষ। এছাড়া ছোটখাটো ব্যবসায়ী হারিয়েছেন মূলধন, প্রাতিষ্ঠানিক খাতের বেসরকারি লাখ লাখ কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এসব নিয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করা হয়।

ফেনীর দাগনভুঞা হাসাননগর গনিপুর গ্রামে কৃষি কাজ করেন জনি। ৫ মাস আগেও তিনি ঢাকার মহাখালীর রসুলবাগ দুবাই মোটরপার্টসের দোকানে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। করোনায় বেতন বন্ধ হয়ে গেলে সেলসম্যান পেশা পরিবর্তন করে তিনি কৃষিতে প্রবেশ করেছেন।

জনির সন্ধানে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফেনী থেকে যুগান্তরকে বলেন, মা-বোনকে নিয়ে মোহাম্মদপুর কাটাসুরে ভাড়া থাকতেন। বেতনের ওপর নির্ভর করে তার সংসার চলত। কিন্তু করোনার কারণে তার কর্মক্ষেত্র মহাখালীর দুবাই অটোপার্টস দোকান ৩ মাস ধরে বন্ধ। বেতন-ভাতাও দেয়া হয়নি। ফলে পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে এসেছেন।

তিনি এখন পেশা পরিবর্তন করে কৃষি কাজ করছেন। রাজধানীর শনিরআখড়া রায়েরবাগে ছোট কবিরাজি ওষুধের দোকান দিয়ে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করতেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মো. রুহুল আমিন খান। করোনায় তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ গ্রামে চলে আসেন। এখানে তিনি মৌসুমি পণ্য বিক্রেতা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।

করোনায় তিনি আগের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। জানতে চাইলে পটুয়াখালী থেকে রুহুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, টিকে থাকাই এখন বড় লড়াই। আর এ লড়াইয়ের অংশ হিসেবে নতুন পেশা শুরু করছি। ভালো আয় নেই। কোনোমতো বেঁচে দিন কাটাচ্ছি। চাকরিজীবনের অবসরের টাকা পেলেও প্রতারণা কোম্পানি যুবক’র কাছে সব খুইয়েছেন তিনি।

পেশা পরিবর্তনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার লালবাগ, আজিমপুর, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুর, কাটাসুরসহ অনেক এলাকার ছোটখাটো দোকানের শাটার বন্ধ এবং পাশেই টাঙানো আছে দোকান ভাড়া হবে লেখা বিজ্ঞাপন।

লোকসানে পড়ে এসব দোকানি তার ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়- নিউমার্কেট, গাউছিয়াসহ অনেক মার্কেটে দোকান ভাড়ার সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে চোখে পড়ার মতো।

নিউমার্কেটে কাপড়ের দোকান অগ্রিম ৮ লাখ টাকা দিয়ে মাসিক ৫০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন দুই বন্ধু। তাদের একজন হাবিবের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, অগ্রিম টাকা বাদ দিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা নগদ পোশাক কেনা হয়। কিন্তু গত ৩ মাসে বসে দোকান ভাড়া গুনতে হয়েছে দেড় লাখ টাকা।

এর বাইরে কর্মচারীর বেতন দেয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। ফলে এখন এভাবে আরও বসে থাকা যাবে না বিধায় দোকান বিক্রির নোটিশ টানিয়ে দিয়েছি। ব্যবসা ছেড়ে এখন ভিন্ন পেশার চিন্তা করছি। পেশা পরিবর্তনের তালিকায় আছেন কামরাঙ্গীরচরের ঝাউচরের নিু আয়ের মানুষের মধ্যে প্রাইভেটকার চালক বেল্লাল হোসেন, ইস্রাফিল মিয়া, আবদুল মজিদসহ অনেকে।

চলতি বাজেটে কর্মহীন মানুষদের যা থাকছে : চলতি বাজেটে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবজনিত কারণে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি, কলকারখানা বন্ধ এবং সর্বোপুরি ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির থাকায় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

এডিবির (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ১৪ লাখ হতে পারে। সেখানে আরও বলা হয়, করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব কার্যকরভাবে মোকাবেলায় সরকার এ পর্যন্ত ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার সর্ববৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছে। এসব প্যাকেজের একটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সঞ্চারের মাধ্যমে সাময়িক কর্মহীনতা দূরীকরণ। কিন্তু এর বাইরে চলতি বাজেট কর্মহীন মানুষদের নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
সুত্র : যুগান্তর

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ