কার্যকর বিকল্পের জন্য প্রয়োজন মার্কসবাদ লেনিনবাদের আদর্শে দীক্ষিত সংগঠন

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২১

কার্যকর বিকল্পের জন্য প্রয়োজন মার্কসবাদ লেনিনবাদের আদর্শে দীক্ষিত সংগঠন

সুতপা বেদজ্ঞ

বর্তমান সময়ে দেশে সুবিধাবাদী, ব্যক্তিতুষ্টিবাদী, চাটুকারিতার ধারা সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়েছে। যাতে যুক্ত হয়েছে ধর্মান্ধতার মতান্ধবাদী প্রচার ও প্রকাশ। নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ-চেতনা, মানুষের অধিকার, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্ন নিয়ে রাজনৈতিকমহলে আলোচনা নেই বললেই চলে। রাষ্ট্রের সকল বিভাগ সরকার দলীয়করণের আওতায় নিয়ে এসেছে এবং প্রতিনিয়ত এ পরিস্থিতি মজবুত করার প্রক্রিয়া চলছে। জনকল্যাণ সরকারের প্রধান এজেন্ডা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। গত দু’দশক পূর্বেও সমাজের গতিপ্রকৃতির ধারা এতটা তোষণবাদী হয়ে ওঠেনি।

সময় পরিবর্তিত হয়েছে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ তার বিকাশের ক্ষেত্রে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। এ অবস্থায় বামপন্থিদেরও বাস্তবতার নিরিখে কৌশলী হতে হবে। একথা স্পষ্টত: বোঝা দরকার বামপন্থিদের প্রধান লড়াই মতাদর্শগত। আদর্শভিত্তিক আত্মপ্রত্যয়ী প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীবাহিনী ছাড়া এ লড়াই অগ্রসর করে নেয়া সম্ভব নয়। সৃষ্টিশীলতা মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের অন্তরবস্তু। নতুন নতুন উদ্ভাবন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ, সাথে সাথে মানুষের সম-অধিকার ও সম-সুযোগের প্রশ্ন অন্তরে ধারণ করতে না পারলে, মানুষের সমতা ও প্রাণ-প্রকৃতির মধ্যে ছন্দময়, সুখময় গভীর সম্পর্ক অনুধাবন করতে না পারলে যেমন বামপন্থি হওয়া যায় না তেমনি সংগঠনের বিস্তৃতি ও বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়।

সংগঠন শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। নতুন নতুন প্রাণের সঞ্চার ছাড়া সংগঠন বেঁচে থাকে না। কমিউনিস্টরা সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে বাস্তবতার নিরিখে। একথা স্বীকার করে নিলে কমিউনিস্টদের পার্টি সংগঠনের ব্যাপ্তি হতে হবে সমুদ্রের মত বিশাল, লোহার মত দৃঢ়।

বহুকাল ধরে বামপন্থিদের কেবল কর্মসূচিভিত্তিক গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরপাক খেতে দেখা যাচ্ছে। নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা খুব বেশি সফলতার মুখ দেখছে না। এর কারণ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সোজা-সাপ্টা পথে কোথাও কখনো বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। এই রাষ্ট্রে যারা কমিউনিস্ট পার্টি বা বামপন্থি কর্মধারার সাথে যুক্ত আছেন তারা এই সমাজেরই সচেতন প্রগতিশীল অংশ। দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুস্থ ও মানবিক ধারায় পরিচালনার দায়িত্ব ও কর্তব্য তাই এদের উপরই বর্তায়। বর্তমান ব্যবস্থায় সমাজের গতি-প্রকৃতিতে স্বাভাবিক অবস্থা না থাকায় কমিউনিস্টদের কর্তব্য নির্ধারণের ক্ষেত্রগুলি আরও গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দীর্ঘদিন যাবৎ গণতন্ত্রহীন থাকা ও কোনোক্ষেত্রেই জবাবদিহিতার চর্চা না থাকার যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন দলগুলি নির্মাণ করেছে তা এক জটিল পরিস্থিতির দিকে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও কী সাধারণ কী বিশেষ প্রায় সকল মানুষের মন ও মনন জড় বস্তুতে পরিণত হয়েছে বললে বোধকরি বাড়িয়ে বলা হবে না। জনজীবনের দুর্ভোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, ন্যূনতম নাগরিক সেবা না থাকা, সাধারণ মানুষের ন্যূনতম আয়-রোজগারের ব্যবস্থা না করে বরং ধনীদের আরও ধনী করার বিশেষ প্রণোদনা ও পলিসি, ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাট, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সকল কলকারখানা বন্ধের নীতি, উন্নয়নের নামে প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস কিছুই যেন মানুষের চেতনার জগতকে নাড়া দিতে পারছে না। ভোটের অধিকার নেই, ভাতের নিশ্চয়তা নেই, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ সাধারণ মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে।

এ ধরণের নিষ্ফলা সময়ে দুই ধরণের বিপরীত প্রবণতা বিকাশ লাভ করার সম্ভাবনা থাকে। ১. অদৃষ্টবাদিতা ও পরকালকেন্দ্রিক চিন্তায় আবিষ্ট থাকা- যা ধীরে ধীরে অনেকসময় ধর্মান্ধতা এমন কী জঙ্গিবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ২. চেতনা বা চৈতন্য জগৎ আঘাত প্রাপ্ত হয়ে নতুন করে জেগে ওঠে। ধর্মান্ধতা বিস্তার লাভ করে মানুষের কল্পনা, বিশ্বাস ও অদেখা বস্তুর প্রতি একধরণের ভাববাদী ভক্তি বা আকর্ষণ থেকে। কিন্তু চেতনার বিকাশের জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, শিল্প-সাহিত্য পঠন-পাঠন, মানুষের অন্তরজগৎ অনুধাবন করে সমাজ ও প্রকৃতি সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে হয়। ধর্মান্ধতায় যুক্তি-প্রমাণ অচল। ফলে ধর্মান্ধতার পথে পা বাড়ানো বা তাকে আঁকড়ে ধরে জীবন-যাপন যত সহজ চৈতন্য জাগ্রত করে মানুষের জন্য সমতার সমাজ গড়া ততটাই কঠিন। কমিউনিস্টদের এই কঠিন কাজটিই করতে হয়।

এই কঠিন কাজ সমাধা করতে একদিকে লৌহকঠিন প্রত্যয় প্রয়োজন, কর্মসূচি প্রয়োজন। সাথে সাথে প্রয়োজন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক সূত্র আত্মস্থ করে ব্যাখ্যা করতে পারার ক্ষমতা। এটাতো সাধারণ কথা। তাহলে সংকট কোথায়? আমাদের দেশের বামপন্থিরা লৌহকঠিন দৃঢ়তার কথা মুখে মুখে যতটা উচ্চারণ করে দ্বিতীয় কাজটি অর্থাৎ মার্কসবাদ-লেলিনবাদ বোঝার চেষ্টা ততটাই কম করে। শুধুমাত্র এককেন্দ্রিক অন্ধবিশ্বাস দিয়ে খুব বেশি অগ্রসর হওয়া বা টিকে থাকা যায় না বলে যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে তাদেরও ধর্মীয় গ্রন্থের নতুন নতুন ভার্সন তৈরি করে সমাজে টিকে থাকতে হয়। মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় তারা নিবিড় চর্চা অব্যহত রাখে। কিন্তু মার্কসবাদীরা নিজেদের বিজ্ঞানমনস্ক ও বস্তুবাদী বলে প্রচার করলেও বস্তুবাদের চর্চার ক্ষেত্রে অলসতা বা অনাগ্রহ দেখায়। অলসতা বা অনাগ্রহ সমাজের মধ্যে ক্ষতিকর প্রবণতা বিস্তারে স্পেস বা জায়গা করে দেয়। ধীরে ধীরে বস্তুবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এটাই রাজনীতির অংক। ‘শ্রেণি’ বুঝতে না পারলে যেমন ‘শ্রেণি শোষণ’ অনুভব করা যায় না ঠিক তেমনি ‘শ্রেণি শোষণ’ অনুভব করতে না পারলে শোষণমুক্তির সংগ্রাম জোরদার করা যায় না।

এ প্রশ্নটি কমিউনিস্টদের মধ্যে প্রায়শ: আলোচিত হতে দেখা যায় আন্দোলন-কর্মসূচির মধ্যদিয়ে সংগঠন মজবুত হবে না-কি মতাদর্শিক ভিত মজবুত করে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। আসলে দু’টোই সমানভাবে প্রয়োজন। কর্মসূচি ছাড়া যেমন সংগঠন ঝিমিয়ে পড়ে তেমনি মতাদর্শের মূলগত জ্ঞান অর্জন ও প্রচার ছাড়া সংগঠন শৃংখলাহীন, লক্ষ্যহীন, স্বপ্নহীন, প্রদর্শনবাদী অসাঢ় বস্তুতে পরিণত হয়।

এ সত্যটি আমাদের সামনে গত তিন দশক ধরে আরও প্রকটভাবে সামনে এসেছে। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থিদের সক্রিয়তা ও অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মত। কিন্তু সংগঠন শক্তিশালী না থাকায় আন্দোলনের কোন সুফলই বামপন্থিরা ঘরে তুলতে পারেনি। গণজাগরণ মঞ্চের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি পালা করে স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা সাথে করে ক্ষমতায় এসেছে। সমাজের মধ্যে চরম বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা স্থায়ী করেছে এবং করে চলেছে। নিজেদের স্বার্থে বৈষম্যপূর্ণ পুঁজিবাদী সমাজ টিকিয়ে রাখতে ধনীক-ব্যবসায়ী তোষণের নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নয়-ছয় হচ্ছে, ধর্মীয় গোষ্ঠীর অবাধ প্রচারণার সুযোগ সৃষ্টি করে ভিন্নধর্মাবলম্বী ও নৃগোষ্ঠীদের জীবন ও সম্পদ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আরও নানা কারণে দেশের মানুষ চরম দুর্ভোগে থাকা সত্ত্বেও ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। বামপন্থিদের বুঝতে হবে জনআকাঙ্ক্ষা শূন্য থেকে সৃষ্টি হয় না। তার জন্য প্রয়োজন হয় দৃশ্যমান শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। সকল বিপ্লবী পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও গত ত্রিশ বছরে একটি শক্তিশালী দৃশ্যমান বিকল্প হিসেবে বাম-প্রগতিশীলরা এদেশে জায়গা করে নিতে পারেনি, এটাই সত্য।

এ সত্যকে স্বীকার করে নিয়েই বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে আমাদের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন করা জরুরি কর্তব্য। গত ত্রিশ বছরে বামপন্থিরা কর্মসূচিতে যতটা সোচ্চার ছিলো ততটাই অমনোযোগী ছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে, পার্টির রণনীতি, রণকৌশল প্রচারের ক্ষেত্রে। জনজীবনের সংকট নিয়ে লাগাতার দাবি উথাপন করলেও বাম-প্রগতিশীলরা ক্ষমতায় গেলে কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যখাতে কী পরিবর্তন আসবে তা প্রচার ও প্রকাশের ধারা ছিলো ক্ষীণ। বছরের পর বছর শুধুমাত্র কর্মসূচির আবর্তে ঘুরপাক খেলে অর্থ ও শক্তি ক্ষয় হয়, মতাদর্শিক প্রচার দুর্বল হয়। হয়েছেও তাই। পার্টি সদস্যরা পঠন-পাঠনে মনোযোগী না হয়ে ইতিহাসের অতীতচারিতায় আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন। ইতিহাস আমাদের জানতে হবে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু ইতিহাসের হুবহু অনুকরণ কখনোই সম্ভব নয়। অতীত নেতৃত্ব ভালো ছিলো, অতীতে সবাই সক্রিয় ছিলো, এখন বেশিরভাগ নেতা নিষ্ক্রিয় এ ধরণের প্রচারণা হতাশার জন্ম দেয়।

সমাজতন্ত্র ছাড়া সর্বসাধারণের মুক্তি নেই, সাধারণ মেহনতি মানুষের কোনো ভবিষ্যত নেই, কোনো ভবিষ্যত হতে পারে না– এ বিশ্বাস দৃঢ় করতে হলে ন্যূনতম বিষয়ভিত্তিক রাজনৈতিক তত্ত্ব ও এর প্রয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অনিবার্য। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে হারিয়ে গেছে। এখনই বাংলাদেশে দৃশ্যমান বিকল্প শক্তি হিসেবে বাম-প্রগতিশীলরা শক্ত ভিতের ওপর পা রাখতে না পারলে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নগুলো সত্যিই হারিয়ে যাবে। লক্ষ্যে অবিচল থেকে বামপন্থিদের সংগঠন বিস্তৃত করার এখনই সময়। বামপন্থিরা যদি আগামী পাঁচ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয় তাতে দেশের বড় কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু আগামী চার-পাঁচ বছরকে টার্গেট করে সংগঠন বিস্তারের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতিশীল, ত্যাগী কর্মীবাহিনী তৈরি করে দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে না পারে তবে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে সাথে সাথে বামপন্থা বিকাশের সম্ভাবনাও আলোর মুখ দেখবে না।

বামপন্থিদের একথা অনুধাবন করার সময় এসেছে বর্তমান সময়ে কর্মসূচি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচল থেকে সংগঠনকে বা নিজেকে প্রদর্শন করা যায় কিন্তু তা মানুষের চৈতন্যকে সজাগ করতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। নিজেদের দৃশ্যমান শক্তি সামর্থ্য ও মতাদর্শ প্রচার করতে পারলে তবেই না সাধারণ মানুষ বামপন্থিদের আস্থায় নেবে। কাজেই সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে অবস্থার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের চর্চা জোরদার করে তা বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের দক্ষতাসম্পন্ন হাজার হাজার প্রতিশ্রুতিশীল ত্যাগী কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা এখন সময়ের কর্তব্য।

লেখক: সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ