খবর নেই বিএনপি জোটের

প্রকাশিত: ৮:১১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১

খবর নেই বিএনপি জোটের

একলা পথ হাঁটছে বিএনপি, ড. কামাল ও আ স ম রবের দলে বিভক্তি, ড. অলির জাতীয় মুক্তিমঞ্চ মৃত, জোটের শরিক দলগুলোও খণ্ডবিখণ্ড, একে অন্যকে দোষারোপ

মাহমুদ আজহার

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর একলা পথ হাঁটছে বিএনপি। প্রতিকূল পথে হাঁটা দলটি এখন ঘর গোছানোয় ব্যস্ত। দীর্ঘ দেড় বছর পর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন দলটির হাইকমান্ড। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকে নেতারা ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়েও নানা সমালোচনা করেন। অস্বস্তিতে দলের নীতিনির্ধারকরাও। এরই মধ্যে প্রলোভন বা চাপে পড়ে ২০-দলীয় জোটের কয়েকটি দল খন্ডবিখন্ড হয়েছে। বিভক্ত হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক শরিক দল। বিএনপির সঙ্গে এখন কারও নেই আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। অনেকটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে আপাতত ‘একলা চল’ নীতিতে দুই জোটের শরিক দলগুলোও। কার্যত বিগত নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই জোট এখন অনেকটাই ‘কাগুজে’।

ধারাবাহিক বৈঠকে বিএনপির তৃণমূল নেতারা বলছেন দুই জোটের বাইরে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলকে সামনের পথ হাঁটতে। ‘হায়ার’ করে এনে কারও নেতৃত্ব মানতে নারাজ তৃণমূল নেতারা। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রতিকূল এই সময়ে বৃহত্তর ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ডান-বাম, ছোট-বড়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সূত্রমতে, দুই জোটের পাশাপাশি সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোকেও ঐক্যবদ্ধ করে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠক করবে দলটি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা এখন দলীয় কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে দলের নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। এরপর আমরা ২০-দলীয় জোট বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, পেশাজীবী বা বিশিষ্টজনদের সঙ্গেও বসে মতামত নিতে পারি। তবে এটা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। বেশ কিছুদিন ধরে করোনা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে জোট ও ফ্রন্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। তার অর্থ এই নয় যে জোট-ফ্রন্ট নেই। আমরা জোট-ফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে আরও বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা করছি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ও জনগণের ভোটাধিকার আদায়ে সবাইকে নিয়ে আমরা যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই।’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্‌বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের কোনো বৈঠক হয়নি। বিএনপির ধারাবাহিক বৈঠকে নেতারা ঐক্যফ্রন্ট বিশেষ করে ড. কামালকে নিয়ে অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্টে অন্যতম দল বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী নেই। জেএসডির আ স ম রব ভাই তিন মাস ধরে দেশের বাইরে। এখন এটাকে আর সে অর্থে ঐক্যফ্রন্ট বলা যাবে কি না বুঝতে পারছি না। আমি মনে করি ঐক্যফ্রন্ট পুনর্গঠন করা উচিত। এখন সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। নির্বাচনের পর এ জোটের শরিকদের মধ্যে প্রথমে মনোমালিন্য, এরপর বিভক্তি দেখা দেয়। জোট থেকে বেরিয়ে যায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। ভাঙনে পড়ে আ স ম আবদুর রবের জেএসডি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। আ স ম রবের নেতৃত্বে জেএসডি এখন বিএনপির সঙ্গে থাকলেও আবদুল মালেক রতনের নেতৃত্বে জেএসডি একলাই পথ হাঁটছে। গণফোরামে টানাপোড়েন এখনো কাটেনি। বিভক্তির কারণে সম্মেলন না হওয়ায় দলটির এখনো কেন্দ্রীয় কমিটি করা যায়নি। দলটির কার্যক্রম স্থবিরপ্রায়।

এ প্রসঙ্গে গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। গণফোরাম সভাপতি ড. কামালের সঙ্গেও কোনো কথাবার্তা হয় না। আমরা এখন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সম্মেলন করছি। ৩৫টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন শেষে তৃণমূণ নেতাদের মতামত নিয়ে নেতৃত্বে নির্বাচন করব। অগঠনতান্ত্রিক কোনো নেতৃত্ব আমরা চাই না। সেখানে তৃণমূল নেতারা যদি চান ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বে থাকবেন। আর ঐক্যফ্রন্টেও আমরা থাকব কি না তা-ও নির্ধারণ করবেন তৃণমূল নেতারা।’

এদিকে ২০-দলীয় জোটের বর্তমান স্থবিরতা ও অস্তিত্ব সংকট নিয়ে শরিকদের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের একাধিক সদস্য জানান, খুব শিগগিরই জোট ও ফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। আগামী দিনে করণীয় বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়া হবে।

জানা যায়, ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে চরম অস্বস্তিতে বিএনপি। দলের বড় একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের যুক্তি, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দল জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে দেশে বিদেশে বিএনপির ভাবমূর্তি চরম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তবে বিএনপির ক্ষুদ্র একটি অংশ মনে করে এ মুহুর্তে জামায়াত ছাড়লে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ফায়দা লুটতে পারে। অস্বস্তিতে থাকা বিএনপির হাইকমান্ড এ ব্যাপারে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।

২০-দলীয় জোটকে পাশে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অভিমানে কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ গঠন করেন। এতে যোগ দেয় মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিও। কিন্তু কর্নেল অলির ওই জোটও এখন মৃতপ্রায়। তাদের নেই কোনো কার্যক্রম। ওই মঞ্চ গড়ে ওঠার পর ভাঙন ধরে ড. অলির এলডিপিতে। শাহাদাত হোসেন সেলিমের নেতৃত্বে নতুন এলডিপি গঠিত হয়। অন্যদিকে কল্যাণ পার্টি না ভাঙলেও কেউ কেউ দলত্যাগ করেন।

২০ দলের অস্তিত্ব আছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, ‘জোট আছে জোট নেই। জোট আছে এ অর্থে যে আমাকে গণমাধ্যমে লেখা হয় ২০-দলীয় জোটের নেতা। আবার জোট নেই এ অর্থে বলব যে কর্মেই মানুষের পরিচয়। কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর জোটের কোনো কার্যক্রম নেই। তাই এর অস্তিত্ব নেই। বিএনপি এখন নিজেদের মধ্যে বৈঠক-শলাপরামর্শ করছে।’ জাতীয় মুক্তিমঞ্চ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সৈয়দ ইবরাহিম বলেন, ‘এটা এখন মৃত। জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না।’

জানা যায়, ২০-দলীয় জোটের শরিক দল মাওলানা আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। দলের চেয়ারম্যান সিলেট থাকেন। মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসেন, পাওয়া যায় দু-একটি বিবৃতি। মতবিরোধে জোটের সব কর্মসূচি ও সভা থেকে বিরত থাকছে মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। জোটের আরেক শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও দুই ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল সভাপতি এ এইচ এম কামরুজ্জামান খান মারা যাওয়ার পর এ দলও এখন প্রায় অস্তিত্বহীন। সাইফুদ্দিন আহমেদ মণির ডেমোক্রেটিক লীগ-ডিএল এক নেতার এক দলে পরিণত হয়েছে। প্রয়াত শফিউল আলম প্রধানের জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপাও এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে প্রধানের কন্যা ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, অন্যদিকে খন্দকার লুৎফর রহমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাঈদ আহমেদ দেশেই নেই। রিটা রহমানের নেতৃত্বাধীন পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশও বিএনপিতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

‘ওয়ান ম্যান শো’ দলের সঙ্গে জোট করে লাভ হবে না : ‘ওয়ান ম্যান শো দলগুলোর সঙ্গে জোট করে কোনো লাভ হবে না। বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা প্রস্তুত, রাজধানী ঢাকা প্রস্তুত করে বিএনপিকে এককভাবে আন্দোলনের ডাক দিতে হবে।’ ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ধারাবাহিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের দ্বিতীয় দফার শেষ দিনে গতকাল সাংগঠনিক বিভাগ রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রীয় সদস্য, জেলা ও মহানগরের সভাপতিরা এ মত দেন।

বৈঠকসূত্রে জানা যায়, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবি আদায়ে সবাই আন্দোলনের কথা বলেছেন। নেতারা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। গেলে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মতো একই ধরনের নির্বাচন হবে।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিকাল পৌনে ৪টায় এ বৈঠক শুরু হয়। এতে স্কাইপিতে সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঞ্চে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ