গল্পে ও স্মৃতিতে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তালেব…

প্রকাশিত: ৯:৪৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২১

গল্পে ও স্মৃতিতে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তালেব…

আবদুস শহীদ

বাঙালির স্বপ্নভঙ্গের ক্ষোভ-বিক্ষোভে জন্ম নেয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তির স্রোতোধারা পূর্ববাংলার ঘরে ঘরে। ২৫ মার্চের পর থেকে উত্তাল সারা দেশ। ২৭ মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১১ সদস্যের একটি দল সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে স্থানীয় সার্কিট হাউসে অবস্থান নেয়। ২৮ মার্চ সকালে শহরের পুরোনো কলেজের সামনে থেকে ছাত্রজনতার প্রতিবাদী মিছিল এগোতে থাকে সার্কিট হাউসের দিকে। মিছিল কিছু দূর এগোতেই সার্কিট হাউসে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ শুরু করে।

মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। শহরের মুক্তিকামী ছাত্রজনতা শুরু করে প্রতিরোধ যুদ্ধ। খবর পেয়ে সীমান্ত এলাকা থেকে ছুটে আসেন তৎকালীন ইপিআর সদস্যরা। সঙ্গে পুলিশ, আনসার, মুজাহিদও অস্ত্রসহ ছাত্রজনতার সঙ্গে যোগ দেন। আনসার সদস্য আবুল হোসেন যুদ্ধরত অবস্থায় শাহাদত বরণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ওই দিন রাতেই ভীষণ ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে পালানোর চেষ্টা করে।

তাদের ধাওয়া করতে গিয়ে এক ইপিআর সদস্য শাহাদত বরণ করেন। এক পাকিস্তানি সেনা গুলিবিদ্ধ হলে তাকে বন্দী করা হয়। পরে সে মারা যায়। শহরের সব কার্যক্রম সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে।

পরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় ভারতের মেঘালয়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্রলীগের কর্মী তালেব আহমদসহ ছাত্র ইউনিয়নের অনেকেই যুদ্ধে যোগ দিতে মেঘালয়ের ভালাটে চলে যান এবং প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

সুনামগঞ্জের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম তালেব উদ্দিন আহমদ। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার হাতিয়া গ্রামে জন্ম নেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালেব উদ্দিন আহমদ। ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময় আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। মিছিল-মিটিংয়ে সুনামগঞ্জ তথা সারা বাংলাদেশ তোলপাড়। মিছিলের পর মিছিল, স্লোগানের পর স্লোগান। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা বেপরোয়া। ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পুলিশ তুমি যতই মার, বেতন তোমার এক শ বারো’—এমন স্লোগানে তখন চারপাশ মুখরিত। আসলে পুলিশের বেতন ঠিক কত ছিল, তা আমাদের জানা না থাকলেও স্লোগানের ছন্দ মেলানো চাই। তখন ছাত্রলীগের উদ্যম থাকলেও সুনামগঞ্জের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো ছিল সবচেয়ে সোচ্চার। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রলীগ খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল না। সত্তরেই আমার কলেজজীবন শুরু। ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষ। হাইস্কুলের মতো বইয়ের বোঝা বহন করতে হয় না। শুধু একটা খাতা-কলম হাতে থাকলেই যেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। খাতাটা সাইকেলের ক্যারিয়ারে রেখে কেমন একটা ফুটানি ভাব নিয়ে কলেজ যেতাম। মাঝেমধ্যে সাইকেলটা হয়ে যেত হাওয়াই গাড়ি। উদ্দাম গতিতে ছুটে চলা। মাঝেমধ্যে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মিছিলে যোগ দান ছিল নিত্যকার ব্যাপার। মহান মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ কলেজের মুক্তিকামী ছাত্রদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে।
তালেব আহমদ তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তুখোড় নেতা। জয়বাংলার একনিষ্ঠ কর্মী; মিছিলের অগ্রভাগের বজ্রকণ্ঠ। মিছিল শেষে স্থানীয় পুরাতন কলেজে কর্মিসভা, কখনো মধ্য বাজারের আওয়ামী লীগ নেতা আফাজ উদ্দিনের গুদাম ঘরে কর্মিসভা। সভা শেষে পোস্টার লেখা। নীল কালি আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কলম বানিয়ে তালেব একাই পোস্টার লেখার কাজ করতেন। লাল-সবুজের পতাকায় মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তালেব আহমদ যৌবনেই। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে বঙ্গবন্ধুর ডাকে জড়িয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে। যৌবনের সোনালি দিনগুলো বিলিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তাঁর মতো অনেকের আত্মদানে আমরা আজ মুক্ত দেশ, মুক্ত চিন্তা, লাল-সবুজের পতাকা পেয়েছি। মুক্তিকামী শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের প্রতিটি পরতে যেন লেখা হয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যেই স্বাধীনতার বীজ লুকিয়ে। তাই তাঁদের চলনে-বলনে এটাই প্রমাণিত হতো।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনর পুরোধা মাস্টারদা সূর্য সেন তাঁর মৃত্যুর আগে বলতেন, ‘মৃত্যু আমার দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে আমি তোমাদের জন্য কী রেখে যাব।’ বিপ্লবীরা বোধ হয় জীবনকে এভাবেই উপলব্ধি করতেন।
তালেব আহমদকে দেখেছি সর্বদাই একটা উদ্‌ভ্রান্ত ভাব নিয়ে ঘুরতেন। চলাফেরায় ওঠাবসায় একটা অনিশ্চয়তা। উসকো-খুসকো চুল, জীর্ণ শরীরে রিংকল সার্টের আচ্ছাদন; পেন্টও তেমনই, পায়ে পঞ্চের স্যান্ডেল। একটা উদাস ভাব। কিন্তু বক্তৃতার বেলায় একদম উল্টো। একজন পাকাপোক্ত রাজনীতিবিদ তখন। সুনামগঞ্জের জনৈক আওয়ামী লীগ নেতা নাকি কোন জনসভায় উদ্বোধনী বক্তা হিসেবে তালেব আহমদকেই প্রাধান্য দিতেন। এমন ছাত্রনেতার সবার আগেই যুদ্ধে যাওয়ার কথা। তালেব করেছেনও তাই। যে ছাত্রনেতা মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন, তাঁর তো অগ্রসৈনিক হওয়ারই কথা। কবি বলেছেন, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়া তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ তালেব আহমদের সময়টা এমনই ছিল।

একাত্তরের আগস্ট মাস; দেশে টালমাটাল বর্ষা। চারদিকে যুদ্ধ, আর যুদ্ধ। রাত হলেই ভারী মর্টার আর গ্রেনেডের শব্দ শোনা যায়। বিকট শব্দে সিলেট-সুনামগঞ্জ রাস্তার কোন একটা ব্রিজ যেন উড়িয়ে দিল মুক্তিযোদ্ধারা। গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থ বাড়িতে শুরু হলো ডাকাতি। রাজাকার আর স্থানীয় ডাকাত মিলে নিরীহ গ্রামবাসীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যেত। এমনই এক পরিস্থিতিতে আমিও গ্রামছাড়া হলাম।

দুজন সঙ্গী নিয়ে আমিও পাড়ি জমালাম পাশের দেশের ভালাট সীমান্তে। তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেছে। ভালাট আর মৈলাম শরণার্থী ক্যাম্পে কিছুদিন কাটিয়েছি। মনে সর্বদা কোনো সুহৃদ মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাতের প্রত্যাশায় ছিল। ভালাটের বাজারে গড়ে ওঠা উপজাতিদের কিছু চায়ের দোকানের একমাত্র ক্রেতা উদ্বাস্তু শরণার্থীরা।

বাঁশের তৈরি বেঞ্চ আর তক্তা বিছিয়ে টেবিল, শাল পাতার ছাউনিতে সাজানো হয়েছে ভ্রাম্যমাণ এসব চায়ের স্টল। চায়ের সঙ্গে টোস্ট বিস্কুট আর ধুমপায়ীদের জন্য চারমিনার সিগারেট। আড্ডা চলত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। একদিন কয়েকজন মিলে চায়ের আড্ডায় বসেছি, হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন আমার নাম ধরে ডাকছে শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি তালেব আহমদ। সঙ্গে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। সবার কাঁধে ঝোলানো স্টেনগান। তালেব খুবই স্বাভাবিকভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন সেক্টরে যুদ্ধ করছি। আমার নেতিবাচক জবাব শুনে মনে হলো তালেব কিছু মর্মাহত হয়েছেন। একসঙ্গে বসে কাটিয়েছি অনেকক্ষণ। আলাপের অধিকাংশ সময়ই ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক। এটাই ছিল তালেব আহমদের সঙ্গে শেষ দেখা।
পূর্ব বাংলার প্রতিটি রণাঙ্গনে তুমুল যুদ্ধ চলছে। ইতিপূর্বে ভারতীয় মিত্রবাহিনী পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আহ্বান করেছে। প্রতি দিনের সূর্যোদয়ে নতুন সাফল্যের খবর আসছে। হঠাৎ একদিন এক দুঃসংবাদে বাকরুদ্ধ হলাম। শুনলাম, তালেব আহমদ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন। টেকেরঘাট সীমান্তের মঙ্গলকাটা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সামনাসামনি যুদ্ধে তাঁর গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়। যুদ্ধের উন্মাদনায় হয়তো বেপরোয়া হয়েছিলেন তালেব আহমদ। ভাব বুঝে অন্য যোদ্ধারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তালেব ধরা পড়েন।

জানতে পেরেছি, জুবেলী হাইস্কুল মাঠে জনসম্মুখে তালেব আহমদকে নির্মমভাবে প্রহার করেছে পাকিস্তানি বাহিনী। তবুও তালেবের মুখ থেকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি উচ্চারণ করাতে পারেনি তারা। তারপর পিঠমোড়া করে বেঁধে শহর প্রদক্ষিণ করিয়েছে। সদা হাস্যোজ্জ্বল তালেবের চোয়াল বেয়ে নামা রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শহরের রাজপথ। সঙ্গে দালালেরাও হিংস্রতায় মেতে উঠেছে। পরে শহরের পিটিআই স্কুলে বন্দী রেখে নজিরবিহীন অত্যাচার চালায়। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা থেকে রক্ষা পেতে তারা এক ফন্দি আঁটে। স্থানীয় জনতাকে জোর করে পাবলিক বাসের ছাদে উঠিয়ে পাকিস্তানি সেনারা তালেব আহমদসহ বাসের ভেতরে উঠে বসে। পরে শহরের অদূরে আহছানমারায় তালেবকে হত্যা করে লাশ কালনি নদীতে ফেলে দেয়। সঙ্গে থাকা আরও দুই মুক্তিযোদ্ধাকেও হত্যা করে। আহছানমারা সেতুর দক্ষিণে তালেব আহমদ ও আরও দুজন মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে তৈরি করা করা হয়েছে ‘স্মৃতি ভাস্কর্য’। যুগের পর যুগ শহীদ তালেবের স্মৃতি জাগ্রত থাকবে মুক্তিকামী মানুষের মনে।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
     12
24252627282930
31      
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ