“গোয়াইনঘাট সালুটিকর রোড শব্দ দূষণের স্বর্গরাজ্য, আচমকা হর্ণে ছোট ছোট বাচ্চাদের এলোপাতাড়ি দৌড়”

প্রকাশিত: ১:১৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২০

“গোয়াইনঘাট সালুটিকর রোড শব্দ দূষণের স্বর্গরাজ্য, আচমকা হর্ণে ছোট ছোট বাচ্চাদের এলোপাতাড়ি দৌড়”

সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা গোয়াইনঘাটঃ গোয়াইনঘাট উপজেলা পাথর কোয়ারী ও পর্যটন স্পট হওয়াতে সালুটিকর হাদারপার বাজার রাস্তা যানবাহন চলাচলের অত্যান্ত ব্যস্ততম ও জন গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়ক। কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী বন্ধ হওয়াতে সালুটিকর টু হাদারপার রাস্তায় হাইড্রোলিক ট্রাক চলাচল বেড়েছে আরো তিনগিন।বিধায় যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে হাইড্রোলিক হর্নের, মানা হচ্ছে না কোন বিধি-বিধান। জনগুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তাটি গ্রাম কেন্দ্রিক হওয়াতে বেশিরভাগ গ্রামের ভেতর দিয়েই যাতায়াত করেছে। প্রধান সড়কের দু’পাশে আছে অনেক স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি হাসপাতাল, যাত্রী ছাউনী ও গাড়ির স্টপিজ। শব্দদূষণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন মানুষজন। পর্যটন স্পট হওয়াতে মাইকের সাউন্ড সাউন্ড বক্স মিউজিকের শব্দে, শব্দ দূষণের মাত্রা আরও বেড়েছে। এই প্রধান সড়ক থেকে পাথরবোঝাই ট্রাক গুলির চলে অস্কার বিজয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কে যাবে কার আগে, তাই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে চলে হর্ন বাজানো। অনেক ড্রাইভারকে দেখা যায় ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে তামাশা করেও হর্ণ বাজান। এইসব যানবাহনের আচমকা হর্ণের শব্দে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, ছোট ছোট বাচ্চারা, এমনকি গবাদি পশুরা দেয় এলোপাতাড়ি দৌড়।তাই অনেক সময় ঘটে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা। রোগীর গাড়ি সামনে থাকলেও তাদের কিছু যায় আসে না, এ নিয়ে কয়েকবার ঝগড়াঝাঁটি ও হাতাহাতিও হয়েছে। তাতেও কোনো প্রতিকার মিলছে না শব্দ দূষণ একটি নীরব ঘাতক। শহর, নগর, গ্রাম সর্বত্র মানুষ শিকার হচ্ছে এই শব্দ দূষণের। শব্দ দূষণে স্বাভাবিক জনজীবন যেমন অতিষ্ট, তেমনি এ থেকে নানা রোগের জন্ম হচ্ছে মানবদেহে। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে। আইনে শাস্তির বিধানও আছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ নেই। আইনে যানবাহনে ইলেকট্রনিক হর্ন বাজানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও অহরহ ব্যবহৃত হচ্ছে হাইড্রোলিক হর্ন। ১৯৯৭ সালে প্রণীত পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিমালায় নীরব এলাকায় দিনে এবং রাতে যথাক্রমে ৪০ ও ৩৫ ডেসিবেল হচ্ছে শব্দের ধার্য্যকৃত সীমা বা মাত্রা। আবাসিক এলাকায় এর মাত্রা ৫০ এবং ৪০ ডেসিবেল। কিন্তু এই আইন মানছে না কেউই। শব্দ দূষণের জন্য প্রথমত দায়ী যানবাহনের হর্ন। তারপরে রয়েছে- উচ্চ শব্দের মিউজিক, হুইসেল, কলকারখানার আওয়াজ পাথর ভাঙ্গার যন্ত্রের শব্দ, মিক্সার মেশিনের শব্দ ইত্যাদি। বাস-ট্রাকসহ লক্কর-ঝক্কর মার্কা যানবাহনের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ, মাইকের আওয়াজও সৃষ্টি করছে শব্দ দূষণ। যানবাহনের চালকেরা উচ্চমাত্রায় হর্ন বাজানোকে ‘বিলাসিতা’ হিসেবে মনে করে। পথে যানজটে আটকাপড়েও তারা অনবরত হর্ন বাজিয়ে চলে। তাছাড়া চলতি পথে অনেক চালক বিনা প্রয়োজনে হর্ন বাজায়। মানুষের জন্য সহনীয় শব্দের মাত্রা হচ্ছে ৩৫ থেকে ৫০ ডেসিবেল। আর যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্নের আওয়াজ এই মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। শব্দ দূষণ থেকে মানবদেহে অনেক রোগব্যাধি জন্ম হচ্ছে। অথচ শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার যেমন ব্যর্থ, তেমনি মানুষের মধ্যেও এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে না। মানুষের হার্ট, কিডনী এবং মস্তিষ্কের ওপর দারুণ ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে উচ্চ মাত্রার শব্দ। কানে কম শোনা, গ্যাস্টিক, ডায়াবেটিসের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চ মাত্রার শব্দ। শব্দ দূষণের ফলে নগরবাসী ৯টি মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যেমন-হঠাৎ উচ্চ শব্দ কানের পর্দায় আঘাত করলে তার প্রভাবে হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তনালী সংকোচিত হয়ে আস্তে আস্তে চোখের মণি প্রসারিত হয়। পাকস্থলী, খাদ্যনালী ও শরীরে খিচুনীও দেখা দিতে পারে। মানসিক অস্থিরতা এবং ¯œায়ুবিক উত্তেজনাও বাড়ে। ফলে শারীরিক দুর্বলতা, বিরক্তি, ক্রোধ, উদ্বিগ্নতা, হতাশা, টেনশন, উত্তেজনা, অবসাদসহ নানারকম মানসিক রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে রয়েছে, বদহজম, পেপটিক আলসার, মেরুদন্ড বেঁকে যাওয়া, হাঁড় ফেটে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধির আশঙ্কা। সবচেয়ে বড় কথা, শব্দ যে কোনো সময় মস্তিষ্কে আঘাত করতে পারে। শব্দ দূষণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ বিষয়। এর কারণে এদেশের লাখ লাখ মানুষ বধিরতা থেকে শুরু করে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াসহ বেশ কিছু মারাত্মক রোগের শিকার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তিন বছরের কম বয়সের শিশু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে একশ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ শুনে তাহলে সে শ্রবণ ক্ষমতা হারাতে পারে। গর্ভবতী মায়ের জন্য শব্দ দূষণ মারাত্মক ক্ষতিকর। দেখা গেছে, বড় বিমান বন্দরের আশেপাশে বসবাসকারী গর্ভবতী মায়েরা অন্যান্য স্থানে অবস্থানকারী মায়েদের তুলনায় অধিক সংখ্যক পঙ্গু, বিকৃত ও অপরিণত শিশু জন্ম দিচ্ছে। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথমেই দরকার মানুষের সচেতনতা-কান্ডজ্ঞান। যারা শব্দ দূষণ সৃষ্টি করছে তাদেরকে এ ব্যাপারটি উপলব্ধি করতে হবে যে, তাদের সৃষ্ট শব্দ দূষণে পরিবেশে শান্তি বিঘিœত হচ্ছে, মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এটা উপলব্ধি করে নিজে থেকেই শব্দ দূষণ থেকে বিরত থাকা উচিত। তাছাড়া, এ সংক্রান্ত আইনেরও যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। আইনে রয়েছে- মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ আশপাশ এলাকায় যানবাহনের হর্ন বাজানো যাবে না। আবাসিক এলাকায় ইট-পাথর ভাঙ্গার মেশিন ব্যবহার-আবাসিক ভবন থেকে পাঁচশ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আবাসিক এলাকায় মিক্সার মেশিনসহ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য মেশিন সন্ধ্যে সাতটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাছাড়া এ ধরনের নির্মাণ কাজ শুরুর আগে এলাকার হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আদালতের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ নেই। শব্দ দূষণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শাস্তি হওয়ার ঘটনা এ দেশে ঘটেনি বললেই চলে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে শব্দ দূষণে শাস্তির মাত্রাও বাড়ানো যায় কি না সেটাও চিন্তা ভাবনা করা উচিত। শব্দ দূষণের জন্য দায়ী উৎসগুলোও বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। এলাকাবাসী শব্দ দূষণ রোধে উপজেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছেন।

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ