“গ্লোবাইজেশনের যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহারে কিশোর কিশোরীর নৈতিক অবক্ষয়, নেই কারো দায়বদ্ধতা”

প্রকাশিত: ৪:০৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০

“গ্লোবাইজেশনের যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহারে কিশোর কিশোরীর নৈতিক অবক্ষয়, নেই কারো দায়বদ্ধতা”
সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা গোয়াইনঘাটঃ
বর্তমান সময়ে চোখ বোলানো আকর্ষণীয় কুরুচিপূর্ণ অশালীন ভাষার সমারোহ আর সংমিশ্রণে তৈরি টিকটক ভিডিও, ফান ভিডিও, কাটপিস ভিডিও, অর্ধ নগ্ন বিজ্ঞাপন, সিনেমা, নাটক, সট ফিলিম, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিভিন্ন ভিডিও সহ কিশোর-কিশোরী আর যুব সমাজের অবস্থা আজ পালহীন নৌকার মতো।তা কেন? এ নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যুব সমাজের অধঃপতনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই একটা কথা বলে রাখা ভালো, দেশের সব কিশোর কিশোরী যুবক-যুবতীই যে অতলে তলিয়ে যাচ্ছে এমন নয়, তবে সে পথ ধরে চলার সংখ্যাই বেশি। তাই যুব সমাজের মধ্যে অধঃপতন ঘটছে বলে ধরে নিতে হবে। স্বাধীনতার পর বৈচিত্র্যে ভরা এ দেশ একটি শক্তিশালী, সুস্থ সংস্কৃতিসম্পন্ন দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। পশ্চিমা ও আকাশ সংস্কৃতির প্রতি যুব সমাজ আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ওদের সবকিছুই তারা অন্ধভাবে অনুকরণ করছে, যা আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। পশ্চিমা অপসংস্কৃতি আমদানি করতে অবশ্য ঠিকাদারের ভূমিকা নিয়েছে একশ্রেণির ইলেকট্রনিক মিডিয়া। দেশে এসব প্রচার মাধ্যমের দাপট বেশি। তাই শিক্ষিত অসচেতন যুবক-যুবতীর পক্ষে ভালমন্দ বিচার-বিবেচনা করাটা কঠিন ব্যাপার। তারা যা চোখের সামনে দেখে সেটাকেই ঠিক বলে ধরে নিচ্ছে। এদিকে বিত্তবান ও উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের যুবক-যুবতীরা নিজেদের লাইফ স্টাইল অন্যদের থেকে আলাদা দেখাতে গিয়ে বিদেশি সংস্কৃতিকে আকড়ে ধরছে। নিজেদের অত্যাধুনিক ভাবলেও আসলে এটা তাদের অজ্ঞতা। সাধারণ অর্থে শিক্ষিত হলেও যারা সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত নয়, তারাই এভাবে নিজেদের ও দেশের সর্বনাশ ডেকে আনছে।
যুব সমাজের শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং দুর্বৃত্তায়ন প্রবেশ করার পর থেকেই বলা যায় যুব সমাজের উপর খাড়া নেমে এসেছে। শাসন ব্যবস্থা, একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি আমলার আচরণ যুব সমাজের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। নিজেদের স্বার্থে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা যুবক-যুবতীদের ব্যবহার করছেন। সেসব নেতার কথা ও কাজে আকাশ-পাতাল তফাৎ দেখা দেওয়ায় প্রতারিত হচ্ছে যুবক-যুবতীরা। দেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বেকার বাড়ছে। দীর্ঘ করোনায় হ্রাস পেয়েছে কর্মসংস্থান। যুব সমাজের জন্য সুসংহত কোনো নীতিও গ্রহণ করা হচ্ছে না। খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, পড়াশোনার ক্ষেত্রে সরকারের সুনজর বাড়াতে হবে। মুখে অনেক কিছু বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে প্রতিফলন খুবই সামান্য। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, এক শ্রেণির যুবক-যুবতী অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য হওয়া সত্তে¡ও চাকরি পাচ্ছে, নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। যোগ্যরা হচ্ছে বঞ্চিত। অবহেলিত হচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলের যুবক-যুবতীরা। এ অসম আচরণ যুব সমাজের মধ্যে শুধু হতাশারই জন্ম দেয়নি, জন্ম দিয়েছে হিংসারও। বিভিন্ন এলাকা ও রাজনীতির নামে যুব সমাজের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়। বর্তমান যুব সমাজের উন্মাদনার নেতিবাচক দিকটা তুলে ধরলে যা দেখা যাবে, তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। এটা একটা স্বাধীন দেশের জন্য মোটেই কাম্য নয়।
যুব সমাজকে বিপথে পরিচালিত করার জন্য আকাশসংস্কৃতির রগরগে ছবি, পর্নোগ্রাফি, দেশের শাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা যতটুকু দায়ী, ততটুকুই দায়ী যুবক-যুবতীদের অভিভাবকগণ। গোটা দেশের কথা বাদ দিয়ে যদি বিভিন্ন শহরের বর্তমান যুব সমাজের উন্মাদনার দিকগুলো তুলে ধরা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, সে চিত্রটা আমাদের ভাবিয়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য যে যুবক-যুবতী প্রাণ দিয়েছিল তারা আজ এমন বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে তা ভেবে অবাক হতে হয়। ভাষা আন্দোলনের পিছনে যুব সমাজের অবদানের কথা বর্তমান প্রজন্মের যুব সমাজ জানে না। সেটা লজ্জার ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাকে যেমনি গোটা দেশের যুব সমাজ বিভেদ ভুলে এক ছাতার নিচে এসেছিল, তেমনি ভাষা আন্দোলনও যুব সমাজকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিল। পরিতাপের বিষয় যুব সমাজ আন্দোলনের ব্যাপারটি ভুলে গেছে। এখানে হাজারো সমস্যা থাকা সত্তে¡ও সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। ঢালাও ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যম এ কাজকে আরো সহজ করে দিয়েছে। সাধারণত খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতিতে যুব সমাজ অগ্রণী ভূমিকা নেয়। যদি বলা হয় যে, আমাদের যুব সমাজ শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত থাকছে না, তাহলে ভুল বলা হবে। যুব সমাজ অবশ্যই শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত থাকছে, তবে সেটা সুস্থ নয়। অসুস্থ সংস্কৃতির ছাপ থাকা সত্তে¡ও যুব সমাজ বেশি করে আগ্রহ দেখাচ্ছে আমদানিকৃত সংস্কৃতির দিকে। এটাকেই একশ্রেণির যুবক-যুবতী সঠিক সংস্কৃতি বলেই ধরে নিচ্ছে এবং সুস্থ মার্জিত সংস্কৃতি ইচ্ছা করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ করতে গিয়ে সীমানা যে অতিক্রম করা হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল করার কথা তাদের মগজে আসছে না। ধূমপান, মদ্যপান, নীলছবি, চটুলগান, পর্নোগ্রাফি আজকের যুব সমাজের উপভোগের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
লক্ষ্যনীয়, বিভিন্ন শহরের সিনেমা হলগুলোতে অ্যাডাল্ট ছবি চললে দর্শকের অভাব হয় না। এসব ছবি যারা দেখে তাদের বেশিরভাগ যুবক। পর্নো বই কিনে পড়ার মতো যুবক-যুবতী পাঠকের অভাব নেই। চটুল গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অস্বাভাবিকভাবে অশালীন পোশাক গায়ে দিয়ে কোমর দুলিয়ে নেচে বেড়ানো স্বাভাবিক চেহারা নিচ্ছে। যে যুব সমাজকে দেশের স্বাধীনতার এত বছর পর বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সে যুব সমাজ আজ রগরগে ছবি দেখার জন্য সিনেমা হলে টিকেট নিয়ে মারামারি করে। এটা একটা স্বাধীন দেশের দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী হতে পারে? আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে থাকলেও তা এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও পুঁজিবাদীদের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশি অপসংস্কৃতি আমদানি, ক্যাবল চ্যানেলের ব্যাপক প্রসার, প্রকাশ্যে নীল ছবি প্রদর্শন, পর্নো বই বিক্রি বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর হতে হবে। যুব সমাজের উন্নয়নে সরকার প্রচুর টাকা বরাদ্দ করলেও তা চেটে চুষে খাচ্ছে সরকারি আমলা এবং একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা।
প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাস বাংলাদেশ। প্রশ্ন জাগে, দেশের যুব সমাজ কি এতটাই অথর্ব হয়ে পড়েছে? সিনেমা দেখা, গান শোনা, পর্নোগ্রাফি পড়া, স্কুল-কলেজের সামনে, রাস্তার মোড়ে কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা দেওয়াসহ ইভটিজিং বেশি পছন্দ করছে। বলা যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদর্শহীন যুবক-যুযবতীরা নিজেদের মতো করে চলতে গিয়েই অবক্ষয় ডেকে নিয়ে আসছে। এ জন্য অভিভাবরাও কম দায়ী নন। অভিভাবকদের আস্কারা এবং অনুসরণ করে যুবক যুবতীর একটি অংশ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়তে সাহস পাচ্ছে। যে সব যুবক-যুবতী এক সময় উচ্ছৃঙ্খলতায় ব্যস্ত থাকতো, দেখা যায়, তাদের সন্তানরাই এখন অপকর্মে লিপ্ত। আর আজ যারা অপকর্মে লিপ্ত তাদের সন্তানরাই যে ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভয়ানক কিছু হবে সেটাই স্বাভাবিক।
অভিভাবকরা সন্তানদের যথার্থ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে ব্যর্থ।
সেখানে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু সে রাস্তা আজ প্রায় বন্ধ। সমাজের মেরুদন্ড হিসেবে বর্ণিত শিক্ষকরা শিক্ষাদান করবেন, জ্ঞানের আলো জ্বালাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ তারা কি যথার্থভাবে সে কাজ করতে পারছেন? উত্তর আসবে, না। কারণ শিক্ষকদের একটি অংশও নানা করণে নৈতিক দায়িত্ব থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। বর্তমান নিয়োগ পদ্ধতিতে অনেক অযোগ্য লোক যেখানে শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন, সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা ও ছাত্র সমাজের অধঃপতন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। বলা বাহুল্য, ছাত্ররা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্কুল-কলেজে মারদাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি, শিক্ষকদের অশ্রদ্ধা করা, সাথীদের সঙ্গে দুষ্কর্ম করতে সাহস পাচ্ছে। আজ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের তান্ডবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে ক্ষতিটা হচ্ছে কার? সর্বক্ষেত্রে যুব সমাজের লাগামহীন উন্মাদনা এক অবক্ষয়ে ভরা সমাজেরই জন্ম দিচ্ছে। দুঃখের কথা, আজ যদি এ যুব সমাজই অন্যায় অত্যাচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত তাহলে সঠিক অর্থেই এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হতো। যুব সমাজ আজ যে অবক্ষয়ের পথ ধরে এগিয়ে চলছে তা অব্যাহত থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ যে কি হবে সে কথা বলা সত্যিই কঠিন।
পরিশেষে বলতে চাই এ নিয়ে শুধু সরকারকে দায়ী করলেই চলবে না। আমরা যারা সচেতন সমাজ শিক্ষাবিদ রাজনীতিবিদ অভিভাবক কোনভাবেই এই দায় এড়িয়ে যেতে পারবো না। সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই সু-সন্তান সন্তনী গঠনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।রাখতে হবে নজরদারি। সরকারের একার পক্ষে এই বিশাল যুব সমাজের অবক্ষয় রোধ সম্ভব না। সরকারকে সময়পোযোগী আইন গঠন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ