ঘুম একটা বিশেষ যোগব্যায়াম

প্রকাশিত: ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৯

ঘুম একটা বিশেষ যোগব্যায়াম

অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত :; প্রবাদ বাক্য আছে, ‘আহার, নিদ্রা, ভয়, যা করে তাই হয়’। যদিও প্রচলিত ভাষায় বলা হয়ে থাকে সব প্রবাদ বাক্যই, পরিপূর্ণ সত্য নয়, অর্ধসত্য। কিন্তু উপরের প্রবাদটি সত্যিই শতভাগ সত্য। মানুষ তার খাদ্যাভ্যাস বা খাদ্যের পরিমাণ ইচ্ছা করলেই বাড়াতেও পারে এবং কমাতেও পারে। মহামানবরা যখন ইচ্ছাশক্তি দিয়েই কাম, ক্রোধ ও লোভ দমন করতে পারে, তখন মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অবশ্যই খাদ্যের পরিমাণ কমাতে পারে। স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও খাদ্যপুষ্টি জ্ঞান সেখানে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ধর্মগুরু তাদের ধ্যানকেই প্রাধান্য দিতেন, তারা পুষ্টি বা খাদ্যের ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন। চিকিৎসা বিদ্যার স্বীকৃত, একজন লোক একেবারেই কোনো কিছু না খেয়ে তিন দিন এবং শুধু পানি খেয়ে তিন-চার সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারেন।

চিকিৎসা শাস্ত্রের আদিকালে মানুষ বিভিন্ন নাম জানা রোগের চিকিৎসায়-বিশ্রাম, নিয়মকানুন ও খাদ্য উপাদানের মাধ্যমেই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। যেমন গলাব্যথা করলে গরম পানি খাবেন এবং গরম পানির গড়গড়া করবেন। সর্দি হলে কালিজিরা, মেথি এবং আদা খাবেন। জ্বর হলে স্পনজিং করবেন ইত্যাদি। ‘ভয়’ও এমন এক জিনিস যাকে জয় করা যায়, অর্থাৎ ভয়কে করব জয়। বলছিলাম ঘুমের কথা। সুস্থ ঘুম, শুধু সুস্থ মন ও দেহ তৈরি করে না, পরিণত এবং রুটিন মাফিক ঘুম আপনার শরীরকে বায়োলজিক্যাল ঘড়ি বা জৈবিক ঘড়ি হিসেবে গড়ে তুলবে অর্থাৎ দৈনিক একটি সময়ে বিছানায় পিঠ লাগালে ঘুমের জন্য কোনো চিন্তা করতে হবে না এবং ওষুধ খেতে হবে না। প্রত্যেক দিন একই সময়ে উঠতে গেলে কোনো ঘড়ির অ্যালার্মের প্রয়োজন হবে না। তবে একই সঙ্গে ঘুমানোর জায়গাটা হতে হবে কোলাহল মুক্ত শান্তির নীড়ে। বিছানাটা হতে হবে শুধু আরামদায়ক নয় পরিচিত। অর্থাৎ অতি দামি গদি সম্পন্ন বিছানা বা কাঠের বা মাটির ওপর বিছানো গামছা বা কাঁথা যাই হোক না কেন, যেন পরিচিত বিছানা। ঘুমোতে যাওয়ার আগে গোসল করে নেওয়া অথবা বই হাতে পড়তে থাকা ও আপনাকে ঘুমের সুবাতাস এনে দিতে পারে।
অবশ্যই ঘুমাতে যাওয়ার ন্যূনতম চার থেকে ছয় ঘণ্টা আগে কফি সিগারেট বা মদজাতীয় পণ্য বর্জন করা উচিত। কারণ এর প্রতিটি শুরুতে মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে উজ্জীবিত করে আবার সময়ান্তে স্নায়ুতন্ত্রকে গভীরভাবে অবশ বা নিস্তেজ বা অবসন্ন করে রাখে। শান্তির ঘুম বা গভীর ঘুম কখনো হতে দেবে না। আজে বাজে স্বপ্ন দেখাও হতে পারে। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন চালানো গবেষণায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, কারা বেশি রোগাক্রান্ত হয়। যারা কম ঘুমায় কিংবা যারা বেশি ঘুমায় তারা নানা রোগে আক্রান্ত হয় এবং কম বাঁচে। কম ঘুমানোর কারণে তারা রোগাক্রান্ত হচ্ছে কি না সেটি বলা বেশ কঠিন। এখানে কম ঘুমানো মানুষ বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে, যারা রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমায়। অন্যদিকে বেশি ঘুমানো মানুষ বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে যারা নয় কিংবা ১০ ঘণ্টার বেশি ঘুমায়। বয়োসন্ধিকালের আগ পর্যন্ত প্রতি রাতে ১১ ঘণ্টা ঘুমানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বলছে বয়স অনুযায়ী মানুষের ঘুমের সময়টাও ভিন্ন হবে। অধিকাংশ মানুষ যখন জানে যে, তাদের যথেষ্ট ঘুম হচ্ছে না, কিন্তু সেই যথেষ্ট বলতে কতটা? ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে যে, এ প্রশ্নের উত্তর আসলে নির্ভর করে বয়সের ওপর। রুটিন না মেনে চলা, অ্যালকোহল বা উত্তেজক কিছু সেবন, যেমন কফি বা কোনো এনার্জি ড্রিঙ্ক, এলার্ম ঘড়ি বা দিনের আলো এমন সব কিছুই প্রাত্যহিক জীবন চক্রকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বা এনএসএফ বলছে প্রত্যেকের লাইফ স্টাইলই আসলে তার ঘুমের চাহিদা বুঝতে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু বয়স অনুসারে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে পরামর্শও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নবজাত শিশু (৩ মাস পর্যন্ত) ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা। যদিও ১১ থেকে ১৩ ঘণ্টাও যথেষ্ট হতে পারে। তবে কোনোভাবেই ১৯ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়। শিশু (৪ থেকে ১১ মাস): কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা আর সর্বোচ্চ ১৮ ঘণ্টা। শিশু (১/২ বছর বয়স) : ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা। প্রাক স্কুল পর্ব (৩-৫ বছর বয়স): বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা। স্কুল পর্যায় (৬ থেকে ১৩ বছর) : এনএসএফের পরামর্শ ৯-১০ ঘণ্টার ঘুম। টিনএজ (১৪-১৭ বছর) : ৮-১০ ঘণ্টার ঘুম প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ (১৮ থেকে ২৫ বছর) : ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। প্রাপ্তবয়স্ক (২৬ থেকে ৬৪ বছর) : প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের মতোই। অন্য বয়স্ক (৬৫ বা তার বেশি বছর) : ৭/৮ ঘণ্টার ঘুম আদর্শ। কিন্তু ৫ ঘণ্টার কম বা ৯ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়। এনএসএফের ঘুম বিশেষজ্ঞরা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে করণীয় সম্পর্কে একটা তালিকাও প্রকাশ করেছেন। এক্ষেত্রে তারা প্রথমেই ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলতে দ্বিধা বোধ করেননি, ‘পুষ্টি যেমন শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে, তেমনি পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’ ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের মস্তিষ্ক বিষয়ক গবেষক শেন ওমারা বলেন, শুধু কম ঘুমের কারণেই স্বাস্থ্য খারাপ হয় কিনা সেটি বলা খুব কঠিন। তবে একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক আছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যারা কম ব্যায়াম করে তারা শারীরিকভাবে কম ফিট থাকে। যার বেশি ঘুম পায় এবং নিজেকে ক্লান্ত মনে হয়। আবার ক্লান্ত থাকার কারণে ব্যায়াম করা কমে যায়। অনেকে আছেন যারা সাংঘাতিকভাবে ঘুম বঞ্চিত। রাতে এক-দুই ঘণ্টার বেশি তাদের ঘুম হয় না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর কারণে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়।

ঘুম কম হওয়ার কারণে শারীরিকভাবে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। পৃথিবীজুড়ে ১৫৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কম ঘুমের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং মোটা হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের ওপর এসব গবেষণা চালানো হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা কয়েক রাত যদি ঘুম কম হয় তাহলে সেটি ডায়াবেটিসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের নিদ্রাহীনতা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে শরীরের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

আমি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে পিএইচডি করি, তখন আমার গাইড এক সোমবারে অনেক কাজ দিয়ে বললেন, আগামী সোমবারের মধ্যে করে নিয়ে আসতে। আমি সবগুলো কাজ করতে পারিনি। যখন এ কথা তাকে বললাম এবং বললাম আমি অক্লান্ত চেষ্টা করেছি, সময়ের অভাবে তা হয়ে উঠেনি, তখন তিনি বললেন, কেন তুমি সময় ধার নেওনি। আমি বুঝিনি, এ কথা বলাতে বললেন, তুমি নিদ্রা দেবীর কাছ থেকে তুমি সময় হাওলাত নিতে পার। এখন যদি দৈনিক ৬ ঘণ্টা ঘুমাও, তাহলে এক ঘণ্টা কম ঘুমালে সপ্তাহে ৭ ঘণ্টা সময় বাড়বে।

সর্বশেষ যা দরকার, তা হলো নিদ্রাস্থানে গ্রহণযোগ্য তাপমাত্রা আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ ও ঘুমের নির্ধারিত সময় মেনে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম, বেডরুমের আদর্শ তাপমাত্রা, সাউন্ড ও লাইট, আরামদায়ক বিছানাও বালিশ, অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন না নেওয়া, শয্যায় যাওয়ার আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করা। এবং যেই সময়ে আপনি ঘুম থেকে উঠতে চান, ঠিক সেই সময়ে কিছুদিনের জন্য হলেও একটা alarm থাকা দরকার। অন্যথায় ৫টায় উঠতে হবে, উঠতে হবে চিন্তা করে ৪টা থেকেই ঘুম ভেঙে যাবে। ৪:৩০টায় ঘুমিয়ে পরে ৭টায় ঘুম থেকে উঠতে হবে।

ইংরেজি প্রবাদ ‘Early to bed & Early to rise, Makes a man healthy, wealthy & wise’ তাছাড়াও সকালে ফজরের আজানের সময় বা আগে ঘুম থেকে উঠলে, ধর্মমতে প্রার্থনা করে কাজে লেগে গেলে দিবসটা যেমন বড় হয়ে যায়, কর্ম করার পরিধি, সময় এবং গতিও অনেক বেশি হয়। তখন আর সময়ের অভাব হয় না। যে কোনো ব্যক্তির জন্য ঘুম একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। ঘুমের ব্যাঘাত সুস্থ ব্যক্তিদেরও দিনের বেলায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই অবস্থা অটিস্টিক শিশুদের বেলাতেও প্রযোজ্য। অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাত দূর করতে পারলে তাদের ডেটাইম ফাংশনগুলো আরও ভালো হয়, যা তাদের লার্নিং ক্যাপাসিটি বা শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

আমরা সবাই জানি ভিয়েনিজ প্রবাদ ‘A perfect day begins with great nights sleep & perfect days always have a perfect ending.’

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ