চেতনায় বঙ্গবন্ধু-আমার রাজনীতিবিদ হওয়ার চেষ্টা-(পর্ব-২)

প্রকাশিত: ১:১১ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০

চেতনায় বঙ্গবন্ধু-আমার রাজনীতিবিদ হওয়ার চেষ্টা-(পর্ব-২)

রুহুল কুদ্দুস বাবুল : >>

“রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনীহার অন্যতম শাস্তি হচ্ছে নিজের তুলনায় নিকৃষ্টদের দ্বারা শাসিত হওয়া।”(প্লেটো)

মার্চ ১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর বাঙালী। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর মিছিলে শ্লোগানে মুখরিত জনপদ। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র একই চিত্র। আমাদের গ্রামের (সিরাজপুর, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট) মেঠো পথে প্রতিদিন মিছিল চলছে। মিছিল শেষে বিশ্রাম ও বক্তৃতা নিয়মিত চলতো আমাদের বাড়ীর দক্ষিনে রাস্তার পাশে একটা ছায়াদানকারী বিরাট কদম গাছের তলায়। কালের সাক্ষী সেই কদম গাছটি এখন নেই। প্রতিদিনের নিয়মিত বক্তা ছিলেন লণ্ডন প্রবাসী বয়োজ্যাষ্ঠ বরকতপুর গ্রামের ফেরজু মিয়া। তিনি ইংলিশদের মত হাফ প্যান্ট পরতেন চেহারা ও গায়ের রঙও ছিল ইংরেজদের মত। বক্তৃতায় উত্তেজিত হলে তাঁর চেহারা আরও লাল হয়ে উঠতো গ্রামের তরুন যুবকদের সংগঠিত করতেন মিছিলে শ্লোগান দিতেন তৎকালীন ছাত্রনেতারা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোখলেসুর রহমান (ছাত্রলীগ নেতা,জিএস, মদন মোহন কলেজ), শফিক উদ্দিন(অধ্যাপক), সৈদুর রহমান(প্রাক্তন চেয়ারম্যান), ইয়াওর খান(খাগদীওর) আব্দুল খালিক(মুক্তিযোদ্ধা), আব্দুল মতিন(হাজীপুর) আরও অনেকে যাদের নাম মনে নেই। যারা ভাইয়ার(মোখলেসুর রহমান) সাথে আমাদের বাড়ীতে আসতেন তাদের নাম মনে আছে।

মিছিলের শ্লোগান ছিল – “জাগো জাগো – বাঙালি জাগো”, “পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা”, “তোমার ভাই আমার ভাই- মুজিবভাই মুজিবভাই”, “তোমার নেতা আমার নেতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব”। ৭ মার্চের পরের শ্লোগান ছিল-” বাশের লাঠি তৈরী করো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো”, “জয় বাংলা”, “জয় বঙ্গবন্ধু”। বাশের লাঠি কাঁধে নিয়ে অবিরাম মিছিল চলতো। সামনে নতুন পতাকা সবুজের মাঝখানে গোলাকার লাল অংশে সোনালী রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র। এমন একটি পতাকা আমাদের দিয়েছিলেন কাদিরভাই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের(মতিয়া) নেতা ছিলেন। আমার খালাতোভাই আব্দুল কাদির স্বাধীনতার পর ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। পতাকাটি আমরা দুভাই আমি ও আবুল একটা চিকন বাশের খুটিতে লাগিয়ে প্রতিদিন সকালে বাড়ীর সামনে টাঙিয়ে রাখতাম। পতাকাটি আমার আম্মা অনেক যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। আম্মার মৃত্যুর পর আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতির স্মারকসহ সেই পতাকাটি খুঁজে পাইনি।
৭ মার্চের পর আব্বা তাঁর কর্মস্থল সুনামগঞ্জে চলে যান। ২৬ মার্চে আমার বড়আপার বিয়ের তারিখ ধার্য্য ছিল, আক্বদ আগেই হয়ে গেছে । আব্বা ছুটি নিয়ে এক সপ্তার মধ্যে চলে আসার কথা কিন্তু তিনি আসতে পারেননি। আম্মা ও আপারা সারক্ষণ উৎকন্ঠায় থাকতেন। দাদা (বড়ভাই) মদন মোহন কলেজের ছাত্র সাথে কাদিরভাইকে সাথে নিয়ে বাড়ীতে আসলেন। আব্বা খবর পাঠিয়েছেন দেশের পরিস্থিতি ভাল নয় নির্ধারিত তারিখে বড়আপার বিয়ে হবেনা। দুলাভাই মোদারিস আহমেদ বিদ্যুৎ বিভাগে চাকুরী করতেন, পোষ্টিং ছিল ময়মনসিংহের শেরপুর শহরে। তিনিও আসতে পারছেননা।

২৬ মার্চ ১৯৭১ এ দিনটি আমাদের স্বাধীনতা দিবশ হয়ে গেলো। সিলেট শহরে কার্ফু চলছে, চলছে প্রতিরোধও। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আত্মীয়স্বজন যারা শহরে আছেন তাদের জন্য সবার উদ্বেগ বেড়ে গেলো। খবর আসছে পাকিস্তানি বাহিনি গুলি করে মানুষ মারছে। প্রকৃত খবর পাওয়াও সম্ভব হচ্ছেনা। সব খবরের উৎস বা বাহক একমাত্র কাদিরভাই (আমার খালাতোভাই)। তিনি বাইসাইকেলে প্রায় প্রতিদিনই আসছেন। ২৭ তারিখ তিনি আসলেন গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে এক- বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন, দুই-সিলেট শহরে পাকিস্তানি বাহিনি নির্বিচারে গুলি করছে। ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। শাহী ঈদগায় আমার ছোটখালার বাসা তিনি সন্তান সম্ভবা, আম্মা তো তাঁর বোনের জন্য অস্থির হয়ে গেলেন। কাদিরভাই আরও বললেন দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেব সহ সিলেটের আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তাদের বাড়ীতে চান্দাই গ্রামে আশ্রয় নিয়ে পরিকল্পনা ঠিক করছেন এখন কি করা দরকার। তিনি দেখে এসেছেন। আমার মামা আম্মার চাচাতোভাই টুনুমামা (নাসিরউদ্দিন) সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। রাতে তিনিও আমাদের বাড়ীতে আসেন। তাদের টঙ্গীঘরে (সিলেট অঞ্চলে বাহির বাড়ীর বৈঠকঘরকে টঙ্গীঘর বলা হয়) বৈঠকটি হয়েছিল। তাঁর মুখ থেকে শুনা দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেব নাকি ২৫ তারিখেই সিলেটের পুলিশ সুপারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর একটি তারবার্তা পেয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী সেটিই ছিলো স্বাধীনতার জন্য প্রতিরোধ যুদ্ধের বার্তা। সে অনুযায়ী দক্ষিন সুরমায় দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেব জনগণকে সংগঠিত করে সিলেট শহরের হানাদার বাহিনিকে প্রতিরোধ শুরু করেছেন।
পাকিস্তানি বাহিনির অতর্কিত হামলায় ভীত সন্ত্রস্ত শহর ও শহরতলির মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দূরের গ্রামের দিকে আত্মীয়স্বজনের বাড়ীতে যেকোন উপায়ে পায়ে হেঁটে বা রিক্সায় ছুটছেন। আমাদের বাড়ীর সামনের রাস্তা ধরে অনেক মানুষকে যেতে দেখেছি। কাদিরভাইয়ের সাথে দাদাও বাড়ীতে চলে আসেন। ভাইয়া (মোখলেসুর রহমান) কয়েকদিন যাবৎ বাড়ীতে নেই।

২৬ তারিখ ভোর থেকে সিলেট শহরে কার্ফ্যু চলছে। ২৮ তারিখ দল বেঁধে শাহী ঈদগাহ থেকে আমার ছোটখালার পরিবার ও চান্দাই থেকে মামাদের পরিবার আমাদের বাড়ীতে চলে আসেন। শাহী ঈদগায় খালার বাসার পিছনে যখন একটা মোর্টার সেলের বিস্ফোরণ ঘটে তখন আমার খালাতোভাই মাসুদ পৃথিবিতে আসে। তারা যখন আমাদের বাড়ীতে পৌছেন তখন নানীর কোলে কাপড়ে পেছানো ছোট্ট মাসুদকে দেখেছি। তারা কয়েকমাস আমাদের বাড়ীতে অবস্থান করেন।
বাড়ীতে জমজমাট অবস্থা আমাদের মামাতো খালাতো ভাইবোন, আমরা শিশুদের মধ্যে উৎসবমুখর আর বড়দের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা।

সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় রেডিওতে খবর শোনা। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা তারপর যুক্ত হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। কিছু খবর তো মিলছেই তার মধ্যে বাড়তি উত্তেজনাকর খবর রেডীওতে স্বাধীনতার ঘোষনা। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে একজন বাঙালি মেজর বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন। তাঁর নাম জিয়াউর রহমান। ইচড়ে পাকা আমিও ঘোষনাটি শুনেছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে মেজর জিয়ার কন্ঠে”…..অন বিহাফ আওয়ার গ্রেট লীডারবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান…”।স্বাধীনতা মানুষের আজন্ম আকাঙ্খা। এ আকাঙ্খা থেকেই জন্ম নেয় সংগ্রামী চেতনার। আর এ সংগ্রামী চেতনাবোধই মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে সুগম করে স্বাধীনতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানি শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির শেষ প্রহর এই অগ্নিঝরা মার্চ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মুক্তিকামী জনতার সামনে মুক্তির যে ডাক দিয়েছিলেন সেই মুক্তির মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ মানুষ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় নেমে পড়েছে।

স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রতিরোধ যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বাশের লাঠি ছেড়ে অস্ত্র হাতে বাঙালি মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে অর্থাৎ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। (চলবে)

(লেখক : রুহুল কুদ্দুস বাবুল, সাধারণ সম্পাদক, জেলা ঐক্যন্যাপ, সিলেট)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ