ছকবাঁধা চিন্তা ও মার্কসবাদী তত্ত্বচর্চা

প্রকাশিত: ১০:০০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২১

ছকবাঁধা চিন্তা ও মার্কসবাদী তত্ত্বচর্চা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বর্তমানে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ হয়ে উঠেছে দেশবাসীর সামনে প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয়। এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে প্রতিদিন। গত দু’সপ্তাহ ধরে আমিও এ বিষয় নিয়ে লিখে যাচ্ছি, কথা বলে চলেছি, প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে সচেষ্ট আছি। কিন্তু দেশ-দুনিয়া শুধু এই ইস্যুতে আটকে নেই। চলছে লুটেরাদের লুটপাট, চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি, অত্যাচারীদের অত্যাচার, চলছে অগণিত মানুষের জীবন-জীবিকা ও রুটি-রুজির জন্য প্রাণান্তকর প্রয়াস। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের বিপদসহ এ অবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজন।

এজন্য প্রয়োজন হয়ে পরেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারায় একটি সর্বাত্মক সমাজ বিপ্লব। সেই সমাজ বিপ্লব সফল করার জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী তত্ত্ব। তাই পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, বিপ্লবী তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা সবসময়ই প্রাসঙ্গিক। সে কথা মনে রেখেই সমাজ বিপ্লবের তত্ত্ব সম্পর্কিত একটি বিশেষ দিক নিয়ে আজ দু’কথা লিখছি। এ কথাগুলো লেখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আরো যে কারণে তা হলো, জঙ্গিবাদের বিপজ্জনক হামলাবাজির পরিস্থিতিতেও কেউ কেউ সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদের বিরুদ্ধে পত্রিকার পাতায় অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে ক্ষান্ত হয়নি।

মানুষের চিন্তার পদ্ধতির (Cognitive style of thinking) থাকতে পারে নানা ধারায়। এর মধ্যে একটি হলো ছকবাঁধা চিন্তার ধারা (stereotyped thinking)। ছকবাঁধা চিন্তা ও মার্কসবাদী তত্ত্বচিন্তা—এ দু’টি কি একরকম বিষয়? না, এ দু’টো এক বিষয় নয়। বরঞ্চ মার্কসবাদ প্রকৃতপক্ষে ছকবাঁধা চিন্তা পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী। এ বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারলে মার্কসবাদীদের মধ্যে দু’রকম ত্রুটির উদ্ভব হতে পারে। হয় মার্কসবাদকে ছকবাঁধা ধারায় অনুসরণ করতে গিয়ে সজীব, চিরযৌবনা, জীবন্ত এই মতাদর্শটিকে শাস্ত্রবদ্ধ, প্রস্তরিভূত, অচল, অনড় তাত্ত্বিক অচলায়তনে আবদ্ধ করে ফেলা হবে, কিংবা গতানুগতিক ছকবাঁধা ধরনের চিন্তা ধারা থেকে মুক্ত হওয়ার অজুহাতে মার্কসবাদকেই পরিত্যাগ করার প্রবণতা সৃষ্টি হবে।

 

প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাবলি বিশ্লেষণের ধারাতেই মানুষের জ্ঞান সঞ্চয় হয়। নিত্যদিন যে অসংখ্য সব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করি তা বিশ্লেষণ করে যে জ্ঞান সংগৃহীত হয় তার একাংশ মাত্র আমরা স্মৃতিতে রক্ষা করি। স্মৃতিতে ধারণকৃত সেই জ্ঞান আমরা কাজে লাগাই তখন, যখন আমরা পুনরায় অনুরূপ একটি ঘটনা বিশ্লেষণের কর্তব্যের সম্মুখীন হই। কোনো ঘটনা বিশ্লেষণ করার এই পদ্ধতিটিকে আমরা সাধারণভাবে ছকবাঁধা ধারা বলে আখ্যায়িত করতে পারি। এরূপ ছকবাঁধা চিন্তার পদ্ধতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে খুবই প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। চিন্তার এই পদ্ধতি অনুসরণ করা না হলে দৈনন্দিন সাধারণ জীবনযাত্রা অসম্ভব ও অচল হয়ে পড়তো। প্রতিটি ঘটনাকে একেবারে নতুন করে বারে বারে পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে চলতে হতো। তাহলে চলাই হয়ে উঠতো অসম্ভব। তাই সাধারণ চিন্তা-ভাবনা ও কাজকর্মের ক্ষেত্রে ছকবাঁধা চিন্তার প্রয়োগ তেমন দোষণীয় কিছু নয়। কিন্তু এই ছকবাঁধা চিন্তার ধারাকে তাত্ত্বিক (theoretical) চিন্তা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজ্ঞানসম্মত তাত্ত্বিক চিন্তা, বিশেষত মার্কসবাদী তত্ত্বচিন্তার পদ্ধতির সাথে এরূপ ছকবাঁধা চিন্তা সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর প্রধান কারণ হলো এই যে, কোনো দুটি ঘটনা কখনই হুবহু একইরকম হতে পারে না। সব ঘটনাই ঘটে থাকে অনন্ত গতিময়তার চলমান ধারার মধ্যে। যা এখনই ঘটলো তা পরমুহূর্তেই পুনরায় ঘটলেও সেটা কোনো না কোনোভাবে ভিন্নতর উপাদান ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে বাধ্য। কারণ, ইতোমধ্যে পূর্বেকার বহির্জগত্ পরিবর্তন হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। তাই পূর্বে সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে বিশ্লেষণলব্ধ জ্ঞান পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া অনুরূপ ঘটনা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হুবহু প্রতিস্থাপন করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। মার্কসবাদের শক্তির উত্স এখানেই যে, সে অগ্রসর হয় তত্ত্বকে ক্রমপরিবর্তমান বাস্তবতার আলোকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-পুনঃপরীক্ষা করার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে। মার্কসবাদ কোনো বিশেষ ছকের মধ্যে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের অনুসিদ্ধান্তকে চিরস্থায়ী সত্যরূপে সূত্রাবদ্ধ করে রাখে না। তত্ত্বকে ও তাত্ত্বিক অনুসিদ্ধান্তসমূহকে মার্কসবাদ কখনো অচল, অনড় এবং একই ছকে অনন্তকাল আবদ্ধ ‘পরিপূর্ণ সত্য’ রূপে বিবেচনা করে না। পক্ষান্তরে ছকবাঁধা চিন্তা সেই প্রয়োজনীয়তাকে এড়িয়ে প্রচলিত সব ধারণাকে অভ্রান্ত, স্বতঃসিদ্ধ ও ‘পরিপূর্ণ’ সত্য বলে বিবেচনা করে। এখানেই মার্কসবাদী তাত্ত্বিক চিন্তা ও সাধারণ ছকবাঁধা চিন্তার মধ্যে পার্থক্য।

মার্কসবাদ সম্পর্কে অবশ্য এক্ষেত্রে একথাও মনে রাখতে হবে যে, প্রচলিত তত্ত্বায়ন বা ধারণাকে পুনঃযাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত রেখে চলতে বলার অর্থ এই নয় যে, এগুলো কারণে-অকারণে ক্রমাগত বদলাতে হবে। যেকোনো নবায়ন বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এর সপক্ষে যুক্তিসঙ্গত বাস্তব কারণ থাকতে হবে। এবং তার প্রধান উপাদান হতে হবে বাস্তব প্রয়োগলব্ধ জ্ঞান। এভাবেই তত্ত্ব ও প্রয়োগ পারস্পরিক ডায়লেকটিক্যাল আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে ক্রমাগত বিকশিত হয়ে থাকে। কোনো ধারণা ও তত্ত্বকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি যুক্তিযুক্ততা ও প্রমাণের ধার না ধেরে অন্ধভাবে কোনো কিছু ঢালাও পরিত্যাগ করাটিও সঠিক নয়। সবকিছুকে যাচাই, পুনঃযাচাইয়ের ধারায় ক্রমাগত বিচার করার মার্কসবাদী পদ্ধতির অর্থ কখনোই এটি নয় যে, নির্বিচারে, যুক্তি-প্রমাণ ব্যতিরেকে যখন যা খুশি তাকে মনগড়াভাবে (subjectively) পরিত্যাগ করা হবে।

 

ছকবাঁধা চিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা তৈরি জ্ঞানকে নতুন ঘটনার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পুনঃস্থাপনকেই প্রধান কর্তব্য বলে বিবেচনা করে থাকে। চিন্তার প্রক্রিয়াকে তা ব্যাকরণের নিয়ম বা গণিতের সূত্রের মতো করে বিবেচনা করে। তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ ধরনের চিন্তার অর্থ দাঁড়ায়, যেকোনো ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটিই সঠিক জবাব বা সমাধান সম্ভব। ঠিক যেমনটি হয় পাটিগণিতের ক্ষেত্রে। বিষয়টি যেন এরকম যে, ‘চূড়ান্ত সত্য’ তত্ত্বজগতের নানা প্রচলিত ধারণাগুলোর মধ্যে বিস্তৃত হয়ে আছে। আমাদের কাজ হলো শুধু ‘চূড়ান্ত সত্যের’ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উপাদানগুলোকে খুঁজে পাওয়া এবং পুঁতির মালার মতো সেগুলোকে পাশাপাশি সাজিয়ে সত্যের আণুভৌমিক (linear) বিস্তৃতি সাধন করা। এ ধরনের চিন্তার প্রক্রিয়া পরিষ্কারভাবেই মেটাফিজিক্যাল। মার্কসবাদী ডায়লেকটিক্যাল পদ্ধতির সাথে এবং সার্বজনীন পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্কের মার্কসীয় প্রত্যয়ের সাথে তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ছকবাঁধা চিন্তার এরূপ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণধর্মী তত্ত্ব চিন্তার ক্ষেত্রে আলস্য সৃষ্টি করে এবং তাত্ত্বিক চর্চাকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রেখে তার বিকাশ ব্যাহত করে। এরূপ চিন্তার ধারা ‘মডেল’ ভিত্তিক ও কাল্পনিক (utopian) চিন্তার নকশা অনুসরণ করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। তত্ত্বচর্চার ক্ষেত্রে এরূপ আলস্য, গণ্ডিবদ্ধতা, মতান্ধতা, মডেলভিত্তিক ও ইউটোপীয় চিন্তা ইত্যাদির কোনো স্থান মার্কসবাদে নেই।

তাত্ত্বিক চিন্তার জগতে গতানুগতিক ধারার চিন্তার প্রয়োগের ফলে সৃষ্ট আরেকটি প্রবণতা হলো তথ্যের সূত্রের ব্যক্তিগতকরণ (personalisation)। অর্থাৎ, কি বলা হচ্ছে তার চেয়ে কে বলছে (শত্রু না মিত্র ইত্যাদি) সেটাই বড় বিবেচ্য হয়ে ওঠা। নতুন কোনো চিন্তা বিবেচনা করার ক্ষেত্রে তার অন্তর্নিহিত বাস্তবসম্মততা ও বৈজ্ঞানিক সঠিকতার উপাদান বিশ্লেষণের পরিবর্তে প্রথমেই যে ডবল চেকিং ব্যবস্থা মনের ভেতর স্থান করে নেয় তা হলো

ক) গতানুগতিক ও প্রচলিত ধারণার বাইরে ভিন্নতর কিছু বলা হচ্ছে কিনা।

খ) বিশ্বাসভাজন সূত্রের বাইরের কেউ এসব কথা বলছে কিনা ।

যখনই কোনো কিছু এই ডবল চেকিং অতিক্রম করতে না পারে, তখনই সে সম্পর্কে একটা অবজ্ঞা ও প্রত্যাখ্যানের মনোভাব গড়ে ওঠে। নতুন বক্তব্যের সারসত্তা বিবেচনার আগেই সে সম্পর্কে মনটা বৈরী হয়ে ওঠে। এভাবে, সম্ভাব্য সত্যানুসন্ধানের সুযোগ হারিয়ে যায়।

ছকবাঁধা নতুন চিন্তা সবকিছুকে হয় সাদা না হয় কালো; হয় সত্য না হয় মিথ্যা; হয় ভাল না হয় মন্দ— এরূপ সরল স্থির ফর্মূলার ভিত্তিতে দেখার প্রবণতা সৃষ্টি করে। বিশ্বটা যে এরূপ সাদা-কালোর সমাবেশ নয় এবং তা যে নানা রঙের ও নানা টোন-হাফটোনের সমন্বয়, সেই বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়। তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে এরূপ চিন্তার প্রয়োগ সরলীকরণের প্রবণতা সৃষ্টি করে। যা ভাল তার সবটাই ভাল, যা খারাপ তার সবটাই খারাপ, ভাল-মন্দ মিলিয়ে কিছুই থাকতে পারে না, এরূপ সরল সূত্র স্থাপিত হয়। এরূপ একমাত্রিক (uni-dimentional) চিন্তা কোনোমতেই তত্ত্বচর্চার জন্য সহায়ক নয়।

তত্ত্বচর্চায় ছকবাঁধা চিন্তার প্রয়োগের ফলে তত্ত্বের বিকৃতি ঘটে আরেকভাবেও। বৈচিত্র্যসম্পন্ন পরিস্থিতি ছকবাঁধা চিন্তায় অভ্যস্ত মানুষকে বিরক্ত ও ক্লান্ত করে তুলে। যেকোনো বিষয়কে হ্যাঁ বা না দ্বারা জবাব না দিয়ে যদি জবাবের ক্ষেত্রে নানা সম্ভাব্যতাকে বিবেচনায় নিতে হয়, এবং তারপরে যদি গৃহীত সিদ্ধান্তকে প্রতিনিয়ত পুনঃপরীক্ষার সম্মুখীন করে যাচাই-পুনঃযাচাই করে যেতে হয়, সেটি ‘ক্লান্তিকর’ ও ‘বিরক্তিকর’ বলে মনে হওয়াটিই স্বাভাবিক। তার চেয়ে একগুচ্ছ স্থায়ী সূত্র অনুসরণ করে অংকের ফর্মূলার মতো শুধু একটিমাত্র অনড় ‘চূড়ান্ত সত্যের’ ধারায় চিন্তাকে দ্রুত সিদ্ধান্তের মধ্যে অগ্রসর করা অনেক সহজ নয় কি? তাই ছকবাঁধা চিন্তার ধারাতেই মানুষ স্বভাবতই আকৃষ্ট হয়।

ছকবাঁধা চিন্তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার আত্মবিস্তৃতিকরণের (linear self extension) প্রবণতা। এতে করে একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে দেখা হয় বৃহত্তর কোনো সিস্টেমের একটি সরল একরৈখিক অংশ হিসেবে। যান্ত্রিকভাবে সিস্টেমের নির্দিষ্ট বিশ্লেষণকৃত অংশ সম্পর্কিত জ্ঞানকে সমগ্র সিস্টেমের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্তৃত করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। যেমন: আমাদের দেশের বাস্তবতায় ‘প্রতিবাদের’ অথবা ‘বিরোধিতার’ কাজটি প্রগতির সংগ্রামের সাথে যুক্ত বলেই সাধারণভাবে বিবেচিত। ছকবাঁধা চিন্তায় ‘প্রতিবাদ’ শুনলেই মাথায় চলে আসে ‘প্রগতি’। কিন্তু সব ‘প্রতিবাদই’ প্রগতিশীল নয়। জামায়াতে ইসলামীর ‘প্রতিবাদ’ যে ‘প্রগতির’ সাথে যুক্ত নয় সেটা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। তাই, তত্ত্বের এরূপ স্বয়ংক্রিয় বিস্তৃতি যে সঠিক নয়, তা সহজেই বোধগম্য।

নানা মতের মধ্যপথ খুঁজে চলার কথা বললেই ছকবাঁধা চিন্তার ধারায় অভ্যস্তরা ভাবতে শুরু করেন যে, এর দ্বারা তত্ত্বকে ‘অনিশ্চয়তা’র মধ্যে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এবং এর দ্বারা তত্ত্বচর্চার ক্ষতি করা হচ্ছে। তাদের কথা হলো, তত্ত্বানুসন্ধানের জন্য পথ চলতে হবে সরলরেখায়, নাক বরাবর। যে-পথে চলছি সেটিই একমাত্র ‘সত্য’ পথ। তাই পথ চলতে গিয়ে বারংবার কম্পাসে দিক ঠিক করে নেয়ার প্রচেষ্টা তত্ত্বের প্রতি অবিশ্বাসেরই প্রমাণ। ছকবাঁধা ধারার চিন্তার। মানুষরা এভাবেই ভেবে থাকেন। পক্ষান্তরে, মার্কসীয় তত্ত্বের আসল মর্মকথাই হলো বিশ্লেষণের ডায়ালেকটিক্যাল বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। তা তত্ত্বের অনন্ত বহুমাত্রিক বিকাশের কথা বলে। এ কারণে মার্কসীয় তত্ত্বচর্চায় কঠোর পরিশ্রমী পথ ব্যতীত কোনো সহজ আলস্যনির্ভর পথ নেই।

মার্কসবাদ কি তাহলে তত্ত্বশূন্য নিছক বিশ্লেষণের একটি পদ্ধতি মাত্র? না, সে কথা মোটেও ঠিক নয়। মার্কসীয় তত্ত্বচিন্তার সাথে গতানুগতিক ছকবাঁধা চিন্তার অসামঞ্জস্যের অর্থ এই নয় যে, মার্কসবাদে কোনো তত্ত্বের স্থান নাই। যুক্তি দেয়া হতে পারে যে, কোনো তত্ত্বই যেহেতু স্থায়ী নয়, তাই তত্ত্ব বলে কিছুই ‘অনুসরণযোগ্য’ নয়। মার্কসবাদের বিকৃতকারীরা এই যুক্তি তুলে ধরে মার্কসবাদকে অন-অনুসরণীয় ও পরিত্যজ্য, কিংবা খুব বেশি হলে তত্ত্বশূন্য সারবস্তুহীন নিছক একটি বিশ্লেষণের পদ্ধতি হিসাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করে। তাদের মতে, যে কোনো তত্ত্ব যেহেতু পরমুহূর্তেই বদল করা প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারে, সে কারণে কখনোই কোনো তত্ত্ব ‘অনুসরণযোগ্য’ বিবেচিত হতে পারে না। মার্কসবাদকে ‘কর্মের দিকনির্দেশনা’ (guide to action) হিসাবে বিবেচনা করতে তারা কোনোমতেই রাজি না। অথচ একথাটাই যুক্তিসঙ্গত যে, তত্ত্বের অনন্ত বিকাশ যেহেতু মার্কসবাদেরই মর্মকথা, তাই উল্লিখিত যুক্তিতে মার্কসবাদ কোনোভাবেই অন-অনুসরণীয় হয়ে পড়ে না। একথা যদি সত্য হয় যে, ‘সবকিছুই পরিবর্তনশীল, একমাত্র পরিবর্তন ছাড়া’ তাহলে প্রথম অংশটিকে সত্য বলে মেনে নিলে দ্বিতীয় অংশটিও যে সত্য, সেটি মেনে নিতে হয়। লজিক একথাই বলে।

তত্ত্বের অনন্ত গতিশীলতা যেহেতু মার্কসবাদের মর্মবাণী, সেহেতু উপরোক্ত একই যুক্তিতে বলা যায় যে, মার্কসবাদ একটি ‘অনুসরণীয়’ মতবাদ। বস্তুত মার্কসবাদকে ‘অন-অনুসরণীয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করার অর্থ হলো শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী লড়াইকে আদর্শগত ও তত্ত্বগতভাবে নিরস্ত্র করা। একথা তাই বলা যায় যে, তত্ত্বচর্চার ক্ষেত্রে ছকবাঁধা চিন্তা পরিত্যাজ্য হলেও, মার্কসবাদ সেক্ষেত্রে শুধু অনুসরণীয়ই নয়, তা ‘কর্মের দিকনির্দেশনাও’ বটে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun

আমাদের ফেইসবুক পেইজ