ছাতক সিমেন্ট কারখানার ৮৯২ কোটি টাকার প্রকল্প : নিয়ে চলছে দুর্নীতির মহা উৎসব

প্রকাশিত: ১০:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২১

ছাতক সিমেন্ট কারখানার ৮৯২ কোটি টাকার প্রকল্প : নিয়ে চলছে দুর্নীতির মহা উৎসব

তমাল পোদ্দার, ছাতকঃ
ছাতক সিমেন্ট কারখানায় নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। কারখানা আধুনিকায়নে ব্যালেন্সিং মর্ডানাইজেশন রেনোভেশন এন্ড এক্সপেনশন (বিএমআরই) প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হরিলুটের পায়তারায় লিপ্ত রয়েছে একটি মহল। বিভিন্ন অভিযোগ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ড্রাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন বিসিআইসির উচ্চ পর্যায় থেকে কয়েকটি তদন্ত চলমান রয়েছে। কিন্তু হরিলুটে জড়িত সিন্ডিকেটকারীদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জানা যায়, ওই কারখানায় উৎপাদিত ডায়মন্ড ব্র্যান্ডের সিমেন্টের চাহিদা ও সুনাম রয়েছে দেশের বাইরেও। বিগত সময়ে কারখানাটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ না নিয়ে সেটি বেসরকারিকরণের অপচেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য স্থানীয় এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের প্রচেষ্টায় ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ওয়েট প্রসেস থেকে কারখানাটিকে ড্রাই প্রসেস প্রকল্পে রূপান্তর করতে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ একনেকে আধুনিকায়ন ড্রাই প্রসেস প্রকল্পের অনুমোদন হয়। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে কার্যাদেশ পেয়ে চীনের নানজিং সি-হোপ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৮৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রকল্পের কাজে হাত দেয়। কাজ শুরুর পর থেকে প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মহা পরিচালক বরাবর ছাতকের আব্দুর রশীদ নামের এক ব্যাক্তির দেয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, নানজিং সি-হোপ কাজটি পেলেও এর মূল নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বিসিআইসির বেশ ক’জন কর্মকর্তা ও নানজিং সি-হোপের কান্ট্রি ডিরেক্টর। এর আগে ঘোড়াশাল সার কারখানায় কন্ট্রোল বাল্ব ক্রয়ের জন্য একটি আন্তর্জাতিক টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন নানজিং সি-হোপহের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. নাজির মোঃ খান। টেন্ডারে তিনি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ক্রয়াদেশ পান। বাল্ব সাপ্লাইয়ের কয়েকদিন পরেই এগুলো সিজ হয়ে যায় এবং কারখানার উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটে। ওই সময় তার ফার্ম এম এম সার্ভিসকে কালো তালিকাভুক্ত করে বিসিআইসি। তাদের দুর্নীতির কারণে চট্রগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্সটি আজ বন্ধ রয়েছে। ছাতক সিমেন্ট কারখানার বিএমআর প্রকল্পের আওতায় এক্সেভেটর, এয়ার কম্প্রেশার, ড্রাম ট্রাক, ফ্রক লিফটার, লকোমেটিভ ইঞ্জিন, হুইল লোডার ক্রয়ের তিনটি আন্তর্জাতিক টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন নাজির মোঃ খানের ডিজিটাল মেশিনারিজ ও সেকনিক বাংলাদেশ নামে আরো দুইটি প্রতিষ্ঠান। তিনটি টেন্ডারেই তার প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয়। নিম্নমানের মেশিনারিজ সরবরাহ করার অভিযোগ রয়েছে তার এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তিনটি টেন্ডারের সাথে ১ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের কথা থাকলেও এগুলো না করেই বিল নিয়ে চলে যায় তার প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ছাতক সিমেন্ট কারখানার নতুন প্রকল্প তদারকি করার জন্য ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। পরামর্শকরা প্রকল্প পরিদর্শন না করেই নিয়মিত বিল তুলে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সিমেন্ট কারখানার বিএমআরই প্রকল্পের জন্য ইউরোপীয়ান, আমেরিকান ও জাপানিজ স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করার কথা থাকলেও সেটি পালন হচ্ছেনা। কারখানার জন্য সরবরাহকৃত নিম্নমানের চায়নিজ মালামাল গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই একটি কিলনের মূল্য নেয়া হয়েছে ৭০কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে চায়নিজ এ কিলনটির মূল্য ২০ কোটি টাকা বলে ছাতক সিমেন্ট কারখানার সাবেক এক এমডি জানিয়েছেন। এদিকে কার্যাদেশ অনুযায়ী ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভার্টিক্যাল বয়লার আনার কথা থাকলেও মাত্র ৬ কোটি টাকা মূল্যের কোনো ধরনের ড্রয়িং এপ্রুভাল ছাড়াই একটি হরিজেন্টাল বয়লার কারখানায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিসিআইসি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রজেক্টের সকল কাজ দুবাই থেকে আমদানি করা উন্নত মানের পাথর দিয়ে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও অনেকাংশে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্রাশিং চুনাপাথর। যা এত ভারি কন্সট্রাকশন কাজের জন্য মোটেই উপযোগী নয় বলে একাধিক প্রকৌশলীরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, ইতিমধ্যেই সাড়ে দশ হাজার টন পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে মাত্র ২৬’শ টন দুবাই থেকে আমদানি করা। বাকিগুলো ক্রাশিং চুনা পাথর। অভিজ্ঞ মহলের অভিমত, ক্রাশিং চুনাপাথর দিয়ে গুরুত্বপূর্ন স্থাপনার কাজ করা হলে প্লান্টের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে যেকোনো সময় চুনাপাথর গলে কোম্পানির বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা থেকে যায়। এদিকে ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ডায়মন্ড ব্র‍্যান্ডের সিমেন্ট কারখানাটি চালু রেখেই নতুন প্রকল্প নির্মিত হওয়ার কথা থাকলেও চুনাপাথর সংকটের কারণ দেখিয়ে কারখানাটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ছাতক সিমেন্ট কারখানার সিবিএ সেক্রেটারি আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, স্থানীয়ভাবে কোনো মনিটরিং কমিটি না থাকায় ঠিকাদার ইচ্ছেমতো কাজ করছে। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ও কারখানার এমডি প্রকৌশলী এফ এম বারী জানান, তিনি কিছু অনিয়মের কথা শুনেছেন। তবে এসব বিষয়ে তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. নাজির মোঃ খানের সাথে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
  12345
27282930   
       
28      
       
       
       
1234567
2930     
       

আমাদের ফেইসবুক পেইজ