জনতার কামরানের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১:০৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২১

জনতার কামরানের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

এডভোকেট আফছর আহমদ

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এক তারকার নাম। অনেকেই তাঁকে সিলেটের কামরান, সিলেটের রাজনীতির অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র বলেছেন, বলছেন এবং হয়ত আগামীতেও বলবেন। বদর উদ্দিন আহমদ কামরান! যারা চিনেন তাদের কাছে নামটাই কেবল যথেষ্ট। করোনার প্রাণঘাতী ছোবলে পৃথিবীজুড়ে জীবন গেছে লাখো লাখো মানুষের, মানুষ হৃদয়হীনতারও পরিচয় দিয়েছে অসংখ্য কিন্তু আমি জানি না, কোথাও কী এমন বাঁধভাঙা মানুষের ঢল নেমেছিল; নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে কেবল এক বুক ভালোবাসা নিয়ে আজ যারা সামিল হয়েছিলেন কামরানের শেষ বিদায়ে।

কে ছিলেন কামরান? কিতাবি বর্ণনা তো আছেই। প্রায় সত্তর বছর বয়সী কামরান এক রাজনীতিক এর নাম অথবা প্রায় ত্রিশ বছর নানাভাবে থাকা কামরান একজন জনপ্রতিনিধির নাম… কিন্তু যেখানে তিনি ব্যতিক্রম ছিলেন সেটা হলো দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একদিন ‘জনতার কামরান’ হয়ে উঠা, ‘সিলেটবাসীর প্রিয় নাম’ হয়ে উঠা, ‘সিলেটের কামরান’, ‘ভোটের রাজা’ হয়ে উঠা এবং সর্বোপরি সকল শ্রেণি, পেশার মানুষের বন্ধু হয়ে উঠা।

কামরান বন্ধু ছিলেন সকলের, কামরান হাসিমুখে কথা বলতেন তার রাজনৈতিক বিরোধী শিবির থেকে শুরু করে যারা তাকে পছন্দ করতো না তাদের সাথেও, কামরান হাত বাড়িয়ে দিতেন আগে, কামরান সালাম দিতেন আগে, কামরানের হৃদয়টা বড়ো নরম ছিল-বুকে কোন কষ্ট জমা হলে হাউমাউ করে কাঁদতেন সবার সামনেই। কামরান শ্রমজীবী মানুষকে বুকে টেনে নিয়ে কথা বলতেন, প্রিয়জনদের মাথায় হাত দিয়ে কথা বলতেন। সংকটে-সংগ্রামে কামরানই ছিলেন সিলেট নগরীর মানুষের আশ্রয়স্থল। কামরান কৈশোরে চাঁদেরহাট করতেন, শিশু-কিশোর সংগঠন করতেন, কামরান ছড়া লিখতেন, গান গাইতেন, কামরান সংস্কৃতি অন্তঃপ্রাণ ছিলেন, সাংবাদিকবান্ধব ছিলেন – এসবই তাঁকে ‘সবার’ করে তুলেছ!

 

না, তিনি এলিট পলিটিশিয়ানদের মতো ছিলেন না, তাকে একগাদা পিএস এপিএস পেরিয়ে পেতে হতো না, অধিকাংশ সময়ই নিজেই ফোন রিসিভ করতেন তিনি, তিনি কল ব্যাকও করতেন। তিনি ছিলেন গণমুখী রাজনীতিবিদ। যে কেউ আপনজনের মতো তাঁর কাছে যেতে পেরেছে। সুখের কথা, দুঃখের কথা জানাতে পেরেছে। রাজপথ থেকে কামরান পারিবারিক ডাইনিং টেবিলে, জনসভা থেকে যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে; বাচ্চার জন্মদিনে কামরান, বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কামরান, খৎনা অনুষ্ঠানে কামরান, ওয়াজ- কীর্তনে-রথযাত্রাতেও কামরান। এই শহরের অধিকাংশ পরিবারের পারিবারিক এ্যালবামে পাওয়া যাবে তাঁর ছবি। কামরান মানুষের পারিবারিক বন্ধু হতে পেরেছিলেন, সামাজিক বন্ধু হতে পেরেছিলেন, সাংস্কৃতিক বন্ধু হতে পেরেছিলেন। এটাই এক কামরানকে করেছে কোটি জনতার।

তাঁর মতো সহজ করে মানুষের সাথে মেশার ক্ষমতা এ সময়ের খুব কম রাজনীতিকেরই আছে। কামরানের মতো অহিংস রাজনীতিক পাওয়াও বড়ো দুর্বল। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে কেউ তাকে কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না। পদ-পদবী আর ক্ষমতাকে সাধারণের কাছে নিয়ে যাওয়ার যাদুকরী ক্ষমতাই কামরানকে ‘অসাধারণ’ বানিয়েছে।

হ্যাঁ, কামরানের জীবনেও উত্থান পতন আছে, সংগ্রাম আর সাহসিকতার অন্য অধ্যায় আছে। কৈশোর থেকে রাজনীতির ক্লাসে ঢুকে পড়ে নানা চড়াই উৎরাই পেরোনোর গল্প আছে। তাঁর ভুল আছে, তাঁর ব্যর্থতা আছে, তাঁর সমালোচনা আছে। আর এই সবকিছু বুকে ঠেলে বার বার এগিয়ে গেছেন বলেই তিনি ‘ সবার ‘ কামরান হয়ে উঠেছেন। তিনি নিন্দুকের যেমন ভাই, তেমনই যারা ভালোবাসে, তাদেরও ভাই।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এক খণ্ড মেঘের মতো বড়ো অসময়ে শূন্যে উড়ে গেলেন। তবে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা গোছাবে কী দিয়ে, কাকে দিয়ে! ক্ষমতালোভী আর জনবান্ধব রাজনীতিক তো এক কথা নয়।

কামরানের মৃত্যু আজ এটাই প্রমাণ করে দিয়ে গেল যে, মানুষের জন্য রাজনীতি করলে মানুষ কখনো ফিরিয়ে দেয় না!

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কামরান ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।গত ১৫ জুন ২০২০ সালে সোমবার ভোর রাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তাঁর অকাল মৃত্যুতে দেশ একজন প্রকৃত, জনদরদী, ত্যাগী, জনপ্রিয় নেতাকে হারালো। তাঁর শূণ্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। এই মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই আর প্রার্থনা করি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য।

সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটি অবিচ্ছেদ্য নাম ছিল বদর উদ্দিন আহমদ কামরান । তিনি ছিলেন তৃণমূল থেকে ওঠে আসা এক জননন্দিত নেতা। গণিত শাস্ত্রের এলগোরিদমের মতো তাঁর পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ। সিলেটের প্রথম মেয়র। ছিলেন জননন্দিত। এই হিসেবেই পরিচিতি পান বেশি। আগের পরিচয়গুলোও কম উজ্জ্বল ছিল না।

তিনি সিলেট নগরীর ছড়ারপার এলাকার বাসিন্দা । প্রথম নির্বাচনে অংশ নেন ১৯৭৩ সালে। তৎকালীন সিলেট পৌরসভার ৩ নং তোপখানা ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল কামরানের পথচলা। সেই থেকেই সিলেট পৌরসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন, প্রায় তিন দশক সিলেট শহর ও পরবর্তীকালে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। টানা ১৫ বছর সিলেট পৌরসভার কমিশনার ছিলেন। মাঝখানে প্রবাসে থাকায় একবার নির্বাচন থেকে বিরত ছিলেন। ফিরে এসে ১৯৯৫ সালে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সিটি কর্পোরেশন ঘোষণার পর ২০০২ সালে ভারপ্রাপ্ত মেয়র এবং ২০০৩ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন । ২০০৮ সালে কারাগারে থেকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেন । সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ৮৫ হাজার ভোট বেশি পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে প্রায় ৩৫ হাজর ভোটে পরাজিত হয়ে যান। ২০১৮ সালের সিটি নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি তিনি। ২০১৩ ও ২০১৮ সালে তাঁর পরাজয় নিয়ে নানামূখী, বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ, আলোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। যত কূট, তত সফল। তিনি কূট কম ছিলেন, তাই ভোগান্তিও ছিল অবধারিত।

২০০৪ সালের ৭ আগস্ট সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর তালতলাস্থ গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। অনেকের সাথে সেদিন তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন । তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইব্রাহিম মারা যান। সেই দুর্বিষহ স্মৃতি মনে করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাঁর স্মৃতিচারণ ছিল হৃদয়বিদারক। চোখের জল ফেলে কান্নায় ভেঙে পড়তেন কামরান। স্থানীয় রাজনীতি ও স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্রের কৌশলগত ছলাকলায় তিনি কখনও অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সিলেট মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব হারান। মূল্যায়নও হয়েছে। সর্বশেষ দুটি কাউন্সিলে কামরান আওয়ামী় লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও দলের প্রয়োজনে পুরো সিলেট বিভাগ চষে বেড়িয়েছেন কামরান। প্রত্যেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের পক্ষে সরব ছিলেন তিনি। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায়ও নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে সবসময় প্রচার চালিয়েছেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। বক্তা হিসেবে, সংগঠক হিসেবে তাঁর যে দক্ষতা ছিল তার অনেক কদর ছিল সর্বত্র সবসময়।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, সদা হাস্যজ্জ্বল, জনদরদী, জনবান্ধব নেতা ছিলেন। পৌরসভার চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকাকালীন তিনি শত শত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। সেখানে অনেক বড় ক্যানভাসের অনুষ্ঠান ছিল ঠিক একইভাবে ছিল রেস্তোরা বা টেইলরিং এর উদ্ধোধনও । অনেকেই বলতেন পৌরসভার চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পক্ষে এতো ছোট মান ও মাত্রার অনুষ্ঠানে তাঁর যাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তিনি জানতেন তিনি জনগণের নেতা। কোনও কোনও ব্যবসায়ী সৎভাবে উপার্জনের জন্য রেস্তোরা বা টেইলরিং খুললে তিনি তাঁদের উৎসাহিত দিতেন। আর এজন্যই যেতেন। অহং বোধটা ছিল না তাঁর।

সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়রের মেয়াদকালে বৈরী বিএনপি সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেনি বা কম করেছে। মানমর্যাদাও কম দিয়েছে। ওই মেয়াদে সরকার স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে মেয়রের সমকক্ষ বা উপরে রাখতেন। তা উচিৎ ছিল না । বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার ভিন্ন দলের মেয়রকেও প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন । এই প্রতিকূল অবস্থায়ও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। যখন মেয়র ছিলেন না, তখনও সমভাবে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন, ছিলেন সম্মানিত।

নগরপিতা জনাব বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের পরিচয় দীর্ঘদিনের, পৌরসভার কমিশনার থাকার সময় থেকে। যখনই পেতেন পুরো পরিবারের কুশল জিজ্ঞেস করতেন। মিসেস আসমা কামরান মহিলা আওয়ামী লীগের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও নেত্রী। নিজের পরিচয় ও গুণের বাইরে জনাব বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের স্ত্রী হিসেবে দলসহ বিভিন্ন মহলে যেভাবে সম্মানিত ছিলেন।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ভাবনার অধিকারী ছিলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কত লোক তাঁর সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছে তার শেষ নেই।

মিষ্টভাষী কামরান সবার সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার অনন্য নজির গড়ে তুলেছিলেন যা সিলেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। নিজের দলের বাইরে, আদর্শের বাইরের লোকজনের কাছে, নেতাকর্মীর কাছেও সহনীয় ছিলেন, ছিল তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাঁকে স্নেহ করতেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি জননেতা কামরানকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমরা মনে করি, স্বীয় কর্মের মাধ্যমে জননেতা কামরান গণমানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

May be an image of 9 people, including Arman Ahmed and Adv Mahfuz and people smiling

সংবাদ অনুসন্ধান ক্যালেন্ডার

আমাদের ফেইসবুক পেইজ