জনমানুষের নেতা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার

প্রকাশিত: ৯:২৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০১৯

জনমানুষের নেতা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী :: শিক্ষা মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে। এ ক্ষেত্রে প্রথাগত শিক্ষা ও স্বশিক্ষার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। আবার মৌলিক ও ফলিত শিক্ষার মধ্য দিয়ে একজন আলোকিত মানুষ তৈরি হতে পারে। রাতের আকাশে অসংখ্য তারা মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকে। গোলাকার চাঁদ সোনালি আলোয় ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতিতে। আবার চাঁদ তার সেই আলো পেয়ে থাকে সূর্যের কাছ থেকে। এ প্রসঙ্গে এ পি জে আব্দুল কালাম বলেন, যদি সূর্য হতে চাও তবে সূর্যের মতো নিজেকে পোড়াও। আর এই সূর্যের দীপ্তিমান আলোকবর্তিকা নিয়ে যিনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোকিত করেছেন, তিনি হলেন জনমানুষের শিক্ষক শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার। একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি ছিলেন তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে শিক্ষক হিসেবে তিনি স্বাধীনতার চেতনাকে ছাত্রদের মানসপটে তুলে ধরেছেন একজন নিখুঁত শিল্পীর মতো। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক (১৯৭৭-১৯৮৪) এবং প্রধান শিক্ষক (১৯৮৪-২০০৪) হিসেবে আমৃত্যু তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর নিজের জীবনেও তিনি এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর চিরচেনা সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে তিনি সহজ-সরল জীবনের পরিচয় দিয়েছিলেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের আর্থিক সম্পর্কের চেয়ে আত্মিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। ফলে অকাতরে মানুষকে দিয়েছেন অনেক, কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি দারিদ্র্যকে বেছে নিয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে জীবনের ২৫টি বছর তিনি অতিক্রম করেছেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক। তিনি ছিলেন রাজনীতির শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের শিক্ষক। তাঁর রাজনীতির মূল বিষয় ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের জন্য রাজনীতি—রাজনীতির জন্য মানুষ নয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—বঙ্গবন্ধুর এই চার মূলনীতির ওপর তাঁর রাজনীতির দর্শন গড়ে উঠেছিল। এই চার মূলনীতির ওপর বিশ্বাস রেখে তিনি অসংখ্য রাজনীতিবিদ তৈরি করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ভোগের মনোভাবের পরিবর্তে ত্যাগের মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি নেতা থেকে জাতীয় নেতা ও গণমানুষের জননন্দিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী দেশপ্রেমিক একজন নেতার প্রতিকৃতি। তিনি গতানুগতিক স্বার্থবাদী রাজনীতির পরিবর্তে মানুষের কল্যাণের রাজনীতির দর্শনকে ধারণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যখন কোনো ব্যক্তির মধ্যে সততা, দর্শন ও নীতি কাজ না করে ক্ষমতা ও অর্থ উপার্জনের জন্য রাজনীতি প্রতিফলিত হয়, তখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে প্রকৃত রাজনীতি তার সর্বজনীন স্বকীয়তা হারায়। ফলে সুস্থ রাজনীতির চর্চা ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছিলেন। রাজনীতি যখন পেশি ও অর্থশক্তির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছিল, তখন তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতির কথা বলেছিলেন। তিনি রাজনীতির শিক্ষক এ কারণেই যে, তিনি মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা কাজ করতেন। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকতেন আর আপন করে নিতে পারতেন সবাইকে। তৃণমূলের মানুষের জন্য কল্যাণের রাজনীতি করে যে সর্বজনীন নেতা হওয়া যায় এটা তিনি প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন। জনগণের দাবির মুখে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি গাজীপুরের পুবাইল ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করেন। বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তিনি। এরপর ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদ আসনে নির্বাচিত হন। বিপুল জনপ্রিয়তা ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে ধারণ করে ১৯৯৬ সালে গাজীপুর-২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে অপকৌশলের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে পরাজিত করা হলেও জনমানুষের অন্তরের নেতা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জাতীয় সংসদে গাজীপুর-২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ ছাড়া জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর আগে তিনি একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের চেয়ারম্যান ছিলেন। জাপানের একটি ঘটনা তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তাকে উদ্ভাসিত করে। জাপানি শ্রমিক নেতারা তাঁকে কিছু উপহার দিতে চাইলে তিনি তা আন্তরিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে জাপানের জাদুঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন, যা আজ জাপানে গেলে সবার চোখে পড়বে। এটা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

তিনি ছিলেন শ্রমিকদের শিক্ষক। তিনি ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯০, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী মানুষের শিক্ষক ও নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ করার জন্য তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে সেই মামলা লড়াইয়ের জন্য ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ শ্রমিকদের বিভিন্নমুখী কল্যাণকর কাজের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। শ্রমিকদের শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমবিষয়ক ও শ্রমিক আন্দোলনে তিনি তাদের নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন সমাজ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের শিক্ষক। তিনি মাদক, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কোনো অপশক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের আপস তিনি করেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মাটি ও মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করে গেছেন। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রত্যক্ষ সমরে দুঃসাহসিক নেতৃত্ব ও কৌশল প্রয়োগ করে তিনি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এই মহান মানুষটির ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে গাজীপুরে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হবে, তা সবাই অন্তরে লালন ও ধারণ করে। কেননা ইতিহাস তাঁকে তৈরি করেনি, তিনিই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। খুনিরা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী একজন নেতাকে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আমাদের ফেইসবুক পেইজ